ইএ ফুটবল গেইম খেলা কি হারাম?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমি ইএ ফুটবল গেইম সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম এই। এই গেইমে হাটু দেখা যায় কিন্তু আমি মুজা দিয়ে হাটু গুলা Hide করতে পারি।
১.এখন খেলা কি হারাম হবে।
২.শির্ক হবে কি?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্ন করার জন্য ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক। আপনি ইএ ফুটবল (EA FC/FIFA) গেম সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন, বিশেষ করে যখন গেমের চরিত্রগুলোর হাঁটু দেখা যায়, কিন্তু আপনি সেটিংস পরিবর্তন করে মোজা দিয়ে হাঁটু ঢেকে রাখতে পারেন। আপনার মূল প্রশ্ন দুটি:
১. এই অবস্থায় খেলাটি কি হারাম হবে? ২. এতে কি শিরক হবে?
আসুন আমরা কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।
১. খেলাটি হারাম হবে কি?
মূল নীতি: ইসলামে খেলাধুলা বা গেম খেলা নিষিদ্ধ নয়, বরং শরীর চর্চা এবং বিনোদনের জন্য বৈধ। তবে, যে খেলায় এমন কিছু থাকে যা ইসলামী বিধান লঙ্ঘন করে (যেমন: শিরক, অশ্লীলতা, গান-বাজনা, সময় নষ্ট, ইত্যাদি), সেটি হারাম বা মাকরূহ হয়ে যায়।
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি: হানাফি ফিকহে খেলাধুলার ব্যাপারে মূলনীতি হলো, যদি খেলাটি শরীর চর্চা বা বুদ্ধির বিকাশের জন্য হয় এবং এতে কোনো শরয়ী নিষিদ্ধ বিষয় না থাকে, তবে তা জায়েয। কিন্তু যদি খেলায় অশ্লীলতা, মূর্তি পূজা, বা ইসলামবিরোধী কোনো বিষয় থাকে, তবে তা নাজায়েয।
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে: আপনি বলেছেন যে, গেমের চরিত্রগুলোর হাঁটু দেখা যায়, কিন্তু আপনি মোজা দিয়ে সেগুলো ঢেকে রাখতে পারেন। এখন প্রশ্ন হলো, এই অবস্থায় খেলাটি হারাম হবে কি না?
-
যদি আপনি মোজা দিয়ে হাঁটু ঢেকে রাখেন: যদি আপনি গেমের সেটিংস পরিবর্তন করে চরিত্রগুলোর শরীরের এমন অংশ (হাঁটু) ঢেকে দেন যা শরীয়তে আবৃত করা আবশ্যক (সতর), তাহলে গেমটির সেই নির্দিষ্ট অশ্লীল দিকটি দূর হয়ে যাবে। এই অবস্থায় খেলাটি হারাম হওয়ার কারণটি (অশ্লীলতা) আর থাকছে না। তবে, খেলাটি বৈধ হওয়ার জন্য অন্যান্য শর্তও পূরণ করতে হবে, যেমন:
- খেলায় গান-বাজনা বা অশ্লীল শব্দ না থাকা।
- খেলায় শিরক বা কুফরি কোনো বিষয় না থাকা।
- খেলাটি সময় নষ্ট করার জন্য না হয়ে বিনোদন বা দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য হওয়া।
- খেলায় কোনো প্রাণীর (মানুষ বা পশু) ভয়ংকর রূপ বা মূর্তি পূজা না থাকা।
-
যদি আপনি মোজা দিয়ে হাঁটু না ঢাকেন: যদি আপনি হাঁটু খোলা অবস্থায় খেলেন, তাহলে গেমটিতে অশ্লীলতা (সতর খোলা) থাকবে, যা ইসলামী বিধান অনুযায়ী নাজায়েয। তাই এই অবস্থায় খেলাটি হারাম বা মাকরূহ হবে।
হানাফি কিতাবের রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়া শামী): এতে বলা হয়েছে, যে খেলায় অশ্লীলতা বা গুনাহের কাজ থাকে তা নাজায়েয। (রদ্দুল মুহতার, ৬তম খণ্ড, ৩৯৫ পৃষ্ঠা)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি): এতে বলা হয়েছে, শরীর চর্চার জন্য তীরন্দাজি, ঘোড়দৌড় ইত্যাদি বৈধ, কিন্তু যে খেলায় গুনাহের কাজ থাকে তা বৈধ নয়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫ম খণ্ড, ৩৫৮ পৃষ্ঠা)
সারসংক্ষেপ: আপনি যদি গেমের সেটিংস পরিবর্তন করে চরিত্রগুলোর হাঁটু (সতর) ঢেকে দেন এবং খেলায় অন্য কোনো শরয়ী নিষিদ্ধ বিষয় (গান, শিরক, অশ্লীলতা) না থাকে, তাহলে খেলাটি হারাম হবে না, বরং জায়েয হবে। কিন্তু যদি আপনি হাঁটু খোলা অবস্থায় খেলেন, তাহলে তা নাজায়েয হবে।
২. শিরক হবে কি?
