ইমান নিয়ে মনের মধ্যে শঙ্কাঃ করণীয় কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২।বেখেয়ালি ভাবে অন্যমনস্ক হয়ে ইমান চলে যাবে এমন কিছু কথা বা কাজ করলে ইমান চলে যাবে কি?
Answer
উত্তর দেওয়ার পূর্বে গুরুত্বপূর্ণ নোট:
আপনার প্রশ্নটি ঈমান ও কুফর সংক্রান্ত অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি বিষয়। এখানে দলিল-প্রমাণ সহকারে হানাফী ফিকহের মূলনীতি অনুসারে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
প্রশ্ন ১:
"আমি নিশ্চিত না যে ঈমান চলে যাওয়ার মতো কাজ করছি কিনা, কিন্তু ভিতরে আসে যে 'ঈমান চলে যাওয়ার মতো কিছু করলাম?'"
উত্তর:
ইসলামে কর্ম ও বিশ্বাসের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণের মূলনীতি হলো নিয়ত (ইচ্ছা) ও ইখতিয়ার (স্বাধীনতা)। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
"আল্লাহ কাউকে তার সক্ষমতার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না।" (সূরা বাকারা, ২:২৮৬)
হাদীসে কুদসীতে এসেছে:
"আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের অন্তরে উদিত হওয়া খারাপ চিন্তা বা ওয়াসওয়াসা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তারা তা কথা বা কাজে পরিণত করে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ২৫২৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১২৭)
হানাফী ফকীহগণ বলেন:
"ঈমান নষ্ট হওয়ার জন্য দুটি শর্ত জরুরি: (ক) সচেতনভাবে কুফরী বিশ্বাস পোষণ করা বা মুখে বলা, (খ) ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরী কাজ সম্পাদন করা।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/২২৪; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ, ২/২৫৬)
আপনার ক্ষেত্রে:
- আপনি যদি নিশ্চিত না হন যে ঈমান নষ্টের কাজ করছেন, কিন্তু শুধু অন্তরে সন্দেহ বা ওয়াসওয়াসা আসে, তাহলে তা ঈমান নষ্ট করে না।
- তবে ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে বেশি বেশি "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" ও "আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম" পড়বেন এবং তার গুরুত্ব দেবেন না। অনেকে ওয়াসওয়াসাকে সত্যি মনে করে বসে থাকেন, যা শয়তানের কৌশল।
প্রশ্ন ২:
"বেখেয়ালি ভাবে অন্যমনস্ক হয়ে ঈমান চলে যাবে এমন কিছু কথা বা কাজ করলে ঈমান চলে যাবে কি?"
উত্তর:
হানাফী ফিকহের মূলনীতি:
"ভুলে, অজান্তে বা বাধ্য হয়ে কুফরী শব্দ বললে বা কাজ করলে ঈমান নষ্ট হয় না।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২২৭; ফাতাওয়া উসমানী, ১/২১৩)
প্রমাণ:
- হাদীসে এসেছে: "আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের জন্য ভুল, ভুলে যাওয়া ও বাধ্য হয়ে করা কাজ ক্ষমা করে দিয়েছেন।" (ইবনে মাজাহ, হাদীস: ২০৪৫)
- ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন: "যে ব্যক্তি ঘুমের মধ্যে কুফরী বলল, তার ঈমান নষ্ট হবে না।" (শরহু মাআনিল আছার, ২/৩৬৫)
তবে সতর্কতা:
- যদি সচেতনভাবে ছোট্ট একটি কুফরী শব্দও মুখে বলেন, তাহলে ঈমান নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
- বেখেয়ালি বা অন্যমনস্ক অবস্থায় যদি কেউ এমন কথা বললেও মনে প্রাণে ঈমান দৃঢ় থাকে, তাহলে ত্যাগ (ইচ্ছা) না থাকায় ঈমান নষ্ট হবে না। তবে নিজেকে সতর্ক রাখা জরুরি।
সারসংক্ষেপ ও সমাধান:
| পরিস্থিতি | ঈমানের উপর প্রভাব | সতর্কতা | |--------------|------------------------|--------------| | ১. নিশ্চিত না হওয়া সত্ত্বেও শুধু অন্তর ওয়াসওয়াসা | ঈমান অক্ষত | ওয়াসওয়াসা দূর করুন, ধৈর্য ধরুন। | | ২. ভুলে বা অন্যমনস্ক হয়ে কুফরী কথা বলা | ঈমান অক্ষত | সঙ্গে সঙ্গে তওবা ও ইস্তিগফার পড়ুন। | | ৩. ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরী বিশ্বাস বা কাজ | ঈমান নষ্ট | পুনরায় কালিমা ও তওবা করতেই হবে। |
শেষ পরামর্শ:
- অহেতুক সন্দেহ ও ওয়াসওয়াসা থেকে বিরত থাকুন। শয়তান মানুষকে ঈমানে দুর্বল করতে এই রোগে ফেলে।
- প্রত্যেক কাজ, কথা ও চিন্তায় আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করুন।
- যদি কোনো কারণে অন্তর অস্থির হয়, তাহলে সরাসরি কোনো আলেম বা মুফতির সাহায্য নিন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে ঈমানের হেফাজত করুন ও শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচান। আমীন।