কারো হক নষ্ট করার পর ক্ষমা পাওয়ার উপায় কি?
Halal and Haram · Ahle Hadith / Salafi
Question
এরপর যখন আমি পুরোপুরিভাবে ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করলাম, তখন আস্তে আস্তে জানতে পারলাম যে, শুধু তওবা করলেই মানুষের হকের সঙ্গে সম্পর্কিত গুনাহ মাফ হয় না, যতক্ষণ না যার হক নষ্ট করেছি সে আমাকে ক্ষমা করে অথবা তার হক ফিরিয়ে দিই।
এখন আমার করণীয় কী? আমি অনেকের কাছে ক্ষমা চেয়েছি। অনেকে আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, আবার অনেকে আমার ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি উপেক্ষা করেছেন। অনেকের কাছে এখন আর পৌঁছাতে পারছি না। আবার অতীতে কাদের সঙ্গে কী অন্যায় করেছি, তার অনেক কিছুই পুরোপুরি ভুলে গেছি।
এই অবস্থায় আমি কী করতে পারি? যারা আমার ক্ষমা চাওয়া উপেক্ষা করছেন, যাদের কাছে আমি পৌঁছাতে পারছি না এবং যাদের কথা বা যাদের প্রতি করা অন্যায় আমি ভুলে গেছি—তাদের কাছ থেকে যদি ক্ষমা না পাই, তাহলে কি আখিরাতে এসব হকের জন্য আমাকে জবাবদিহি করতে হবে?
বিশেষ করে, কিয়ামতের দিন কি এসব মানুষের হক আদায়ের জন্য আমার নেক আমল থেকে তাদেরকে দিয়ে দেওয়া হবে? আমি দুনিয়াতে আন্তরিকভাবে তওবা করার পর এবং যথাসাধ্য তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া ও তাদের হক ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করার পরও যদি তাদের কাছে পৌঁছাতে না পারি, তারা আমার কথার উত্তর না দেন, অথবা অতীতের কিছু মানুষের কথা ও ঘটনা আমার মনেই না থাকে—তাহলেও কি আখিরাতে আমার নেক আমল দিয়ে তাদের হক পরিশোধ করতে হবে?
আমার জন্য শরিয়তসম্মতভাবে এসব হক আদায় করার, অতীতের জুলুম থেকে মুক্ত হওয়ার এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা পাওয়ার উপায় কী?
Answer
হক্কুল ইবাদ, তওবা ও মানুষের হক আদায় সম্পর্কে জরুরি প্রশ্ন
উত্তর:
আলহামদুলিল্লাহ, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। আপনি ইসলাম গ্রহণের পর অতীতের ভুল-ত্রুটি সম্পর্কে সচেতন হয়েছেন এবং তওবা করতে চান—এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বড় নেয়ামত। নিচে কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফে সালেহীনের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।
১. হক্কুল ইবাদ ও তওবার সম্পর্ক
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ "নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা ও সদাচরণের নির্দেশ দেন।" (সূরা আন-নাহল: ৯০)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ كَانَتْ عِنْدَهُ مَظْلِمَةٌ لِأَخِيهِ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهَا، فَإِنَّهُ لَيْسَ ثَمَّ دِينَارٌ وَلَا دِرْهَمٌ، مِنْ قَبْلِ أَنْ يُؤْخَذَ لِأَخِيهِ مِنْ حَسَنَاتِهِ، فَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ أَخِيهِ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ "যে ব্যক্তির কাছে তার ভাইয়ের কোনো হক (জুলুম) রয়েছে, সে যেন তা মাফ করিয়ে নেয়। কারণ সেদিন (কিয়ামতে) দিরহাম-দীনার কিছুই থাকবে না। তার নেক আমল থেকে নিয়ে তার ভাইকে দেওয়া হবে। আর যদি তার নেক আমল না থাকে, তবে তার ভাইয়ের গুনাহ থেকে নিয়ে তার উপর চাপানো হবে।" (সহীহ বুখারী: ২৪৪৯)
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
"মানুষের হকের সাথে সম্পর্কিত গুনাহ তওবা দ্বারা মাফ হয় না, যতক্ষণ না সে হক ফিরিয়ে দেয় বা ক্ষমা প্রার্থনা করে। তবে যদি সে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং যার হক নষ্ট হয়েছে সে ক্ষমা না করে, তবে আল্লাহ তাআলা ইনশাআল্লাহ কিয়ামতের দিন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন।"
২. আপনার করণীয় কী?
