কাবিননামায় তালাকের অধিকার দেওয়ার বিধান
Waswasa-OCD · Ahle Hadith / Salafi
Question
কাবিননামায় কাজী ১৮ নং স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেন লিখা ছিল " যদি বনিবনা না হয় বা নিয়মিত খোর পোষ না দেয় বা নিয়মিত খোঁজখবর না নিলে তবে স্ত্রীর যখন ইচ্ছা" এখন এক্ষেত্রে স্ত্রী স্বামীকে অনেক ভালোবাসে তবে মাঝে মাঝে স্বামী অতিরিক্ত বকলে স্ত্রী অস্তির হয়ে যায় তালাক চায় কিন্তু মনে মনে সে স্বামীকে অনেক ভালোবাসে সে শুধু স্বামীকে রাগাতে ও স্বামী যাতে থামে তাই বলে, যত ঝগড়া হোক সারাদিন একজন অন্যজনকে ছেড়ে থাকতে পারে না ঝগড়া হলেও সারাদিন ফোন দেওয়া লাগবে কোনোদিন ঝগড়া ১/২ দিনের বেশি যায় নি বা কোনোদিন যোগাযোগ বন্ধ হয়নি যেহেতু স্ত্রী তার বাবার বাড়ি ছীল তাই ঝগড়া ঘনঘন হতো মাঝে মাঝে স্বামী বলে ফেলে স্ত্রীকে তালাক দিতে এ ঝগড়া কিছু ঘন্টা চলে আবার মিলে যায় , মাঝে মাঝে স্ত্রী স্বামীকে ভয় দেখাতে দরজা বন্ধ করে আত্মহত্যা হুমকি দিত এখানে সবসময় তার নিয়ত ছিল স্বামী যেন মিলে যায় ঝগড়া শেষ হোক সে স্বামীকে ছাড়া বাঁচবে না এমন অবস্থা । বাবা মা সবসময় মিলিয়ে দেন তাদের বা ঝগড়া হলে স্বামি নিজে সরি বলে ঝগড়া শেষ করে।উপরোক্ত পূরো ক্ষেত্রে স্ত্রী তালাকের অধিকার পায় বনিবনা না হওয়ায় শর্তে? বর্তমান একসাথে থাকে মাঝে মাঝে ঝগড়া হলেও আবার মিলে যায় এখন কি অধিকার পাবে? বনিবনা না হওয়ায় শর্তে স্ত্রী কোন মূহুর্তে অধিকার পাবে আর ওই মূহুর্ত শেষ হলে মিলে গেলে আর কি অধিকার অবশিষ্ট থাকে? আর বাকি কি নিয়মিত খোর পোষ স্বামী দেন হয়তো মাসিক ফিক্স টাকা না তবে স্ত্রীর মোবাইল কিনা, চিকিৎসা, খাওয়া, বিউটি প্রোডাক্ট সব খরচ দেয়। নিয়মিত খোঁজখবর নেয় দেখা করে একসাথে থাকে।
আর একটা প্রশ্ন বনিবনা না হওয়ায় সংঙ্গা কি কেমন পরিস্থিতি হলে বুঝতে হবে বনিবনা হয় না স্ত্রী তালাক অধিকার পাবে?
একদিন স্বামী মৌখিক ভাবে স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেন তখন স্ত্রী ফোন কেটে দিল পরে একা একা শুয়ে ভাবছিল মুখে বলল "যদি তালাক নেই পরে কি হবে" এটি বলে সে ভয় পায় এতে কিছু হবে? পরে সে স্বামীকে অধিকার ফিরিয়ে দেয় । পরেরদিন ঝগড়ায় বলে "কেন যে কালকে সুযোখ টা ব্যবহার করলাম না" এটা বলায় কিছু হবে?
স্বামী মাঝে মাঝে মৌখিক ভাবে তালাকের অধিকার দেন স্ত্রী সবসময় পরে বলে অধিকার ফিরিয়ে দিলাম এটা কি যথেষ্ট? আর কি অধিকার পাবে?
(উল্লেখ্য বিয়ের কাবিননামায় ১৮ নং কাজি স্ত্রী স্বামীর সাইন নেওয়ার পর নিজে সিল মেরে দেয় এটি কি স্ত্রী স্বামী জানতো না পরে স্ত্রী জেনে স্বামীকে অধিকার ফিরিয়ে দেয় এখন অনেকে বলে বিয়ের পর লেখা হলে অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া যায় না অনেকে বলে যায় কি করব? পুরো শুখ পুঃখানু ভাবে উওর দেন
১. আমার স্ত্রী একটি ঘটনার ভিওিতে বলছিল তাকে লিখিত দিতে যে অমুক কাজটি যদি হয় তাহলে তার তালাকের অধিকার তার হাতে , আমি যেন এটা লিখিত দেই। আমি শুধু বলেছি আচ্ছা ঠিক আছে, দিতেছি। আর দেই নি এতে কি সে তালাকের অধিকার পাবে? যদি ওই নির্দিষ্ট কাজটি হয়।
২. একদিন আমার স্ত্রী বলছিল বাপের বাড়ি চলে যাব আমি বললাম কোন নিয়তে বলতেছো সে বলে নিয়ত সহ বলতাছি যাবো গা এখানে আমার মনে নাই সে তালাকের নিয়ত বললো নাকি শুধু নিয়ত। এতে কি কোন সমস্যা হবে বৈবাহিক অবস্থায়
৩. স্বামী একদিন মারে পরে স্ত্রী বলে ভবিষ্যতে আর যদি মারো ডিভোর্স করব এখানে সে হুয়কি দেয় শর্ত না আর মারলে শর্ত তালাক হবে?
