DPS করা প্রসঙ্গে
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার টাকা হাতে থাকলে খরচ হয়ে যায়। আর ইনভেস্ট করার মত কোনো জায়গায় পাচ্ছি না। আমার ইচ্ছা টাকা জমিয়ে জমি কেনা। বাসায় এত গুলো টাকা জমানোও সেফ না। ডিপিএস করে রাখতে চাচ্ছি। এটা থেকে যেই ইন্টারেস্ট আসে সেটা সওয়াবের আশা ছাড়া দান করে দিব। কিন্তু আমার টাকা দিয়ে তারা যে সুদি কাজ কর্ম চালাবে তার জন্য কি আমি দায়বদ্ধ থাকবো আল্লহর কাছে? আমার কাছে টাকা সেফ রাখার জন্য অন্য কোনো অপশন ও নেই। আবার যদি কারেন্ট একাউন্ট এ টাকা রাখি তাহলে কোনো ইন্টারেস্ট আসবে না এবং যতদূর জানি আমার টাকা ব্যাংক ইউজ করবে না তাদের বিজিনেসে। ডিপিএসের ইন্টারেস্ট এর টাকা দিয়ে আমি একজন অসহায় মুসলিম কে হয়ত কিছু হেলপ করতে পারব, কিন্তু কারেন্ট একাউন্ট এ রাখলে তা সম্ভব না। একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে আমার কি করা উচিত।
একটা ভিডিও তে দেখলাম বাচ্চাদের চুল বার বার মুড়িয়ে দিলে তাতে নাকি ব্রেইনের উপর ইফেক্ট ফেলে৷ এই বিষয়ে কি কোনো হাদিস আছে? যেখান থেকে জানতে পারব বাচ্চাদের চুল বার বার মুড়িয়ে দেয়া উচিত নাকি অনুচিত?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্ন ১: ডিপিএস (DPS) করা ও তার সুদ দান করা
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ইসলামী শরীয়তে সুদ (রিবা) একটি কবিরা গুনাহ। কুরআন ও হাদিসে সুদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে।
আপনি যে পরিকল্পনার কথা বলেছেন—ডিপিএস করে যে সুদ আসবে তা দান করে দেওয়ার—এই চিন্তাটি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ সঠিক নয়। কারণ, সুদ খাওয়া হারাম,সূদী কাজে সহযোগিতা করাও হারাম, আর সুদের টাকা দান করলে তার সওয়াব পাওয়া যায় না। বরং, যে টাকা সুদ হিসেবে আসে, তা নিজে খাওয়া হারাম এবং তা দান করলেও আল্লাহর কাছে তা কবুল হবে না। এটি গুনাহের কাজ থেকে নিজেকে মুক্ত করার উপায় নয়, বরং গুনাহের কাজে অংশগ্রহণ করা হবে।
আপনার মূল প্রশ্ন: "আমার টাকা দিয়ে তারা যে সুদি কাজ করবে, তার জন্য কি আমি দায়বদ্ধ হব?"