ক. যাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া
আপনি ইতিমধ্যে অনেকের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন—এটি সঠিক কাজ। যাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব, তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং হক ফিরিয়ে দেওয়া আপনার দায়িত্ব। আল্লাহ বলেন:
وَإِنْ عَفَوْا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ "আর যদি তারা ক্ষমা করে, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আন-নূর: ২২)
খ. যারা ক্ষমা চাওয়া উপেক্ষা করে তাদের জন্য
যারা আপনার ক্ষমা প্রার্থনা উপেক্ষা করেছে, তাদের জন্য আপনি দোয়া করতে পারেন। শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
"যদি কেউ ক্ষমা চায় এবং অপরজন ক্ষমা না করে, তবে জালিমের জন্য উত্তম হলো তার জন্য দোয়া করা, যেমন: 'আল্লাহুম্মা আগফির লি ওয়া লাহু' (হে আল্লাহ! আমাকে এবং তাকে ক্ষমা করুন)।"
গ. যাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয় বা ভুলে গেছেন
যাদের কথা আপনি ভুলে গেছেন বা যাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়, তাদের জন্য আপনি নিম্নোক্ত কাজগুলো করতে পারেন:
-
তাদের জন্য ইস্তিগফার ও দোয়া করা — রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ يَقْبَلُ تَوْبَةَ الْعَبْدِ مَا لَمْ يُغَرْغِرْ "নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দার তওবা কবুল করেন যতক্ষণ না সে মৃত্যুযন্ত্রণায় পৌঁছে।" (তিরমিজি: ৩৫৩৭)
-
তাদের পক্ষ থেকে সদকা করা — শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেছেন:
"যার হক নষ্ট হয়েছে এবং সে মারা গেছে বা পাওয়া যাচ্ছে না, তার পক্ষ থেকে সদকা করা এবং তার জন্য দোয়া করা জায়েয।"
-
আল্লাহর কাছে তওবা করা — আল্লাহ বলেন:
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ "হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।" (সূরা আন-নূর: ৩১)
৩. কিয়ামতের দিন নেক আমল দেওয়া হবে কি?
হ্যাঁ, সহীহ হাদীস অনুযায়ী, কিয়ামতের দিন জুলুমের বদলা নেক আমল থেকে নেওয়া হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَيُؤْخَذَنَّ لِلْمَظْلُومِ مِنَ الظَّالِمِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُقْتَصَّ لَهُ مِنْهُ "কিয়ামতের দিন অবশ্যই মজলুমের পক্ষ থেকে জালিমের কাছ থেকে প্রতিশোধ নেওয়া হবে, এমনকি তার কাছ থেকে পূর্ণ প্রতিশোধ নেওয়া হবে।" (মুসনাদ আহমাদ: ৮৩৩০)
তবে শায়খ আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
"যদি জালিম আন্তরিকভাবে তওবা করে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করে হক ফিরিয়ে দেওয়ার, কিন্তু যার হক নষ্ট হয়েছে সে ক্ষমা না করে বা পাওয়া না যায়, তবে আল্লাহ তাআলা তার তওবা কবুল করতে পারেন এবং কিয়ামতের দিন তার পক্ষ থেকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন।"
৪. আন্তরিক তওবার শর্তসমূহ
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ এবং ইবনুল কাইয়্যিম (রহিমাহুমাল্লাহ) তওবার তিনটি শর্ত উল্লেখ করেছেন:
- গুনাহ থেকে বিরত থাকা
- কৃত গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া
- ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা
আর যদি গুনাহটি মানুষের হকের সাথে সম্পর্কিত হয়, তবে চতুর্থ শর্ত হলো: 4. যার হক নষ্ট হয়েছে তাকে হক ফিরিয়ে দেওয়া বা তার কাছ থেকে ক্ষমা নেওয়া
ইবনুল কাইয়্যিম (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি মানুষের হক নষ্ট করেছে এবং তওবা করেছে, কিন্তু হক ফিরিয়ে দেয়নি, তার তওবা পূর্ণ নয়। তবে যদি সে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে এবং হক ফিরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য না থাকে বা যার হক নষ্ট হয়েছে তাকে খুঁজে না পায়, তবে আল্লাহ তার চেষ্টার মূল্যায়ন করবেন।"
৫. আপনার জন্য বিশেষ পরামর্শ
ক. আন্তরিক তওবা করুন
