স্বামী স্ত্রীর একে অপরের প্রতি হক
Family Life · Hanafi
Question
অপরদিকে আমার স্বামী ও সন্তানদের প্রতি আমার ফরজ/ওয়াজিব দায়িত্ব কোনগুলো! ব্যাপক ভাবে না বলে একটু কাজগুলো ভেঙে ভেঙে বললে উপকার হয়! আমার স্বামীর কাছ থেকে আমি প্রতি মাসে কিছু টাকা হাত খরচ নিই যেগুলো তার সাধ্যের মধ্যেই। আগে আমি নিতাম না, কিন্তু এখন নিচ্ছি। আমি আরও বেশি চেয়েছিলাম, পরে মিউচুয়্যাল সিদ্ধান্তে একটা এমাউন্ট ফিক্সড হয়। এই টাকা প্রতি মাসেই আমার চেয়ে চেয়ে অনেকবার বলে বলে নিতে হয়৷ আমি নিজ হাতে নিইনা৷ উনি নিজেই আমার হাতে দেন। তবু মাঝে মাঝে এই টাকার খোটা দেন। আর দিবেনা বলে থ্রেট দেন। আমিও জেদের বশে বলে ফেলি না দিলে থাকবোনা। বিভিন্ন অমীমাংসিত কারণে জেদ জমে থাকে৷ যেগুলো তিনি কখনো মিটমাট করার চেষ্টাই করেন না। জানতে চাই যে, হাত খরচের টাকা নেয়া কি জুলুম বা হক নষ্ট হচ্ছে? তার উপর আমার ফরজ/ওয়াজিব দায়িত্ব কোনগুলো! একটু কাজগুলো ভেঙে ভেঙে উপকার হয়
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। আমি কুরআন, হাদীস এবং হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।
১. স্ত্রী-সন্তানকে সময় দেওয়া কি ফরজ বা ওয়াজিব?
উত্তর: হ্যাঁ, স্ত্রী-সন্তানকে সময় দেওয়া স্বামীর উপর ওয়াজিব (অত্যাবশ্যকীয়) দায়িত্ব। যদিও এর নির্দিষ্ট পরিমাণ শরীয়তে নির্ধারিত নয়, তবে পরিবারের সাথে সদাচরণ, ভালোবাসা ও সময় ব্যয় করা ইসলামী নির্দেশ।
দলিল:
১. কুরআন: আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "আর তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার করো।" (সূরা আন-নিসা: ১৯)
স্ত্রীর সাথে সদ্ব্যবহারের মধ্যে তার সাথে সময় কাটানো, কথা বলা, আবেগগত ও মানসিক চাহিদা পূরণ করাও অন্তর্ভুক্ত।
২. হাদীস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম, আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।" (তিরমিযী: ৩৮৯৫; ইবনে মাজাহ: ১৯৭৭)
৩. হাদীস: রাসূলুল্লাহ ﷺ স্বীয় স্ত্রীদের সাথে সময় কাটাতেন এবং তাদের সাথে খেলাধুলা ও কথাবার্তা বলতেন। (বুখারী: ৫২১১)
৪. হানাফী ফিকহ: রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)-এ উল্লেখ আছে যে, স্ত্রীর উপর স্বামীর হক যেমন আছে, তেমনই স্বামীর উপর স্ত্রীর হক রয়েছে—সাথে সদাচরণ, ভালোবাসা ও প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫০)
সারকথা: স্ত্রী-সন্তানকে সম্পূর্ণ সময় না দেওয়া এবং তাদের সাথে সম্পর্কহীন আচরণ করা শরীয়তসম্মত নয়। এটি স্ত্রী-সন্তানের হক নষ্ট করা। আর এটি গুনাহের কাজ।
