পেয়াজ খেয়ে নামাজ, দাঁতে খাবার থাকলে, থুথু গিলে ফেলা, চিন্তা করা এবং পুনরায় নামাজ পড়া সম্পর্কে বিধান জানতে চাই?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
১.পেয়াজ খেয়ে মসজিদে যাওয়া মাকরুহ এখন জানতে চেয়েছি যে নামাজ মাকরুহ হবে কিনা?
২.আমি নামাজে দাত ভালো ভাবে পরিস্কার করে যাই কিন্তু দেখা যায় হঠাৎ দাতে কিছু রয়েছে এখন কি নামাজ হয়েছে।
৩.A.আমি নামাজে ছিলাম আর মুখে অনেক থুথু জমে গেছিলো তাই গিলে ফেলেছি এখন সন্দেহ হচ্ছে যে কিছু মুখে চলে গেল কিনা।তাতে কি নামাজ হয়েছে?B.আমার সন্দেহ হয়েছিল যে আমার মুখে খাবার কিছু চলে এলো কিনা তাই থুথু জমিয়ে রেখেছিলাম এবং তিলাওয়াত করতে কষ্ট হচ্ছিল তাই গিলে ফেলেছিলাম নামাজ কি হয়েছে?C.নামাজে শুধু এই চিন্তা গুলো করছি চিন্তার কারনে নামাজ হয়েছে কিনা?
৪.নামাজে থাকা অবস্থায় এই নিয়ত করলে যে আবার এই নামাজ পড়ব কিন্তু পড়ে আর পড়া না হলে কি সেই নামাজ হবে?
৫.আর আমি নামাজ নিয়ে বেশি চিন্তা করি মানে খুব বেশি এই বেশি হতাসা কি ওয়াসওয়াসা?
আর ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন এতগোলো প্রশ্ন করতেছি।আগে ৩ টা করেছি তাই লিমিট শেষ।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। জবাব, আলহামদুলিল্লাহ।
আপনার প্রশ্নগুলোর জন্য ধন্যবাদ। নামাজ নিয়ে এত যত্নবান হওয়া এবং সঠিক মাসআলা জানার চেষ্টা করা খুবই ভালো দিক। আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর নিনশাহীভাবে দেওয়া হলো:
১. পেয়াজ খেয়ে মসজিদে যাওয়া ও নামাজের বিধান:
পেয়াজ, রসুন বা কাঁচা গন্ধযুক্ত কোনো বস্তু খেয়ে মসজিদে যাওয়া মাকরুহে তানযিহি (অপছন্দনীয়)। কারণ, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি পেয়াজ, রসুন বা লিকু খায়, সে যেন আমাদের মসজিদে না আসে, যতক্ষণ না তার গন্ধ দূর হয়।" (সহিহ মুসলিম: ৫৬৫)
তবে, নামাজ নিজে মাকরুহ হবে না। নামাজ সহীহ হয়ে যাবে। মাকরুহ হলো মসজিদে যাওয়া বা মসজিদে অবস্থান করা, নামাজ নয়। যদি গন্ধ দূর করার জন্য মিসওয়াক করা হয় বা পেয়াজ ভাজা হয় (যাতে গন্ধ কমে যায়), তাহলে মসজিদে যাওয়া জায়েয। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩২২; রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৬৫৮)
২. নামাজে দাঁতের মধ্যে খাবার থাকলে নামাজের বিধান:
যদি আপনি নামাজের আগে ভালোভাবে দাঁত পরিষ্কার করেন, কিন্তু নামাজের মধ্যে দেখতে পান যে দাঁতের ফাঁকে সামান্য খাবার (যেমন,ছানাবোট) লেগে আছে, তাহলে আপনার নামাজ সহীহ হয়ে গেছে। কারণ, এত অল্প পরিমাণ খাবার যা মুখে লেগে থাকে এবং গিলে ফেললে নামাজ নষ্ট হয় না। তবে, যদি তা গিলে ফেলেন এবং তা ছানাবোট এর সমান বা তার চেয়ে বড় হয়, তাহলে নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১০৯; রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৬৩৩)
৩. থুথু গিলে ফেলা ও নামাজের বিধান:
ক. নামাজে থুথু জমে গেলে তা গিলে ফেলা জায়েয এবং এতে নামাজের কোনো ক্ষতি হয় না। থুথু শরীরের ভেতরের জিনিস, এটি গিলে ফেললে নামাজ নষ্ট হয় না। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১০৯) আপনার সন্দেহের কারণে নামাজ নষ্ট হবে না। যতক্ষণ না নিশ্চিত হবেন যে মুখে খাবার চলে গেছে, ততক্ষণ নামাজ সহীহ।
খ. আপনি যদি সন্দেহের কারণে থুথু জমিয়ে রেখে থাকেন এবং তা গিলে ফেলেন, তাতেও নামাজ সহীহ হবে। কারণ, থুথু গিলে ফেলা নামাজ নষ্ট করে না। তবে, নামাজে থুথু জমিয়ে রাখা এবং গিলে ফেলা অনুচিত ও মাকরুহে তানযিহি। নামাযে কোনো সমস্যা হবে না, তবে থুথু জমে গেলে তা ফেলে দেওয়াই উত্তম (যেমন: রুমালে বা বাম পাশে ফেলে দেওয়া), কিন্তু গিলে ফেললেও নামাজ ভঙ্গ হবে না। (আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৮০)
গ. নামাজে শুধু চিন্তা করলে নামাজ ফাসিদ হয় না। তবে চিন্তা করলে নামাজের সওয়াব কমে যায়, কিন্তু নামাজ ভঙ্গ হয় না। নামাজ ভঙ্গ হওয়ার জন্য কোনো বাহ্যিক কাজ করতে হয় (যেমন: কথা বলা, খাওয়া, চলাফেরা করা)। শুধু মনে মনে চিন্তা করলে নামাজ নষ্ট হয় না। (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৮০)
৪. নামাজে থাকা অবস্থায় পুনরায় নামাজ পড়ার নিয়ত করলে:
নামাজের মধ্যে থাকা অবস্থায় যদি মনে মনে নিয়ত করেন যে "আবার এই নামাজ পড়ব", কিন্তু নামাজ শেষ করার পর আর পড়া না হয়, তাহলে আপনার প্রথম নামাজটি সহীহ হয়ে গেছে। কারণ, নামাজের মধ্যে থাকা অবস্থায় মনে মনে কোনো নিয়ত করলে নামাজ ভঙ্গ হয় না। নামাজ ভঙ্গ হওয়ার জন্য মুখে উচ্চারণ করা বা বাহ্যিক কোনো কাজ করা প্রয়োজন। শুধু মনে মনে চিন্তা করলে নামাজ সহীহ থাকে। (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৬৩৪)
৫. নামাজ নিয়ে বেশি চিন্তা করা ও ওয়াসওয়াসা:
নামাজ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করা, বারবার সন্দেহ করা এবং হতাশ হয়ে পড়া এটি ওয়াসওয়াসা (শয়তানের প্ররোচনা)। শয়তান মানুষকে নামাজ থেকে দূরে রাখতে এবং নামাজের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করতে চায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যখন নামাজের আযান দেওয়া হয়, তখন শয়তান বায়ু নিঃসরণের জন্য পেছন থেকে পালিয়ে যায়।" (সহিহ বুখারি: ৬০৮)
আপনার এই অতিরিক্ত চিন্তা ও সন্দেহ শয়তানের কুমন্ত্রণা। এর প্রতিকার হলো:
- এই ধরনের সন্দেহকে গুরুত্ব না দেওয়া।
- নামাজের পর যদি সন্দেহ হয় যে নামাজ ভঙ্গ হয়েছে কিনা, তাহলে সেই সন্দেহকে উপেক্ষা করা এবং নামাজ সহীহ হয়েছে বলে বিশ্বাস করা।
- ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির জন্য আউযুবিল্লাহ পড়া এবং বেশি বেশি দরুদ শরীফ পাঠ করা।
- নামাজে মনোযোগ বাড়ানোর জন্য নামাজের অর্থ বুঝে পড়ার চেষ্টা করা।
উপসংহার:
আপনার নামাজগুলো সহীহ হয়েছে। আপনি যে বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করছেন, সেগুলোর কোনোটি আপনার নামাজ নষ্ট করেনি। শুধু সন্দেহের কারণে নামাজ নষ্ট হয় না। আপনি নামাজ নিয়ে এত চিন্তা করবেন না, বরং শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবেন। আল্লাহ তায়ালা আপনার নামাজ কবুল করুন। আমিন।