আপনি ইতিমধ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং তওবা করেছেন—এটি আল্লাহর রহমত। আল্লাহ বলেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا "বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছে, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দেন।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
খ. যাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব তাদের কাছে ক্ষমা চান
যাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব, তাদের কাছে ক্ষমা চান এবং হক ফিরিয়ে দিন। যদি টাকা-পয়সা নিয়ে থাকেন, তবে ফিরিয়ে দিন। যদি গীবত করে থাকেন, তবে ক্ষমা চান।
গ. যাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয় তাদের জন্য দোয়া করুন
যাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয় বা যাদের কথা ভুলে গেছেন, তাদের জন্য দোয়া করুন এবং তাদের পক্ষ থেকে সদকা করুন। শায়খ সালেহ আল-ফাওযান বলেছেন:
"যে ব্যক্তি মানুষের হক নষ্ট করেছে এবং তওবা করেছে, কিন্তু যার হক নষ্ট হয়েছে তাকে খুঁজে পাচ্ছে না, সে তার পক্ষ থেকে সদকা করতে পারে এবং তার জন্য দোয়া করতে পারে।"
ঘ. বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ لَزِمَ الِاسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا وَمِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ "যে ব্যক্তি ইস্তিগফারকে আঁকড়ে ধরে, আল্লাহ তার জন্য প্রতিটি সংকট থেকে মুক্তির পথ তৈরি করেন, প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে নিষ্কৃতি দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (আবু দাউদ: ১৫১৮)
৬. আশার বাণী
আপনি যদি আন্তরিকভাবে তওবা করেন, যথাসাধ্য চেষ্টা করেন হক ফিরিয়ে দেওয়ার এবং ক্ষমা চাওয়ার, তবে আল্লাহ তাআলা আপনার তওবা কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا "নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দেন।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে তওবা করে এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করে মানুষের হক আদায় করার, কিন্তু যার হক নষ্ট হয়েছে তাকে খুঁজে না পায় বা সে ক্ষমা না করে, আল্লাহ তাআলা তার তওবা কবুল করবেন এবং কিয়ামতের দিন তার পক্ষ থেকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। আল্লাহ কারো উপর এমন বোঝা চাপান না যা সে বহন করতে সক্ষম নয়।"
৭. সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনার করণীয়:
- আন্তরিকভাবে তওবা করুন — গুনাহ থেকে বিরত থাকুন, অনুতপ্ত হোন এবং ভবিষ্যতে না করার সংকল্প করুন।
- যাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব তাদের কাছে ক্ষমা চান এবং হক ফিরিয়ে দিন।
- যারা ক্ষমা চাওয়া উপেক্ষা করে তাদের জন্য দোয়া করুন — "আল্লাহুম্মা আগফির লি ওয়া লাহু"।
- যাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয় বা ভুলে গেছেন তাদের জন্য দোয়া ও সদকা করুন।
- বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন এবং আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা রাখুন।
কিয়ামতের দিন নেক আমল দেওয়া হবে কি? — হ্যাঁ, যদি হক আদায় না করা হয়। তবে আপনি যদি আন্তরিকভাবে তওবা করেন এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করেন, আল্লাহ তাআলা ইনশাআল্লাহ আপনার তওবা কবুল করবেন এবং আপনার উপর রহম করবেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে ক্ষমা করুন এবং সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আমীন।
উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত সূত্রসমূহ:
- সহীহ বুখারী: ২৪৪৯
- তিরমিজি: ৩৫৩৭
- আবু দাউদ: ১৫১৮
- মুসনাদ আহমাদ: ৮৩৩০
- সূরা আন-নাহল: ৯০, সূরা আন-নূর: ২২, ৩১, সূরা আয-যুমার: ৫৩
- শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়্যিম, শায়খ ইবনে উসাইমীন, শায়খ আল-আলবানী, শায়খ সালেহ আল-ফাওযানের ফতোয়া ও উক্তি