আমার সৎ মা এবং আমার আব্বু দুজনেই যাদুপ্র্যাক্টিস করেন এবং কবিরাজদের কাছে কাউকে যাদু করার জন্য
Family Life · Hanafi
Question
বিদ্র: আমাদের আব্বা মানসিকভাবে অসুস্থ তবে এই অসুস্থ যখন এক্টা সময় আসে তখন তিনি চিল্লাচিল্লি করেন এই তাবিজ ইত্যাদি নিয়ে এবং নিজেও তা লিখার চেষ্টা করেন।আমরা শুনেছি যে যাদুপ্র্যাক্টিস করতে গিয়ে উনার এই সমস্যা হয়েছে।
Answer
যাদু-টোনা ও কবিরাজি সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন: আমার সৎ মা এবং আমার আব্বু দুজনেই যাদুপ্র্যাক্টিস করেন এবং কবিরাজদের কাছে কাউকে যাদু করার জন্য যান। কিছুদিন আগে আমার চাচাতো বোনের রুকাইয়া করতে গিয়ে জানা গেছে যে আমার আব্বা উনার বিয়ে বন্ধের যাদু করেছেন। আমরা দুই ভাইবোন খুব পেরেশানিতে আছি। আমাদের করণীয় কী?
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
আলহামদুলিল্লাহি ওয়াসসালাতু ওয়াসসালামু আলা রাসূলিল্লাহ।
১. যাদু-টোনার শরয়ী বিধান
যাদু-টোনা (সিহর) ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম এবং কবিরা গুনাহ। কুরআন ও হাদীসে এর কঠোর নিন্দা করা হয়েছে।
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَىٰ "যাদুকর যেখানেই থাকুক, সে সফলকাম হবে না।" (সূরা ত্বহা: ৬৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا هُنَّ قَالَ الشِّرْكُ بِاللَّهِ وَالسِّحْرُ... "তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী বস্তু থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, সেগুলো কী? তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে শিরক করা, যাদু করা..." (সহীহ বুখারী: ২৭৬৬, সহীহ মুসলিম: ৮৯)
ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (রহ.)在其 famous book "রাদ্দুল মুহতার" এ বলেন:
السِّحْرُ حَرَامٌ وَهُوَ مِنَ الْكَبَائِرِ "যাদু হারাম এবং এটি কবিরা গুনাহ।" (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮০)
২. যাদুকারীর শাস্তি
হানাফী ফিকহ অনুযায়ী:
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, যে ব্যক্তি যাদু চর্চা করে এবং তা দ্বারা মানুষকে কষ্ট দেয়, তার শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড। (বাদায়েউস সানায়ে, ৭/৯৯; ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/১৯৮)
ফাতাওয়া আলমগীরীতে বর্ণিত আছে:
وَأَمَّا السَّاحِرُ فَإِنْ كَانَ مُسْلِمًا يُسْتَتَابُ فَإِنْ تَابَ وَإِلَّا يُقْتَلُ "যাদুকর যদি মুসলিম হয়, তবে তাকে তওবা করতে বলা হবে; তওবা করলে ছেড়ে দেওয়া হবে, অন্যথায় তাকে হত্যা করা হবে।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/১৯৮)
৩. আপনার করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা
আপনার পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। আপনার আব্বু মানসিকভাবে অসুস্থ এবং তিনি যাদু চর্চা করেন। এমতাবস্থায় আপনাদের করণীয়:
ক. দাওয়াত ও নসীহত
আপনাদের উচিত আপনার আব্বুকে এবং সৎ মাকে নম্রভাবে ইসলামের সঠিক শিক্ষা বোঝানো। যাদু যে কবিরা গুনাহ এবং এর শাস্তি কঠিন, তা বোঝানোর চেষ্টা করুন। তবে যেহেতু তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ এবং রাগান্বিত হন, তাই অত্যন্ত কৌশলে এবং ধৈর্যের সাথে দাওয়াত দিতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ "তোমার রবের পথে হিকমত (প্রজ্ঞা) এবং উত্তম উপদেশ দ্বারা দাওয়াত দাও।" (সূরা নাহল: ১২৫)
খ. মানসিক অসুস্থতার চিকিৎসা