শিরক কী? শিরক হলো আল্লাহ তায়ালার সাথে কাউকে শরীক করা, অর্থাৎ আল্লাহর কোনো গুণ বা ক্ষমতা অন্য কাউকে দেওয়া। যেমন: কারো কাছে দোয়া করা, কারো কাছে সাহায্য চাওয়া, বা কোনো সৃষ্টিকে আল্লাহর সমান মনে করা।
গেম খেলায় শিরক হওয়ার বিষয়টি: সাধারণভাবে একটি ফুটবল গেম খেলা শিরক নয়। শিরক তখনই হবে যদি:
- গেমের কোনো চরিত্রকে (খেলোয়াড়) আল্লাহর সমান মনে করা হয় বা তার কাছে দোয়া করা হয়।
- গেমের কোনো প্রতীক বা চিহ্নকে পবিত্র মনে করে সিজদা করা হয় বা পূজা করা হয়।
- গেম খেলাকে আল্লাহর বিধানের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যাতে মনে হয় এটি আল্লাহর আদেশের চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়।
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে: আপনি যদি শুধু একটি ফুটবল গেম খেলেন এবং চরিত্রগুলোর হাঁটু ঢেকে দেন, তাহলে এতে শিরক হওয়ার কোনো কারণ নেই। শিরক তো তখনই হবে যখন আপনি গেমের কোনো কিছুকে আল্লাহর সমান মনে করবেন বা গেমের কোনো চরিত্রের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করবেন। যেহেতু আপনি শুধু খেলছেন এবং চরিত্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, এটি শিরক নয়।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে:
- আল্লাহ তায়ালা বলেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না, কিন্তু তাছাড়া যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।" (সূরা নিসা: ৪৮)
- শিরক হলো আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করা। একটি খেলা খেলা বা গেম খেলা নিজে শিরক নয়, যতক্ষণ না তাতে শিরকের কোনো উপাদান থাকে।
সারসংক্ষেপ: ইএ ফুটবল গেম খেলায় শিরক হবে না, যদি না আপনি গেমের কোনো চরিত্র বা প্রতীককে আল্লাহর সমান মনে করেন বা তাদের পূজা করেন। যেহেতু আপনি শুধু খেলছেন এবং চরিত্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, এটি শিরক নয়।
চূড়ান্ত ফতোয়া ও পরামর্শ
১. খেলার বৈধতা: আপনি যদি গেমের সেটিংস পরিবর্তন করে চরিত্রগুলোর হাঁটু (সতর) ঢেকে দেন এবং খেলায় অন্য কোনো শরয়ী নিষিদ্ধ বিষয় না থাকে, তাহলে খেলাটি জায়েয (বৈধ) হবে। তবে, খেলাটি যেন আপনার নামাজ, পড়াশোনা বা অন্যান্য জরুরি কাজে বাধা না দেয়, সেদিকে খেয়াল রাখবেন। সময় নষ্ট করা এবং আসক্তি ইসলামে অপছন্দনীয়।
২. শিরক: এই গেম খেলায় শিরক হবে না, যতক্ষণ না আপনি গেমের কোনো কিছুকে আল্লাহর সমান মনে করেন বা পূজা করেন। শুধু খেলা খেলার মাধ্যমে শিরক হয় না।
অতিরিক্ত পরামর্শ:
- গেমের সাউন্ডে যদি গান-বাজনা থাকে, তাহলে সেটি বন্ধ করে দিন, কারণ গান-বাজনা ইসলামে নিষিদ্ধ।
- গেমে যদি কোনো ভয়ংকর বা অশ্লীল দৃশ্য থাকে, সেটি এড়িয়ে চলুন।
- মনে রাখবেন, ইসলাম খেলাধুলাকে উৎসাহিত করে, কিন্তু সেটি হতে হবে সীমার মধ্যে এবং ইসলামী আদর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রেফারেন্স:
- কুরআন: সূরা নিসা (৪:৪৮)
- রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়া শামী): ৬তম খণ্ড, ৩৯৫ পৃষ্ঠা
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি): ৫ম খণ্ড, ৩৫৮ পৃষ্ঠা
- ফাতাওয়া উসমানী: ২য় খণ্ড, ৪৫৬ পৃষ্ঠা (খেলাধুলার বিধান প্রসঙ্গে)
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। (আমিন)