স্বামী বাসায় আসতে দেড়ী হওযায় স্ত্রী যদি আগেই ঘুমিয়ে পরে, তাহলে কি স্বামীর হক নষ্ট হবে?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি একজন গৃহিণী হিসেবে সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব একা হাতে সামলাচ্ছেন, সন্তানদের পড়াশোনা দেখছেন, ঘর পরিচ্ছন্ন রাখছেন—এটা সত্যিই অনেক বড় পরিশ্রমের কাজ। আল্লাহ তায়ালা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আপনার ক্লান্তি, বিরক্তি এবং মোবাইল আসক্তি—এসব স্বাভাবিক মানবিক দুর্বলতা। আপনি একা নন, অনেক মা-বোনই এই সমস্যার সম্মুখীন হন। আশা করি, নিম্নোক্ত পরামর্শগুলো আপনার জন্য উপকারী হবে।
১. স্বামী ও সন্তানদের হক সম্পর্কে:
আপনি জিজ্ঞেস করেছেন, ক্লান্ত হয়ে আগে ঘুমিয়ে পড়লে স্বামী ও সন্তানদের হক নষ্ট হবে কিনা?
ইসলামে স্ত্রীর উপর স্বামীর কিছু অধিকার রয়েছে এবং মা হিসেবে সন্তানদের প্রতিও দায়িত্ব রয়েছে। তবে ইসলাম ধর্ম কখনোই অসম্ভব কষ্টের নির্দেশ দেয়নি। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا "আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।" (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)
আপনি যদি সত্যিই ক্লান্ত হয়ে থাকেন এবং স্বামীর জন্য খাবার বাড়িয়ে রেখে দেন, তাহলে আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর আপনি ঘুমিয়ে পড়লে আপনার ওপর কোনো গুনাহ হবে না। তবে চেষ্টা করবেন, স্বামী বাসায় এলে তার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলা এবং তার খোঁজখবর নেওয়া। এটি দাম্পত্য সম্পর্ক মজবুত করে। যদি সম্ভব হয়, তাহলে বড় মেয়েকে ছোটদের পড়াশোনায় সাহায্য করতে উৎসাহিত করুন, যাতে আপনার ওপর চাপ কিছুটা কমে।
২. রাগ ও জিহ্বা নিয়ন্ত্রণের জন্য আমল ও চর্চা:
রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য ইসলামে অসংখ্য নির্দেশনা রয়েছে। রাগের সময় করণীয় সম্পর্কে হাদিসে এসেছে:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের কেউ যখন রাগান্বিত হয়, তখন সে যদি দাঁড়ানো থাকে, তবে যেন বসে পড়ে। যদি এতে রাগ না কমে, তবে যেন শুয়ে পড়ে।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৮২)
আরেকটি হাদিসে আছে, রাগের সময় "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়তে বলা হয়েছে। (সহিহ বুখারি: ৬১১৫)
কিছু কার্যকরী আমল ও চর্চা:
- রাগের মুহূর্তে: চিৎকার করার বদলে চুপ করে থাকুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের কেউ যেন রাগের সময় কথা না বলে।" (মুসনাদ আহমাদ: ১৫)
- অজু করুন: রাগের সময় অজু করা খুবই কার্যকরী। হাদিসে আছে, রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে আসে, আর শয়তান আগুন থেকে সৃষ্ট। তাই অজু করলে রাগ কমে যায়। (সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৮৪)
- দৈনিক আমল: প্রতিদিন ফজরের পর এবং ঘুমানোর আগে "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" সহ "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" বেশি বেশি পড়ুন। এতে শয়তানের প্রভাব থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়।
- মাসনুন দোয়া: রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য এই দোয়াটি পড়তে পারেন:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي، وَأَذْهِبْ غَيْظَ قَلْبِي، وَأَجِرْنِي مِنَ الشَّيْطَانِ "হে আল্লাহ! আমার গুনাহ মাফ করুন, আমার অন্তরের ক্রোধ দূর করুন এবং শয়তান থেকে আমাকে রক্ষা করুন।" (সুনানে তিরমিজি: ৩৫৫১)
৩. মোবাইল আসক্তি থেকে মুক্তির উপায়:
আপনি বলেছেন, ফেসবুক-ইউটিউব চালান না, তবে বান্ধবীদের মেসেজে সময় কাটে। এটি একটি আসক্তিতে পরিণত হয়েছে। এর সমাধানে:
- নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করুন: দিনে ১৫-২০ মিনিটের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন (যেমন: দুপুরে বাচ্চারা ঘুমালে) যখন আপনি মেসেজ দেখবেন। এর বাইরে ফোন হাতের নাগালে না রাখার চেষ্টা করুন।
- ফোনের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন: বান্ধবীদের মেসেজের নোটিফিকেশন বন্ধ করে দিন। এতে বারবার ফোন দেখার তাগিদ কমবে।
- বিকল্প ব্যস্ততা: যখন শরীর বিশ্রাম চায়, তখন ফোনের বদলে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকুন, অথবা জিকির করুন। যেমন: "সুবহানাল্লাহ", "আলহামদুলিল্লাহ", "আল্লাহু আকবার" ইত্যাদি। এতে মনও শান্ত হবে এবং শরীরও বিশ্রাম পাবে।
৪. মানসিক চাপ ও ক্লান্তি দূর করার উপায়:
আপনার মনে হচ্ছে মানসিক সমস্যা হয়েছে। এটি মূলত অতিরিক্ত পরিশ্রম ও বিশ্রামের অভাবে হয়ে থাকে। তাই:
- স্বামীর সাথে কথা বলুন: আপনার ক্লান্তি ও চাপের কথা স্বামীকে জানান। তিনি রাতে ১১টার পর বাসায় আসেন, তাই সপ্তাহে একদিন ছুটির দিনে (যদি থাকে) তাকে অনুরোধ করুন, বাচ্চাদের পড়াশোনায় বা অন্য কাজে একটু সাহায্য করতে। অথবা ছুটির দিনে বাচ্চাদের নিয়ে বাইরে বের হওয়ার পরিকল্পনা করুন, এতে আপনার মন ভালো থাকবে।
- পর্যাপ্ত ঘুম: চেষ্টা করুন, দিনে অন্তত ৬-৭ ঘণ্টা ঘুমানোর। ঘুম কম হলে শরীর ও মন দুটোই খারাপ থাকে। বাচ্চারা ঘুমালে আপনিও কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন।
- সাহায্য নিন: বাচ্চাদের বয়স অনুযায়ী ছোট ছোট কাজ তাদের দিয়ে করান। যেমন: নিজের বিছানা গোছানো, নিজের থালা ধুয়ে রাখা ইত্যাদি। এতে তাদের দায়িত্ববোধও বাড়বে এবং আপনার কাজের চাপও কমবে।
৫. দায়িত্বের প্রতি অটুট থাকার আমল:
- নিয়ত ঠিক করুন: প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নিয়ত করুন—"আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সংসারের কাজ করছি, সন্তানদের মানুষ করছি।" নিয়ত ঠিক থাকলে প্রতিটি কাজই ইবাদতে পরিণত হয় এবং ক্লান্তিও কম অনুভূত হয়।
- দোয়া পড়ুন: প্রতিদিন এই দোয়াটি পড়ুন:
رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي "হে আমার রব! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজ সহজ করে দিন।" (সূরা ত্বহা: ২৫-২৬)
- সালাতের পর দোয়া: প্রতিটি ফরজ সালাতের পর এই দোয়াটি পড়ুন:
اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ "হে আল্লাহ! আপনার জিকির, আপনার শুকরিয়া এবং উত্তম ইবাদত করার জন্য আমাকে সাহায্য করুন।" (সুনানে আবু দাউদ: ১৫২২)
৬. গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:
- নিজেকে দোষারোপ করবেন না: আপনি অনেক চেষ্টা করছেন, কিন্তু দুর্বলতা আসবেই। নিজেকে অতিরিক্ত দোষারোপ করবেন না। আল্লাহ তায়ালা দুর্বল বান্দাদের প্রতি দয়ালু। তওবা করতে থাকুন, আল্লাহ ক্ষমাশীল।
- ধৈর্য ধরুন: রাগ ও জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ একদিনে সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে চর্চা করতে থাকুন। প্রতিদিন একটু একটু করে উন্নতি করলেই হবে।
- ইস্তেগফার বেশি করুন: "আস্তাগফিরুল্লাহ" বেশি বেশি পড়ুন। এতে অন্তর পরিশুদ্ধ হয় এবং রাগ কমে।
আল্লাহ তায়ালা আপনার সব কষ্ট দূর করুন, আপনার সংসারে বরকত দিন এবং আপনাকে ধৈর্য ও দৃঢ়তা দান করুন। আমিন।