যেহেতু আপনার আব্বু মানসিকভাবে অসুস্থ, তাই তার মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। ভালো মুসলিম মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে মানসিক রোগের চিকিৎসা করা জায়েয এবং উচিত।
গ. নিজেদের হিফাজত করুন
যাদু থেকে বাঁচার জন্য নিম্নলিখিত আমলগুলো করুন:
-
সূরা বাকারাহ তিলাওয়াত - রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তোমরা সূরা বাকারাহ তিলাওয়াত করো, কারণ এটা গ্রহণ করা বরকত এবং পরিত্যাগ করা আফসোস, আর বাতিলপন্থীরা তা পড়তে পারে না।" (সহীহ মুসলিম: ৮০৪)
-
আয়াতুল কুরসী, সূরা ফালাক ও সূরা নাস - প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার করে পড়ুন।
-
মআসূরাত বা হিসনুল মুসলিমের দুআ - সকাল-সন্ধ্যার দুআগুলো নিয়মিত পড়ুন।
-
নামাজ ও তওবার প্রতি যত্নবান হোন - পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং কুরআন তিলাওয়াত নিয়মিত করুন।
ঘ. পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সুরক্ষা
যাদের উপর যাদু হয়েছে বলে সন্দেহ, তাদের জন্য রুকিয়াহ (কুরআন দ্বারা চিকিৎসা) করানো যেতে পারে। তবে তা অবশ্যই কোনো আলেম বা দ্বীনদার ব্যক্তির মাধ্যমে করাতে হবে, যিনি কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী রুকিয়াহ করেন।
ঙ. ধৈর্য ও সবর
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ "হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো এবং ধৈর্যে প্রতিযোগিতা করো, আর (জিহাদের জন্য) প্রস্তুত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।" (সূরা আলে ইমরান: ২০০)
৪. আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ
যদি আপনার আব্বু এবং সৎ মা অন্যের ক্ষতি করার জন্য যাদু করেন এবং তা প্রমাণিত হয়, তবে ইসলামী রাষ্ট্রে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে দেশের প্রচলিত আইনে যাদুর জন্য নির্দিষ্ট শাস্তি না থাকলে, আপনি স্থানীয় আলেম বা ইসলামী সংগঠনের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করতে পারেন।
৫. বিশেষ নোট
যেহেতু আপনার আব্বু মানসিকভাবে অসুস্থ, তাই ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী পাগল বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির কাজের জন্য সে দায়ী নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ: عَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يُفِيقَ... "তিন ব্যক্তি থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে (অর্থাৎ তাদের কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে না): পাগল, যতক্ষণ না সুস্থ হয়..." (সুনানে আবু দাউদ: ৪৩৯৮, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪১)
তবে আপনার সৎ মা যদি সুস্থ থাকেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে যাদু চর্চা করেন, তবে তিনি সম্পূর্ণ দায়ী হবেন।
উপসংহার
আপনাদের করণীয় হলো:
- ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখা
- নিজেদের হিফাজতের আমল নিয়মিত করা
- আব্বুর মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা
- নম্রভাবে দাওয়াত দেওয়া এবং দ্বীনের সঠিক শিক্ষা বোঝানো
- আলেম বা মুফতির সাথে পরামর্শ করা
- সৎ মা ও আব্বুর জন্য দুআ করা
আল্লাহ তাআলা আপনাদের এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের তাওফিক দান করুন এবং আপনার আব্বুকে হেদায়েত দান করুন। আমীন।
দুআ: আল্লাহ তাআলা আপনাদের সবাইকে হেফাজত করুন এবং আপনার আব্বুকে হেদায়েত দান করুন। আমীন।