২. স্ত্রীর উপর স্বামীর হক (ফরজ/ওয়াজিব দায়িত্ব)
স্ত্রী হিসেবে আপনার উপর স্বামীর যেসব হক ফরজ/ওয়াজিব, সেগুলো হলো:
ক. আনুগত্য (ইসলামী সীমার মধ্যে)
- স্বামীর বৈধ আদেশ মেনে চলা ফরজ।
- তবে আল্লাহর নাফরমানির আদেশ মানা জায়েয নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ "সৃষ্টিকর্তার নাফরমানিতে সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (মুসনাদ আহমাদ: ১০৯৮)
খ. স্বামীর সম্পদ রক্ষা করা
- স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার সম্পদ ও সম্মান রক্ষা করা ফরজ। কুরআনে বলা হয়েছে,
فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِّلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ "সৎকর্মপরায়ণা স্ত্রীগণ অনুগতা এবং আল্লাহ যা হিফাযত করেছেন তার অভাবে (স্বামীর অনুপস্থিতিতে) তা হিফাযতকারিণী।" (সূরা আন-নিসা: ৩৪)
গ. স্বামীর ঘর ও সন্তানদের দেখাশোনা
- ঘর পরিচালনা, সন্তানদের লালন-পালন ও শিক্ষাদান স্ত্রীর দায়িত্ব। এটি ফরজে কেফায়া পর্যায়ের।
ঘ. স্বামীর সাথে সদাচরণ
- স্বামীর সাথে ভালো ব্যবহার করা, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তার সাথে সম্মানজনক আচরণ করা ওয়াজিব।
ঙ. স্বামীর বৈধ শারীরিক চাহিদা পূরণ
- স্বামীর বৈধ দৈহিক চাহিদা পূরণ করা ফরজ, যদি কোনো শরয়ী ওজর না থাকে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫০)
চ. স্বামীর পরিবারের সাথে সদাচরণ
- শ্বশুর-শাশুড়ি ও স্বামীর আত্মীয়দের সাথে সদাচরণ করা মুস্তাহাব।
৩. স্বামীর উপর স্ত্রীর হক (ফরজ/ওয়াজিব দায়িত্ব)
স্বামীর উপর স্ত্রীর যেসব হক ফরজ/ওয়াজিব, সেগুলো হলো:
ক. মোহর (দেনমোহর) প্রদান
- মোহর আদায় করা ফরজ। কুরআনে বলা হয়েছে,
وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً "আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান করো।" (সূরা আন-নিসা: ৪)
খ. খোরপোষ (ভরণপোষণ) প্রদান
- স্ত্রীর খাওয়া, পরা, থাকা স্বামীর উপর ফরজ। (সূরা আত-তালাক: ৭; রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৭২)
গ. স্ত্রীর সাথে সদাচরণ
- স্ত্রীর সাথে ভালো ব্যবহার করা, তার সাথে নম্র কথা বলা এবং তাকে সম্মান করা ফরজ। (সূরা আন-নিসা: ১৯)
ঘ. স্ত্রীকে সময় দেওয়া
- স্ত্রীর সাথে সময় কাটানো, তার সাথে কথা বলা এবং তার মানসিক চাহিদা পূরণ করা ওয়াজিব। (তিরমিযী: ৩৮৯৫)
ঙ. স্ত্রীর সাথে ন্যায়বিচার
- একাধিক স্ত্রী থাকলে তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করা ফরজ। (সূরা আন-নিসা: ৩)
৪. হাত খরচের টাকা নেওয়া কি জুলুম?
