রাগের অবস্থায় তালাক দিলে তালাক পতিত হবে?
Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
তালাক সংক্রান্ত উত্তর
প্রশ্ন: আমার স্বামী অতিরিক্ত রাগী, রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, আমাকে বহুবার তালাক দিয়েছে কিন্তু রাগ শেষে বলে সে বুঝতে পারেনি কী বলেছে। আমাদের সম্পর্ক কি হালাল আছে নাকি তালাক হয়ে গেছে?
উত্তর
আলহামদুলিল্লাহ।
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন:
১. রাগের অবস্থায় তালাকের বিধান
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তিনটি বিষয়ে গুরুতর (ঠাট্টা) ও গুরুতর (সত্য) সমান: তালাক, বিবাহ এবং মুক্ত করা।" (আবু দাউদ: ২১৯৪, তিরমিজি: ১১৮৪, ইবনে মাজাহ: ২০৪০ - সহিহ)
তবে রাগের তীব্রতা সম্পর্কে ফিকহবিদদের মতভেদ রয়েছে:
প্রথম অবস্থা: যদি রাগ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, ব্যক্তি সম্পূর্ণ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, কী বলছে বা করছে তা বুঝতে পারে না, তাহলে সেই অবস্থায় তালাক পতিত হবে না। কারণ হাদিসে এসেছে: "কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে তিন ব্যক্তি থেকে: ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না জাগে, পাগল যতক্ষণ না সুস্থ হয়, এবং নাবালক যতক্ষণ না বালেগ হয়।" (আবু দাউদ: ৪৩৯৮, তিরমিজি: ১৪২৩ - সহিহ)
দ্বিতীয় অবস্থা: যদি রাগ থাকে কিন্তু ব্যক্তি তার কথা ও কাজ সম্পর্কে সচেতন থাকে, কী বলছে তা জানে, তবে সেই অবস্থায় তালাক পতিত হবে। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন:
"যদি রাগের কারণে ব্যক্তি এমন অবস্থায় পৌঁছে যায় যে, সে কী বলছে তা জানে না, তবে তালাক পতিত হবে না। কিন্তু যদি সে জানে যে, সে তালাক দিচ্ছে এবং তার উদ্দেশ্য থাকে তালাক দেওয়া, তবে তালাক পতিত হবে।"
২. আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান
যেহেতু আপনার স্বামী রাগের পর বলছেন যে, "আমি বুঝতে পারিনি কী বলেছি, আমার নিয়ন্ত্রণ ছিল না" - এটি একটি দাবি। কিন্তু শরিয়তের নিয়ম হলো:
- যদি তিনি সত্যিই এমন অবস্থায় ছিলেন যে, তিনি কী বলছেন তা বুঝতেন না (সম্পূর্ণ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন), তাহলে সেই তালাক পতিত হবে না।
- কিন্তু যদি তিনি জানতেন যে তিনি তালাক দিচ্ছেন, শুধু রাগের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন, তাহলে তালাক পতিত হয়ে যাবে।
গুরুত্বপূর্ণ: সাধারণত রাগের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে এই নয় যে, ব্যক্তি সম্পূর্ণ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। যতক্ষণ না ব্যক্তি অজ্ঞান/পাগলের মতো অবস্থায় পৌঁছে যায়, ততক্ষণ তার তালাক পতিত হবে।
৩. বহুবার তালাক দেওয়ার পরিণতি
আপনি বলেছেন তিনি আপনাকে বহুবার তালাক দিয়েছেন। ইসলামি বিধান অনুযায়ী:
- প্রথম ও দ্বিতীয় তালাক: এই দুটি তালাকের পর স্বামী-স্ত্রী ইদ্দতের মধ্যে ফিরে আসতে পারে (রুজু)।
- তৃতীয় তালাক: তৃতীয় তালাকের পর স্ত্রী তার স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যায়। তাকে পুনরায় বিবাহ করা যাবে না, যতক্ষণ না তিনি অন্য কোনো পুরুষের সাথে বৈধ বিবাহ করেন এবং সেই বিবাহে সহবাস হয় এবং তারপর সেই স্বামী তাকে তালাক দেয় বা মৃত্যু হয় (হালালা)।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
"অতঃপর যদি সে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়, তবে তারপর সে তার জন্য বৈধ হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিবাহ করে।" (সূরা আল-বাকারা: ২৩০)
৪. আপনার করণীয়
১. আপনার স্বামীকে জিজ্ঞাসা করুন: তিনি কতবার তালাক দিয়েছেন এবং কোন অবস্থায় দিয়েছেন তা স্পষ্টভাবে জানুন। ২. যদি ৩ বারের কম হয়: তাহলে ইদ্দতের মধ্যে থাকলে রুজু (ফিরে আসা) করতে পারবেন। ৩. যদি ৩ বার বা তার বেশি হয়: তাহলে তালাক পতিত হয়ে গেছে এবং আপনারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একসাথে থাকতে পারবেন না। পুনরায় বিবাহের জন্য হালালা প্রয়োজন।
৫. শায়খ ইবনে বায (রহ.)-এর মত
শায়খ ইবনে বায (রহ.) বলেছেন:
"যদি কোনো ব্যক্তি রাগের অবস্থায় তালাক দেয় এবং সে জানে না সে কী বলছে, তবে তালাক পতিত হবে না। কিন্তু যদি সে জানে যে সে তালাক দিচ্ছে, তবে তালাক পতিত হবে, যদিও সে রাগী থাকে।"
৬. শায়খ আল-আলবানী (রহ.)-এর মত
শায়খ আল-আলবানী (রহ.) বলেছেন:
"রাগের কারণে তালাক পতিত না হওয়ার শর্ত হলো, রাগ এমন পর্যায়ে পৌঁছানো যে, ব্যক্তি সম্পূর্ণ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কিন্তু সাধারণ রাগের কারণে তালাক পতিত হবে।"
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনার ক্ষেত্রে:
১. যদি আপনার স্বামী সত্যিই এমন অবস্থায় ছিলেন যে, তিনি কী বলছেন তা বুঝতেন না পরবর্তীতেও বলতে পারেননা (যেমন: অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা পাগলের মতো অবস্থা) - তাহলে তালাক পতিত হয়নি।
২. যদি তিনি জানতেন যে তিনি তালাক দিচ্ছেন কিন্তু শুধু রাগের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন - তাহলে তালাক পতিত হয়েছে।
৩. বহুবার তালাক দেওয়ার কারণে যদি তা ৩ বার বা তার বেশি হয়ে থাকে, তাহলে তালাক পতিত হয়ে গেছে এবং আপনারা একসাথে থাকতে পারবেন না।
আপনার উচিত কোনো ফাতওয়া বিভাগে গিয়ে পুরো বিষয়টি খুলে বলা এবং তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করা। কারণ এখানে বিস্তারিত জানা জরুরি - কতবার, কখন, কী অবস্থায় তালাক দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন।