পিতা যদি খারাপ হয় তাহলে কী করব?
Family Life · Hanafi
Question
আমার বাবাকে ছোটবেলা থেকেই দেখছি আমার আম্মুকে মারধর করে, নেশা করে, একাধিক বিয়ে করেছেন এবং অনৈতিক সম্পর্কের কথাও শুনেছি। তিনি নাকি শিশু অবস্থায় আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছেন এবং অনেক বাজে মন্তব্য করেছেন আমি কন্যা সন্তান তাই। কোনোদিন ভরন পোষন দিতেন না এবং এমন কিছু কাজ করেছেন যে ঐ সমাজে থাকতেও পারিনি।এক কথায় উনি অনেক বাজে কাজ করেছেন। আমার ছয় বছর অবস্থায় আব্বু আম্মুর ছাড়াছাড়ি হলে তিনি সরাসরি বলে দেন যে তার প্রয়োজন নেই আমাকে। এমনকি সুযোগ থাকা সত্ত্বেও উনি এখনো আমার সাথে যোগাযোগ এর আগ্রহ প্রকাশ করেন না। উনার সাথে যোগাযোগ নেই চৌদ্দ বছর উনি শুধু আম্মুকে চান এখনো আমার সাথে কথাও বলতে চান না। এখনও উনার চরিত্র খারাপ এবং আমি যেহেতু কন্যা সন্তান তার সাথে শুধু কথাই বলতে পারব নিজে থেকে টাকা দেওয়া সম্ভব না এখন কি আমি তার সাথে বা আমার সৎ ভাইবোনের সাথে যোগাযোগ করতে বাধ্য? উনি আমাকে ভরন পোষন সহ সম্পত্তি থেকেও বঞ্চিত করেছেন। আমি ভয় পাচ্ছি কথা বলতে কারণ আমি যতটুকু জানি ওরা ভালো মানুষ না।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রিয় প্রশ্নকারিণী, আপনার দীর্ঘ ও কষ্টদায়ক ঘটনা শুনে আমরা সত্যিই মর্মাহত। আল্লাহ তায়ালা আপনার ধৈর্যের উত্তম প্রতিদান দিন এবং আপনার মা-কে ধৈর্য ধারণের তাওফিক দান করুন। আপনার পিতার আচরণ ইসলামী আদর্শ ও নৈতিকতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া প্রয়োজন:
১. পিতার সাথে সদ্ব্যবহারের আদেশ: ইসলামে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন, "তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে 'উফ' শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বলো।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)
তবে এই আদেশটি সন্তানের প্রতি পিতার দায়িত্ব পালনের শর্তে নয়, বরং এটি একটি স্বতন্ত্র আদেশ। পিতা যতই খারাপ হোন না কেন, সন্তানের উপর পিতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার অধিকার নেই। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আপনি তার খারাপ আচরণ সহ্য করবেন বা তার কাছে যাবেন।
২. পিতার দায়িত্ব: ইসলামী আইনে পিতার উপর সন্তানের ভরণপোষণ (নাফাকা) দেওয়া ফরজ। ইমাম কাসানী (রহ.) كتاب بدائع الصنائع-এ উল্লেখ করেছেন যে, পিতার উপর সন্তানের খোরপোষ ও পোশাকের ব্যবস্থা করা ওয়াজিব। (বাদায়েউস সানায়ে, ৪/৩০) আপনার পিতা এই দায়িত্ব পালন না করে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা সম্পূর্ণ অন্যায় ও গুনাহের কাজ। তবে এর জন্য আপনি তাকে আইনীভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন, কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিতে পিতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা বা তার সাথে খারাপ ব্যবহার করা জায়েয নয়।
৩. সৎ ভাইবোনের সাথে সম্পর্ক: আপনার সৎ ভাইবোনের সাথে সম্পর্ক রাখা জরুরি কি না, তা নির্ভর করে সম্পর্কের প্রকৃতির উপর। ইসলামে রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখা (সিলাতুর রাহিম) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে যদি আপনার সৎ ভাইবোনরা আপনার ক্ষতি করে বা আপনি তাদের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা জরুরি নয়।
৪. আপনার করণীয়:
-
নিরাপত্তা ও মানসিক শান্তি: আপনার মানসিক শান্তি ও নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু আপনি জানেন যে, আপনার পিতা ও তার পরিবারের লোকজন ভালো মানুষ নন এবং তাদের সাথে কথা বললে আপনার ক্ষতি হতে পারে, তাই তাদের সাথে যোগাযোগ করা আপনার জন্য জরুরি নয়। তবে আপনি যদি চান, দূর থেকে (যেমন ফোনে) খোঁজখবর নিতে পারেন, কিন্তু যদি তাতেও ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে তা থেকে বিরত থাকুন।
-
পিতার সাথে সম্পর্ক: পিতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা ইসলামে কঠোর গুনাহের কাজ। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আপনি তার কাছে যাবেন বা তার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখবেন। আপনি দূর থেকে তার খোঁজখবর নিতে পারেন,ফোনে সালাম বিনিময় করতে পারেন এবং প্রয়োজনে তার জন্য দোয়া করতে পারেন। যদি তিনি আপনার সাথে যোগাযোগ করতে না চান, তবে আপনার উপর তার সাথে যোগাযোগ করার বাধ্যবাধকতা নেই।
-
ভরণপোষণ ও সম্পত্তি: আপনার পিতা আপনাকে ভরণপোষণ ও সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছেন, এটি তার গুনাহ। আপনি চাইলে আইনীভাবে আপনার প্রাপ্য দাবি করতে পারেন, তবে এর জন্য তাকে ঘৃণা করা বা তার সাথে খারাপ ব্যবহার করা জায়েয নয়। আল্লাহ তায়ালা ইনশাআল্লাহ আপনার ন্যায্য প্রাপ্য পৌঁছে দেবেন।
-
দোয়া: আপনার পিতার হিদায়াতের জন্য দোয়া করুন। আল্লাহ তায়ালা যেন তাকে সঠিক পথ দেখান এবং তার অন্তর পরিবর্তন করেন।
উপদেশ: আপনার জীবনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আল্লাহর উপর ভরসা করুন। আপনার মা-কে নিয়ে একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ জীবন গড়ুন। আপনার পিতার খারাপ আচরণ আপনার জীবনে বোঝা হয়ে দাঁড়াতে দেবেন না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তম পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
আল্লাহ তায়ালা আপনাকে ধৈর্য ও সাহস দান করুন। আমিন।