উত্তর: না, হাত খরচের টাকা নেওয়া জুলুম নয়। বরং এটি আপনার বৈধ অধিকার। স্বামীর উপর স্ত্রীর খোরপোষ দেওয়া ফরজ, এবং হাত খরচ এর অন্তর্ভুক্ত।
তবে কিছু বিষয় লক্ষণীয়:
১. স্বামীর সাধ্যের মধ্যে থাকা: আপনি বলেছেন, টাকাটি তার সাধ্যের মধ্যে। তাই এটি গ্রহণ করা জায়েয।
২. মিউচুয়াল সিদ্ধান্ত: আপনি উভয়ে মিলে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন, এটি উত্তম।
৩. খোটা দেওয়া ও থ্রেট করা: স্বামীর এই আচরণ ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী। স্ত্রীকে খোরপোষ দেওয়া তার ফরজ দায়িত্ব, এতে খোটা দেওয়া বা না দেওয়ার হুমকি দেওয়া উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيُوَقِّرْ كَبِيرَنَا "যে আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (তিরমিযী: ১৯২০)
৪. জেদের বশে কথা বলা: আপনি বলেছেন, জেদের বশে "না দিলে থাকবোনা" বলে ফেলেছেন। এটি উচিত হয়নি। তবে এটি গুনাহ নয়, বরং রাগের বশে বলা কথা। ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা বলা থেকে বিরত থাকা উচিত।
৫. স্বামীর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের পরামর্শ
১. ধৈর্য ও সবর স্বামীর সাথে ধৈর্য ধরে কথা বলুন। রাগের মুহূর্তে নয়, বরং শান্ত পরিবেশে।
২. দোয়া: স্বামীর হেদায়েতের জন্য দোয়া করুন। দোয়া সব সমস্যার সমাধান।
৩. ভালোভাবে বোঝান: তাকে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝান যে, পরিবারকে সময় দেওয়া ও খোরপোষ দেওয়া তার দায়িত্ব।
৪. আত্মীয়দের মাধ্যমে: প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করুন।
৫. সন্তানদের শিক্ষা: সন্তানদের ভালোভাবে ইসলামী শিক্ষা দিন, যাতে তারা দ্বীনের উপর থাকে।
৬. জেদ ও অমীমাংসিত সমস্যা সম্পর্কে
আপনি বলেছেন, বিভিন্ন অমীমাংসিত কারণে জেদ জমে থাকে। এ বিষয়ে ইসলামী নির্দেশনা হলো:
১. ক্ষমা ও সহনশীলতা: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ وَمَا زَادَ اللَّهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ إِلَّا عِزًّا "দান-সদকা সম্পদ কমায় না, আর বান্দা ক্ষমা করার কারণে আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।" (মুসলিম: ২৫৮৮)
২. ঝগড়া না করা: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلَاثٍ "মুসলিমের জন্য জায়েয নয় যে, সে তার ভাইকে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক ছিন্ন করে রাখবে।" (বুখারী: ৬০৭৭)
৩. সমঝোতার চেষ্টা: কুরআনে বলা হয়েছে,
وَإِنِ امْرَأَةٌ خَافَتْ مِنْ بَعْلِهَا نُشُوزًا أَوْ إِعْرَاضًا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَنْ يُصْلِحَا بَيْنَهُمَا صُلْحًا وَالصُّلْحُ خَيْرٌ "আর যদি কোনো স্ত্রী তার স্বামীর পক্ষ থেকে অবজ্ঞা বা উপেক্ষার আশঙ্কা করে, তবে উভয়ে নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করলে তাদের কোনো গুনাহ নেই, আর সমঝোতা উত্তম।" (সূরা আন-নিসা: ১২৮)
৭. সংক্ষিপ্ত উপসংহার
১. স্ত্রী-সন্তানকে সময় দেওয়া স্বামীর উপর ওয়াজিব। এটি নষ্ট করা গুনাহ। ২. হাত খরচের টাকা নেওয়া আপনার বৈধ অধিকার। এটি জুলুম নয়। ৩. স্বামীর খোটা দেওয়া ও থ্রেট করা ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী। ৪. স্ত্রী হিসেবে আপনার দায়িত্ব: স্বামীর আনুগত্য (বৈধ বিষয়ে), তার সম্পদ রক্ষা, সন্তানদের দেখাশোনা, তার সাথে সদাচরণ। ৫. স্বামীর দায়িত্ব: মোহর, খোরপোষ, সদাচরণ, সময় দেওয়া, ন্যায়বিচার। ৬. সমস্যা সমাধানে: ধৈর্য, দোয়া, শান্তভাবে কথা বলা এবং প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের মাধ্যমে সমাধান।
আল্লাহ তাআলা আপনার পরিবারে শান্তি ও ভালোবাসা দান করুন এবং আপনার স্বামীকে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। আমীন।