স্ত্রীর সাজগোজের প্রতি স্বামীর আগ্রহ না থাকলে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে করণীয় কী?
Family Life · Hanafi
Question
সম্মানিত উস্তায, আমার স্বামী সকাল থেকে রাত ১১/১২ টা পর্যন্ত বাইরে কঠোর পরিশ্রম করেন। আমি মাঝে মাঝে তাকে খুশি করার জন্য খুব ভালোবেসে, পরম যত্নে ও আগ্রহে তার জন্য সাজি। আল্লাহর অশেষ দয়ার তিনি আমাকে পর্যাপ্ত সৌন্দর্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন মাশা আল্লাহ। কিন্তু আমার স্বামী কখনো আমার সৌন্দর্যের প্রশংসা করেনা। আমি সাজগোজ করলেও কেমন যেন খুবই ফর্মাল আচরন, চোখে কোন মুগ্ধতা দেখিনা। এমনও হয়েছে তিনি ভালো করে দেখেনওনা আমার সাজ। রাগে দুঃখে কষ্টে অনেক কেদেছি, ঝগড়া করেছি, অভিমান করেছি। কিন্তু প্রতিবার একই আচরণ। ফলে আমি অসম্ভব কষ্ট পাই। তার প্রতি আমি অত্যাধিক সেন্সিটিভ হওয়ায় আমার মনে এসব কষ্ট গভীরতর হচ্ছে। আমি বারবার অভিমান করে বলেছি, তুমি নিজের ইচ্ছায় আমার সাজ দেখতে না চাইলে আমি কখনো সাজবোনা। কিন্তু আমার স্বামী নিরব,নিরুত্তর বরাবরই। এবং ১৩ বছরেও তিনি আমার এরকম বারবার অভিমান আর জেদের পরেও নিজে থেকে সাজ চাননি। তবু বেহায়া মন৷ বার বার সেজেছি, তার উদাসীন বা ফর্মাল আচরণে বারবারই কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু আজ প্রায় ৬/৭ মাস যাবৎ আমি পুরোপুরি ভেঙে গিয়েছি। আমার আর ইচ্ছা করেনা। তবে এরমধ্যেও নানান সুযোগে, ইনিয়ে বিনিয়েও আমি তাকে বুঝানোর চেষ্টা করেছি, নিজে থেকে না চাইলে আমি আর কখনো সাজবোনা। তবুও তিনি প্রতিক্রিয়াহীন। আমি যখন এসব নিয়ে আগে অভিযোগ করেছি তিনি বারবারই বলেছন, "তোমার মন চাইলে সাজবা, না চাইলে নাই। আমার এত আজাইরা ইমোশন আর অভিযোগ শুনার টাইম নাই। এত শখ থাকলে নিজে নিজে সেজে দেখালেই তো পারো। " যদি আমি বলি, "নিজে নিজে করবো? কেন তোমার ইচ্ছা করেনা দেখতে! আমার কাছে আবদার নাই?" তাঁর উত্তর, "আমার এসব নিয়ে কোন মাথাব্যথা নাই। তুমি সাজলেও আমার সমস্যা নাই, না সাজলেও আমার সমস্যা নাই!" মানে আমার সাজা না সাজা পুরোটাই আমার শখের উপর নির্ভরশীল, তার এতে কোন মাথাব্যথা নাই।
এইতো গেলো মুখের কথা! তিনি আমাকে ১৩ বছরের ম্যারিড লাইফে কোন সাজগোজের জিনিস শখ করে কিনে এনে দেয়নি। কখনো বলেনি, তোমাকে এভাবে ভালো লাগে, তোমাকে এটাতে ভালো লাগে। এটা পরলে ভালো লাগবে! কক্ষনো না! উস্তায! আমার স্বামীর কাছে এটা কি আমার অন্যায় এক্সপেকটেশন হয়ে যাচ্ছে? এতকিছুর পরে, আমি যদি না সাজি তাহলে কি তার হক নষ্ট হবে? আসলে আমার করনীয় টা কি উস্তায! আমার খুব বেশি কষ্ট হয় এটার জন্য! অনেক সময় কষ্ট এতটা গভীর হয় যে, আমার তাকে দেখলেই বিরক্তি আসে, অসহ্য লাগে। আমাকে পরামর্শ, নসীহাহ, উপায় যা পারুন দিন উস্তায। আমি শুধু একটু স্থিরতা চাই আমার মনে। মনের মধ্যে এত কষ্ট আর অভিমান নিয়ে আমি সন্তানদের তারবিয়াত ঠিকঠাক নিতে পারিনা অনেক সময়। আল্লাহ তায়ালা আমাকে মাফ করুন
Answer
Answer: স্ত্রীর সাজগোজের প্রতি স্বামীর আগ্রহ না থাকলে করণীয়
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার কষ্ট ও অভিমান সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং মানবিক। একজন স্ত্রী হিসেবে স্বামীর কাছে নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা এবং তার প্রশংসা কামনা করা আপনার স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা। তবে বিষয়টি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক পাওয়া যায়।
১. স্ত্রীর সাজগোজের বিধান:
ইসলামে স্ত্রীর জন্য স্বামীর সামনে সাজগোজ করা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) এবং এটি দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা বৃদ্ধির একটি মাধ্যম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবীদেরকে স্ত্রীদের সাজগোজের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয়। অর্থাৎ, স্ত্রী সাজগোজ না করলে তার ওপর কোনো গুনাহ হবে না, তবে সাজগোজ করা উত্তম এবং সওয়াবের কাজ।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা আন-নিসা: ১৯)
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।" (তিরমিজি: ১১৬২)
২. স্বামীর আচরণ বিশ্লেষণ:
আপনার স্বামী দীর্ঘ সময় বাইরে কঠোর পরিশ্রম করেন। সম্ভবত তিনি ক্লান্ত থাকেন এবং সাজগোজের বিষয়টিকে ততটা গুরুত্ব দেন না। তবে তার এই উদাসীনতা আপনার প্রতি ভালোবাসার অভাব নয়, বরং এটি তার ব্যক্তিত্ব বা মানসিকতার অংশ হতে পারে। অনেক পুরুষই স্ত্রীর সাজগোজের প্রতি তেমন সংবেদনশীল নন, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তারা স্ত্রীকে ভালোবাসেন না।
৩. আপনার করণীয়:
১. ধৈর্য ধারণ করুন:
আপনার স্বামীর প্রতি ধৈর্য ধরুন এবং তার কঠোর পরিশ্রমের কথা চিন্তা করুন। তিনি আপনার এবং সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য এত পরিশ্রম করছেন। তার এই অবদানকে সম্মান করুন।
২. সাজগোজ চালিয়ে যান:
সাজগোজ করা আপনার জন্য মুস্তাহাব এবং এটি দাম্পত্য জীবনের জন্য উপকারী। এমনকি যদি আপনার স্বামী প্রশংসা না করেন, তবুও আপনি সাজগোজ করতে পারেন। এটি আপনার নিজের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে এবং আপনার মন ভালো রাখবে।
৩. স্বামীর সাথে নরমভাবে কথা বলুন:
অভিমান বা ঝগড়ার পরিবর্তে নরম ও বিনয়ী ভাষায় আপনার অনুভূতি প্রকাশ করুন। তাকে বলুন, "আমি তোমার জন্য সাজতে ভালোবাসি, কিন্তু তোমার প্রশংসা না পেলে আমার মন খারাপ হয়।" তবে মনে রাখবেন, তাকে বোঝানোর সময় তার ক্লান্তি ও ব্যস্ততাকে সম্মান করুন।
৪. নিজের জন্য সাজুন:
আপনার সাজগোজ শুধু স্বামীর জন্য নয়, নিজের জন্যও করুন। নিজেকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখা একজন মুসলিম নারীর বৈশিষ্ট্য। এটি আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়াবে এবং আপনার মন ভালো রাখবে।
৫. সন্তানদের তারবিয়াতের দিকে মনোযোগ দিন:
আপনার সন্তানদের শিক্ষা ও তরবিয়াত আপনার প্রধান দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে মনোযোগ দিন এবং সাজগোজের বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করবেন না।
৪. স্বামীর হক সম্পর্কে:
স্বামীর হক হলো স্ত্রী তার প্রতি আনুগত্য দেখাবে এবং তাকে খুশি রাখবে। তবে সাজগোজ করা স্বামীর হক নয়, বরং এটি একটি উত্তম কাজ। আপনি যদি সাজগোজ না করেন, তাহলে আপনার ওপর কোনো গুনাহ হবে না। তবে সাজগোজ করা উত্তম এবং এটি দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা বৃদ্ধি করে।
৫. চূড়ান্ত পরামর্শ:
১. আপনার স্বামীর প্রতি অভিমান বা বিরক্তি পোষণ করবেন না।
২. তার ভালো গুণগুলো চিন্তা করুন এবং তার কঠোর পরিশ্রমের মূল্য দিন।
৩. সাজগোজের বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করে নিজের ইবাদত, সন্তানদের তরবিয়াত এবং দাম্পত্য জীবনের অন্যান্য দিকগুলোতে মনোযোগ দিন।
৪. আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আপনার স্বামীর হৃদয় নরম করেন এবং আপনার দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা বৃদ্ধি করেন।
আল্লাহ তাআলা আপনার কষ্ট দূর করুন এবং আপনার দাম্পত্য জীবনকে সুখময় করুন। আমিন।