গনতন্ত্র সম্পর্কে হানাফি মাযহাবের মত
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
গণতন্ত্র সম্পর্কে হানাফি মাযহাবের মত
উত্তর:
গণতন্ত্র সম্পর্কে হানাফি মাযহাবের মত জানার আগে আমাদের বুঝতে হবে যে, ইসলামী শাসনব্যবস্থা এবং গণতন্ত্রের মধ্যে সম্পর্ক কী। হানাফি মাযহাবের ফকীহগণ শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে যেসব নীতিমালা দিয়েছেন, তা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে।
মূলনীতি
হানাফি মাযহাবের মূলনীতি হলো:
১. শাসক নির্বাচনের পদ্ধতি: ইসলামে শাসক নির্বাচনের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, শাসক (খলিফা/আমির) নির্বাচিত হবেন মুসলিমদের ঐকমত্য বা শুরা (পরামর্শ) এর মাধ্যমে। ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর মতে, খলিফা নির্বাচন হবে যোগ্য ব্যক্তিদের পরামর্শের ভিত্তিতে।
২. শুরা (পরামর্শ) নীতি: কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ "আর তাদের কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে হয়।" (সূরা আশ-শূরা: ৩৮)
হানাফি মাযহাব শুরা নীতিকে গুরুত্ব দেয়, যা গণতন্ত্রের সাথে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ।
৩. আমানত ও দায়িত্ব: ইসলামে শাসনকে আমানত হিসেবে গণ্য করা হয়। হাদিসে আছে, "তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।" (বুখারী ও মুসলিম)
হানাফি আলেমদের মত
১. ইমাম আবু হানিফা (রহঃ): তিনি শাসকের বিরুদ্ধে অন্যায় প্রতিরোধের কথা বলেছেন। তিনি জুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং শাসকের কাছে সত্য বলতে দ্বিধা করতেন না।
২. মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহঃ): তিনি গণতন্ত্র সম্পর্কে বলেছেন যে, ইসলামী শাসনব্যবস্থা গণতন্ত্র থেকে ভিন্ন। ইসলামে আইন প্রণয়নের অধিকার একমাত্র আল্লাহর। তবে ইসলামে শুরা বা পরামর্শের মাধ্যমে শাসক নির্বাচন ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিধান রয়েছে।
৩. মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম): তিনি বলেছেন, ইসলামী শাসনব্যবস্থা "সীমিত গণতন্ত্র" এর মতো। ইসলামে জনগণের মতামত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা কুরআন ও সুন্নাহর সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ। তিনি গণতন্ত্রকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ বা বর্জন না করে ইসলামী নীতিমালার আলোকে মূল্যায়নের কথা বলেছেন।
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
১. আইন প্রণয়ন: হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, আইন প্রণয়নের মূল উৎস হলো কুরআন ও সুন্নাহ। মানুষের তৈরি আইন কুরআন-সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক হলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
২. শাসক নির্বাচন: হানাফি ফিকহে শাসক নির্বাচনের জন্য যোগ্যতা, আমানতদারিতা এবং ন্যায়পরায়ণতা শর্ত। জনগণের সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ, তবে তা ইসলামী নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
৩. ন্যায়বিচার: হানাফি মাযহাব ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব মনে করে। যেকোনো শাসনব্যবস্থা, তা গণতান্ত্রিক হোক বা অন্য যেকোনো, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হলে তা ইসলামী দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
সমসাময়িক প্রেক্ষাপট
আধুনিক যুগে অনেক ইসলামী পণ্ডিত গণতন্ত্রকে ইসলামী শুরা নীতির সাথে তুলনা করেছেন। তবে হানাফি মাযহাবের মূল অবস্থান হলো:
১. ইসলামী শাসনব্যবস্থা আল্লাহর আইনের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে। ২. জনগণের মতামত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা ইসলামী আইনের সীমার মধ্যে। ৩. শাসক হবে ন্যায়পরায়ণ, আমানতদার এবং যোগ্য। ৪. শাসক নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ থাকবে, তবে তা ইসলামী নীতিমালা অনুযায়ী।
সারসংক্ষেপ
হানাফি মাযহাব গণতন্ত্রকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করে না, আবার সম্পূর্ণরূপে বর্জনও করে না। ইসলামী দৃষ্টিতে গণতন্ত্রের যেসব দিক ইসলামী নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ (যেমন: শুরা, জনগণের মতামত, জবাবদিহিতা) তা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু যেসব দিক ইসলামী আইনের সাথে সাংঘর্ষিক (যেমন: আল্লাহর আইনের বিপরীতে আইন প্রণয়ন) তা গ্রহণযোগ্য নয়।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।