এর উত্তর হলো: হ্যাঁ, আপনি দায়বদ্ধ হবেন। কারণ, আপনি যখন ব্যাংকে ডিপিএস করবেন, তখন আপনি জেনে-শুনে বা না জেনে তাদেরকে সেই টাকা ব্যবহার করার অনুমতি দিচ্ছেন। ব্যাংক সেই টাকা ব্যবহার করে সুদভিত্তিক লেনদেন করবে। যেহেতু আপনি এই চুক্তিতে প্রবেশ করছেন, তাই সেই লেনদেনের অংশীদার হিসেবে আপনি আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবেন।
হাদিসে এসেছে: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ "রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুদ খাওয়াকারী, সুদ খাওয়ানো ব্যক্তি (যে দেয়), সুদের দলিল লেখক এবং সুদের সাক্ষীদ্বয়ের উপর লানত (অভিশাপ) করেছেন এবং বলেছেন, তারা সবাই সমান (গুনাহগার)।" (সহীহ মুসলিম: ১৫৯৮)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, শুধু সুদ খাওয়া নয়, বরং সুদের লেনদেনে কোনোভাবে সাহায্য করা বা অংশগ্রহণ করাও গুনাহের কাজ। তাই ডিপিএস করা এবং সেই সুদ দান করা কোনোভাবেই বৈধ নয়।
আপনার জন্য সমাধান:
১. কারেন্ট অ্যাকাউন্ট: আপনি নিজেই বলেছেন, কারেন্ট অ্যাকাউন্টে কোনো সুদ আসে না এবং ব্যাংক আপনার টাকা ব্যবহার করে না। এটি একটি বৈধ ও নিরাপদ উপায়। আপনি চাইলে কারেন্ট অ্যাকাউন্টে টাকা রাখতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন, কারেন্ট অ্যাকাউন্টের চুক্তিতে যেন কোনো শর্ত না থাকে যা সুদের সাথে জড়িত।
২. ইসলামী ব্যাংক: আপনি যদি ব্যাংকে টাকা রাখতেই চান, তাহলে যে ইসলামী ব্যাংকে সুদ নেই সেই ব্যাংকের **মুদারাবা একাউন্ট খুলতে পারেন। তবে সেখানেও খেয়াল রাখবেন, যেন কোনো প্রকার সুদ বা রিবা জড়িত না থাকে।
৩. জমি কেনা: আপনার ইচ্ছা অনুযায়ী টাকা জমিয়ে জমি কেনা একটি উত্তম ও বৈধ বিনিয়োগ। আপনি চাইলে নিজের কাছেই মাসিক সেভিংস করে একটি নির্দিষ্ট সময় পর জমি কিনতে পারেন। এটি সুদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত একটি উপায়।
মনে রাখবেন: সুদের টাকা দান করলে সওয়াব পাওয়া যায় না, বরং এটি একটি গুনাহের কাজ। তাই সুদ থেকে বাঁচতে হলে অবশ্যই সুদভিত্তিক লেনদেন থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮)
প্রশ্ন ২: বাচ্চাদের চুল বারবার মুড়িয়ে দেওয়া ও ব্রেইনের উপর প্রভাব
আপনি যে ভিডিওটি দেখেছেন, সেটি একটি বৈজ্ঞানিক বা চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়। ইসলামী শরীয়তে এই বিষয়ে সরাসরি কোনো হাদিস বা নির্দেশনা নেই। তবে ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব দেয়।
হাদিসে সাধারণভাবে চুলের যত্ন নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: مَنْ كَانَ لَهُ شَعْرٌ فَلْيُكْرِمْهُ "যার চুল আছে, সে যেন তার চুলের সম্মান করে (অর্থাৎ যত্ন নেয়)।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪১৬৩)
তবে "বারবার চুল মুড়িয়ে দেওয়া" বা "টেনে ধরার" বিষয়ে কোনো হাদিস নেই। যদি চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রমাণ করে যে, বাচ্চাদের চুল বারবার মুড়িয়ে দিলে বা টানলে ব্রেইনের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে, তাহলে তা থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ, ইসলামে নিজের শরীরের ক্ষতি করা বা অন্যের ক্ষতি করা নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ "নিজের ক্ষতি করা এবং অন্যের ক্ষতি করা ইসলামে নিষিদ্ধ।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১)
তাই, যদি কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকে যে এটি ক্ষতিকর, তাহলে তা থেকে বিরত থাকা উচিত। আর যদি এটি ক্ষতিকর না হয়, তাহলে চুল মুড়িয়ে দেওয়া বা যত্ন নেওয়ার মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। তবে বাচ্চাদের প্রতি স্নেহ ও ভালোবাসা প্রদর্শন করা এবং তাদের যত্ন নেওয়া ইসলামের শিক্ষা।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। (আমিন)