হালাল ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগ সম্পর্কে।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, আপনি একটি হালাল ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগ করেছেন এবং চুক্তি অনুযায়ী আপনি সেই ব্যবসায় কাজও করবেন, যার বিনিময়ে আপনাকে প্রতি মাসে ১৫,০০০ টাকা দেওয়া হবে এবং এক বছর পর আপনার মূলধন ফেরত দেওয়া হবে।
শরিয়তের বিধান: ইসলামী অর্থনীতিতে বিনিয়োগের দুটি প্রধান বৈধ পদ্ধতি রয়েছে:
১. মুদারাবা (Mudarabah): এতে একজন বিনিয়োগকারী (রাব্বুল মাল) অর্থ সরবরাহ করেন এবং অন্যজন (মুদারিব) কাজ করেন। লাভের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ (যেমন: ৫০% বা ৬০%) আগেই নির্ধারণ করা হয়। তবে লাভের হার ফিক্সড বা নির্দিষ্ট টাকার অঙ্কে (যেমন: ১৫,০০০ টাকা) নির্ধারণ করা জায়েজ নয়, কারণ লাভ নির্ভর করে ব্যবসার ফলাফলের উপর। যদি কেউ ফিক্সড পরিমাণ টাকা দেওয়ার শর্ত করে, তবে তা সুদ (রিবা) হয়ে যায়।
২. মুশারাকা (Musharakah): এতে দুই বা ততোধিক অংশীদার মিলে মূলধন ও কাজ উভয়ই সরবরাহ করেন। লাভের অনুপাত নির্ধারিত থাকে, কিন্তু কোনো অংশীদারকে ফিক্সড মুনাফা বা বেতন হিসেবে নির্দিষ্ট টাকা দেওয়া জায়েজ নয়, যদি না তা আলাদাভাবে কাজের বিনিময়ে নির্ধারিত হয়।
আপনার ক্ষেত্রে বিধান: আপনি যে চুক্তি করেছেন, তাতে প্রতি মাসে ১৫,০০০ টাকা ফিক্সড দেওয়ার শর্ত রয়েছে। এটি শরিয়তসম্মত নয়, কারণ এটি মূলধনের উপর নির্ধারিত হারে সুদ (রিবা) হিসেবে গণ্য হবে। এমনকি আপনি কাজও করছেন, কিন্তু কাজের বিনিময়ে যদি আলাদা কোনো পারিশ্রমিক (বেতন) নির্ধারিত না থাকে, তাহলে পুরো ১৫,০০০ টাকাই সুদ হিসেবে গণ্য হবে।
সমাধান: আপনি এখন যা করবেন:
১. চুক্তি সংশোধন করুন: আপনি এবং ব্যবসায়ী মিলে নতুন করে একটি বৈধ চুক্তি করুন। যেমন: আপনি আপনার কাজের জন্য একটি নির্দিষ্ট বেতন (যেমন: ১০,০০০ টাকা) নির্ধারণ করুন, এবং বাকি ৫,০০০ টাকা বা তার বেশি/কম লাভের শতাংশ হিসেবে নির্ধারণ করুন (যেমন: লাভের ২০% বা ৩০%)। তবে লাভের শতাংশ নির্ধারণ করতে হবে, নির্দিষ্ট টাকার অঙ্কে নয়।
২. অতীতের লেনদেন: ইতিমধ্যে আপনি যে ১৫,০০০ টাকা করে নিয়েছেন, সেগুলো যদি আপনি ইতিমধ্যেই নিয়ে থাকেন, তাহলে সেগুলো আপনার জন্য হারাম (সুদ) ছিল। তবে যেহেতু আপনি জানতেন না, তাই আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করবেন ইনশাআল্লাহ। এখন থেকে এই টাকা নেওয়া বন্ধ করুন এবং নতুন করে বৈধ চুক্তি করুন।
কুরআন ও হাদিসের দলিল: আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"আল্লাহ তা'আলা ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
হাদিসে এসেছে:
"যে ব্যক্তি সুদ খায়, সুদ দেয়, সুদের সাক্ষী থাকে এবং সুদের দলিল লেখে—সবাই লানতপ্রাপ্ত।" (সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮)
ফাতাওয়া ও উসুলি কিতাবের রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ৫ম খণ্ড, ১৬৫-১৬৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে, মুদারাবায় লাভের হার নির্দিষ্ট টাকার অঙ্কে নির্ধারণ করা জায়েজ নয়; বরং শতাংশ হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে।
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানী): ২য় খণ্ড, ৩২৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, "মুদারাবায় কোনো পক্ষকে ফিক্সড মুনাফা দেওয়ার শর্ত করা সুদের অন্তর্ভুক্ত।"
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী): ৪র্থ খণ্ড, ২৭৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, "কাজের বিনিময়ে আলাদা বেতন নির্ধারণ করা জায়েজ, কিন্তু মূলধনের উপর ফিক্সড মুনাফা জায়েজ নয়।"
সারসংক্ষেপ: আপনার বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে ১৫,০০০ টাকা নেওয়া সুদ (রিবা) হবে, কারণ এটি ফিক্সড এবং মূলধনের উপর নির্ধারিত। তাই এখনই এই চুক্তি সংশোধন করুন এবং শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে নতুন চুক্তি করুন। আল্লাহ তায়ালা আপনাকে হালাল রিজিক দান করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।