অনিচ্চাকৃতভাবে কারো কষ্টের কারন হলে তার জন্য পরকালে হুকুম কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
অনিচ্ছাকৃতভাবে কারো কষ্টের কারণ হলে পরকালে তার বিধান
প্রশ্ন: কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে (অজান্তে বা ভুলবশত) কারো কষ্টের কারণ হলে পরকালে তার জন্য কী হুকুম হবে?
উত্তর
আলহামদুলিল্লাহ। ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি অনুযায়ী, অনিচ্ছাকৃতভাবে বা ভুলবশত কারো ক্ষতি বা কষ্টের কারণ হলে তা ইচ্ছাকৃত পাপের মতো গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, এর কোনো দায়িত্বই থাকবে না। নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. কুরআন ও হাদীসের আলোকে মূলনীতি
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন:
"আমাদের প্রতিপালক! যদি আমরা ভুলে যাই বা ভুল করি তবে আমাদেরকে পাকড়াও করো না।" (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে আল্লাহ তাআলা উত্তর দিয়েছিলেন যে, তিনি উম্মতকে ভুল ও অনিচ্ছাকৃত কাজের জন্য পাকড়াও করবেন না। (সহীহ মুসলিম: ১২৫)
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
"আমার উম্মতের কাছ থেকে (অপারাধের বিচার) উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে—ভুল, ভুলে যাওয়া এবং যা করতে বাধ্য করা হয়েছে।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪৫, সহীহ)
২. হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়া শামী)-এ উল্লেখ আছে:
"ভুলবশত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কারো ক্ষতি করলে আখিরাতে গুনাহ হবে না, তবে দুনিয়ায় ক্ষতিপূরণ (যামান) দিতে হবে। আর ইচ্ছাকৃতভাবে করলে দুনিয়ায় ক্ষতিপূরণ এবং আখিরাতে গুনাহ উভয়টিই রয়েছে।"
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৭৬০)
৩. অনিচ্ছাকৃত কষ্টের ক্ষেত্রে করণীয়
অনিচ্ছাকৃতভাবে কারো কষ্টের কারণ হলেও নিম্নোক্ত বিষয়গুলো পালন করা জরুরি:
ক. ক্ষমা প্রার্থনা করা: যদিও এটি গুনাহ নয়, তবুও যার কষ্ট হয়েছে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং মন খারাপ থাকলে তা দূর করার চেষ্টা করা মুস্তাহাব। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রতি কোনো অন্যায় করেছে, সে যেন তার কাছ থেকে ক্ষমা চায় (দুনিয়াতেই), কারণ সেখানে (আখিরাতে) দিরহাম-দীনার থাকবে না; বরং তার নেকি নিয়ে নেওয়া হবে এবং পাপ দেওয়া হবে।" (সহীহ বুখারী: ৬৫৩৪)
খ. ক্ষতিপূরণ দেওয়া: যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে কারো সম্পদের ক্ষতি হয়ে থাকে, তবে তা ফেরত দেওয়া বা ক্ষতিপূরণ দেওয়া ফরজ। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৪/১২৩)
গ. দুআ করা: যার কষ্ট হয়েছে তার জন্য দুআ করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
৪. আখিরাতের বিচার সম্পর্কে
অনিচ্ছাকৃত কাজের কারণে আখিরাতে শাস্তি হবে না, ইনশাআল্লাহ। তবে আখিরাতে হক আদায়ের বিষয়টি থেকে যায়। যদি দুনিয়ায় ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব না হয় বা ক্ষমা না পাওয়া যায়, তবে আখিরাতে আল্লাহ তাআলা ন্যায়বিচার করবেন। হাদীসে এসেছে:
"আখিরাতে প্রত্যেকের হক আদায় করা হবে, এমনকি শিংবিহীন ছাগলের বদলা শিংওয়ালা ছাগলের কাছ থেকে নেওয়া হবে।" (সহীহ মুসলিম: ২৫৮২)
তবে যেহেতু এটি অনিচ্ছাকৃত, তাই এটি ইচ্ছাকৃত অন্যায়ের মতো শাস্তিযোগ্য হবে না। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেছেন:
"অনিচ্ছাকৃত ক্ষতিতে গুনাহ নেই, কিন্তু দুনিয়ার ক্ষতিপূরণ আবশ্যক। আর আখিরাতে আল্লাহর দয়া ও ন্যায়বিচারের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়।"
(রদ্দুল মুহতার, ৫/৩৮০)
৫. গুরুত্বপূর্ণ নোট
- ইচ্ছাকৃত কষ্ট দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়—এটি কবিরা গুনাহ এবং এর জন্য তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা অপরিহার্য।
- অনিচ্ছাকৃত কষ্ট গুনাহ না হলেও, যার কষ্ট হয়েছে তার সাথে সম্পর্ক ভালো রাখা এবং মন থেকে ক্ষোভ দূর করা জরুরি।
- মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) তাঁর মা'আরিফুল কুরআন-এ উল্লেখ করেছেন যে, অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে আখিরাতে শাস্তি হবে না, তবে আল্লাহর দরবারে হিসাব-নিকাশের সময় মানুষের হক আদায়ের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচিত হবে। (মা'আরিফুল কুরআন, ১/৪৫২)
সংক্ষিপ্ত উত্তর
অনিচ্ছাকৃতভাবে কারো কষ্টের কারণ হলে তা গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে না এবং আখিরাতে এর জন্য শাস্তি হবে না, ইনশাআল্লাহ। তবে করণীয় হলো:
- যার কষ্ট হয়েছে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া
- সম্ভব হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া
- তার জন্য দুআ করা
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ভুল-ত্রুটি থেকে হিফাজত করুন এবং ক্ষমা করুন। আমীন।
দলিলসমূহ:
- সূরা আল-বাকারা: ২৮৬
- সহীহ মুসলিম: ১২৫
- সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪৫
- রদ্দুল মুহতার: ৬/৭৬০, ৫/৩৮০
- ফাতাওয়া আলমগীরী: ৪/১২৩
- মা'আরিফুল কুরআন: ১/৪৫২