Answer
তালাকের শর্ত ও স্ত্রীর অধিকার সংক্রান্ত বিস্তারিত ফতোয়া
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রশ্নটি দীর্ঘ এবং একাধিক বিষয় জড়িত। আমি ধাপে ধাপে উত্তর দিচ্ছি, ইনশাআল্লাহ।
১. কাবিননামার ১৭ ও ১৮ নং শর্তের বিধান
১৭ নং (খোরপোষ সংক্রান্ত):
কাবিননামায় উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও স্বামী মাসিক ফিক্সড খোরপোষ না দিলে, কিন্তু সব খরচ বহন করলে—এতে স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবে না। কারণ শর্তটি ছিল "সমায়ুনুপাতে ও ভদ্রলোচিত হারে প্রদান করবে"—এখানে মূল বিষয় হলো ভরণপোষণ দেওয়া, নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেওয়া নয়। যেহেতু স্বামী স্ত্রীর মোবাইল, চিকিৎসা, খাওয়া, বিউটি প্রোডাক্টসহ সব খরচ বহন করে, তাই সে খোরপোষের দায়িত্ব পালন করছে।
১৮ নং (তালাকের অধিকার):
কাবিননামায় লেখা ছিল: "যদি বনিবনা না হয় বা নিয়মিত খোরপোষ না দেয় বা নিয়মিত খোঁজখবর না নিলে তবে স্ত্রীর যখন ইচ্ছা তালাকের অধিকার থাকবে।"
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ:
- স্বামী নিয়মিত খোরপোষ দিচ্ছে (সব খরচ বহন করে)
- স্বামী নিয়মিত খোঁজখবর নেয়, একসাথে থাকে
- মাঝে মাঝে ঝগড়া হয়, কিন্তু আবার মিলে যায়
- স্ত্রী স্বামীকে ভালোবাসে
ফতোয়া: যেহেতু বর্তমানে তারা একসাথে থাকে এবং ঝগড়ার পর মিলে যায়, তাই "বনিবনা না হওয়া" শর্তটি স্থায়ীভাবে প্রযোজ্য নয়। সাময়িক ঝগড়া "বনিবনা না হওয়া" হিসেবে গণ্য হবে না। ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"শর্তযুক্ত তালাক তখনই কার্যকর হবে যখন শর্তটি পূর্ণ হবে। শর্ত পূর্ণ না হলে তালাক কার্যকর হবে না।"
তালাকের অধিকার পাওয়ার মুহূর্ত: স্ত্রী তখনই তালাকের অধিকার পাবে যখন স্বামী স্থায়ীভাবে খোরপোষ বন্ধ করবে, বা স্থায়ীভাবে খোঁজখবর নেওয়া বন্ধ করবে, বা এমন পর্যায়ে বনিবনা না হবে যে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সাময়িক ঝগড়া বা রাগের কারণে এই শর্ত কার্যকর হবে না।
মিলে গেলে অধিকার: যদি শর্ত পূর্ণ হওয়ার পরও তারা মিলে যায় এবং স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন শুরু করে, তবে সেই নির্দিষ্ট ঘটনার জন্য তালাকের অধিকার আর প্রযোজ্য হবে না। তবে ভবিষ্যতে আবার শর্ত পূর্ণ হলে অধিকার আবার সক্রিয় হবে।
২. "বনিবনা না হওয়া" এর সংজ্ঞা
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, বনিবনা না হওয়া বলতে এমন পরিস্থিতি বুঝায় যখন:
- স্বামী-স্ত্রী একসাথে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে
- দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যাওয়া কষ্টকর হয়
- ঝগড়া এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করা যায় না
সাময়িক ঝগড়া, রাগ, মনোমালিন্য—এগুলো "বনিবনা না হওয়া" হিসেবে গণ্য হবে না। কারণ প্রতিটি দাম্পত্য জীবনেই ছোটখাটো ঝগড়া হয়।
৩. মৌখিকভাবে তালাকের অধিকার দেওয়া ও ফিরিয়ে নেওয়া
ক. স্বামী মৌখিকভাবে তালাকের অধিকার দিলে:
স্বামী যদি স্ত্রীকে মৌখিকভাবে তালাকের অধিকার দেয়, তবে তা বৈধ। স্ত্রী চাইলে সেই অধিকার ব্যবহার করতে পারে, আবার ফিরিয়েও দিতে পারে।
খ. স্ত্রী অধিকার ফিরিয়ে দিলে:
স্ত্রী যদি স্বামীকে অধিকার ফিরিয়ে দেয় এবং স্বামী তা গ্রহণ করে, তবে অধিকার ফিরিয়ে নেওয়া বৈধ। শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেওয়া একটি বৈধ চুক্তি। স্ত্রী চাইলে তা ফিরিয়ে দিতে পারে, যদি স্বামী তা গ্রহণ করে।"
গ. "যদি তালাক নেই পরে কি হবে" বলা:
স্ত্রী একা একা ভাবছিল এবং মুখে বলল "যদি তালাক নেই পরে কি হবে"—এটি তালাকের ইকরা'র (ঘোষণা) মধ্যে পড়ে না। কারণ এটি ছিল আত্মগত চিন্তা, তালাকের নিয়তে বলা হয়নি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
"আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং যা করতে বাধ্য করা হয় তা ক্ষমা করা হয়েছে।" (ইবনে মাজাহ, হাদীস সহীহ)
ঘ. "কেন যে কালকে সুযোগটা ব্যবহার করলাম না" বলা:
এটি তালাকের ইকরা' নয়, বরং আফসোস প্রকাশ। এতে কোনো তালাক হবে না।
৪. কাবিননামায় ১৮ নং শর্তের বৈধতা
ক. কাজী নিজে সিল মেরে দিলে:
কাবিননামায় ১৮ নং ধারায় কাজী স্ত্রী-স্বামীর সাইন নেওয়ার পর নিজে সিল মেরে দিয়েছে—এতে শর্তটি বৈধ হবে যদি উভয় পক্ষ সম্মত থাকে। তবে যদি স্বামী জানত না যে ১৮ নং ধারায় তালাকের অধিকার দেওয়া হয়েছে, এবং সে সাইন দেওয়ার সময় এ সম্পর্কে অবগত ছিল না, তাহলে এই শর্তটি স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক হবে না। কারণ চুক্তি অবশ্যই জানা সত্ত্বেও সম্মতিতে হতে হবে।
খ. স্ত্রী অধিকার ফিরিয়ে দিলে:
স্ত্রী যদি জেনে শুনে স্বামীকে অধিকার ফিরিয়ে দেয়, তবে তা বৈধ। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"স্ত্রী তালাকের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে পারে, কারণ এটি তার ইচ্ছাধীন বিষয়।"
গ. "বিয়ের পর লেখা হলে অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া যায় না"—এ কথা কি সঠিক?
এটি সঠিক নয়। স্ত্রী তার ইচ্ছায় তালাকের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে পারে, তা কাবিননামায় লেখা থাকুক বা না থাকুক। তবে যদি স্ত্রী ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার পর স্বামী তা গ্রহণ করে, তবে তা কার্যকর হয়।
৫. নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর
১. স্ত্রীকে লিখিত দেওয়ার কথা বলে দিল না:
স্বামী শুধু বলেছে "আচ্ছা ঠিক আছে, দিতেছি" কিন্তু লিখিত দেয়নি—এতে তালাকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না। কারণ মৌখিক প্রতিশ্রুতি পূর্ণ না করলে তালাক কার্যকর হবে না। তবে স্বামীর জন্য উচিত কথা রাখা, কারণ আল্লাহ বলেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর।" (সূরা আল-মায়িদা: ১)
২. স্ত্রী "বাপের বাড়ি যাব" বলায় নিয়ত:
স্ত্রী যদি তালাকের নিয়তে না বলে শুধু বাপের বাড়ি যাওয়ার নিয়তে বলে, তবে এতে কোনো সমস্যা নেই। তালাকের নিয়ত না থাকলে তালাক হবে না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
"প্রত্যেক কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল।" (বুখারী ও মুসলিম)
৩. স্বামী মারলে স্ত্রী বলল "ভবিষ্যতে আর মারলে ডিভোর্স করব":
এটি শর্তযুক্ত তালাক নয়, বরং হুমকি বা সতর্কবার্তা। স্ত্রী যদি তালাকের নিয়তে না বলে থাকে, তবে এতে তালাক হবে না। তবে স্বামীর জন্য স্ত্রীকে মারধর করা হারাম। আল্লাহ বলেন:
"তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর।" (সূরা আন-নিসা: ১৯)
৬. গুরুত্বপূর্ণ নসীহত
১. তালাক আল্লাহর নিকট ঘৃণিত হালাল কাজ—রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: "আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা ঘৃণিত হালাল বস্তু হলো তালাক।" (আবু দাউদ)
২. ঝগড়া মিটানোর চেষ্টা করুন—আল্লাহ বলেন: "যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্যের আশঙ্কা কর, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচারক নিয়োগ কর।" (সূরা আন-নিসা: ৩৫)
৩. ধৈর্য ধরুন—দাম্পত্য জীবনে সমস্যা হবেই, কিন্তু ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমে তা সমাধান করা উচিত।
৪. তালাকের হুমকি দেওয়া বন্ধ করুন—স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত তালাকের কথা বলা থেকে বিরত থাকা, কারণ এটি শয়তানের কাজ।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।