ঈমানের সাথে মৃত্যু, বিনা হিসাবে জান্নাত, আওয়াবীনের নামাজ, সূরা ইয়াসিন-ওয়াকিয়াহ-হাশরের ফজিলত, শহীদি মৃত্যুর দোয়া এবং নামাজে সূরা পরিবর্তনের বিধান।
Salah-Prayer · Hanafi
Question
২.সুরা ইয়াসিন ফজরের পর পড়লে ১০ খতম কুরআনের সওয়াব পাওয়া যায়,মাগরিবের পর সুরা ওয়াকিয়াহ পড়লে রিজিকে বরকত আসে,মাগরিবের পর সুরা হাশরের ৩ আয়াত পড়লে শহীদি মৃত্যু হয় এগুলোর উপর আমল করা কি সহিহ হবে বা এগুলো কি সহিহ হাদিস দারা প্রমানিত??
৩.শহীদি মৃত্যু পাওয়ার কোনো সহিহ দুয়া বা আমল থাকলে বলুন। মিন ফাদলিক।
৪. মাঝে মাঝে নামাজে সুরা ফাতিহার পর সুরা ইখলাস পড়বো বলে ঠিক করি কিন্তু মুখ ফসকে অন্য সুরা বলে ফেলি বা সুরা শুরুর প্রথম শব্দ বা আয়াত বলে ফেলি কিন্তু পড়ে আবার সেটা বাদ দিয়ে ইখলাস শুরু করি। এখন এমন করলে কি নামাজ ভেঙেযাবে???
Answer
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على رسوله الأمين وعلى آله وأصحابه أجمعين أما بعد
প্রশ্ন ১: ঈমানের সাথে মৃত্যু ও বিনা হিসাবে জান্নাত পাওয়ার আমল এবং মাগরিবের পর আওয়াবীনের নামাজের নিয়ম
উত্তর: ঈমানের সাথে মৃত্যু হওয়া এবং বিনা হিসাবে জান্নাত পাওয়ার জন্য কুরআন ও সহিহ হাদিসে বেশ কিছু আমলের কথা বর্ণিত হয়েছে। তবে "বিনা হিসাবে জান্নাত" বলতে বুঝানো হয়েছে যাদের উপর হিসাব-নিকাশ হবে না বা সহজ হিসাব হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"আমার উম্মতের সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।" (সহিহ বুখারী: ৫৭০৫)
এই ব্যাপারে আলেমরা বলেছেন, যারা সম্পূর্ণ তাওয়াক্কুল করে আল্লাহর উপর ভরসা করে, শিরক ও কুফরি থেকে বেঁচে থাকে এবং নবী ﷺ-এর উপর ঈমান আনে, তারা এই দলের অন্তর্ভুক্ত হবে।
আওয়াবীনের নামাজ সম্পর্কে: মাগরিবের পর ৬ রাকাত আওয়াবীনের নামাজ পড়া মুস্তাহাব। হাদিসে এসেছে:
"যে ব্যক্তি মাগরিবের পর ছয় রাকাত নামাজ পড়বে এবং এর মধ্যে খারাপ কথা বলবে না, তা তার জন্য বারো বছরের ইবাদতের সমান হবে।" (তিরমিজি: ৪৩৫, ইবনে মাজাহ: ১৩৭৪)
তবে প্রতিটি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়া সম্পর্কে বিশেষ কোনো সহিহ হাদিস নেই। এটি কোনো কোনো আলেমের ব্যক্তিগত মত বা দুর্বল হাদিসের ভিত্তিতে হতে পারে। তবে সাধারণভাবে নামাজে যেকোনো সূরা পড়া জায়েজ। আওয়াবীনের নামাজে সূরা ফালাক ও নাস পড়া নিষিদ্ধ নয়, তবে এটাকে বিশেষ ফজিলতের সাথে আবশ্যকীয় মনে করা ঠিক নয়। (রদ্দুল মুহতার: ২/৪৬)
প্রশ্ন ২: সূরা ইয়াসিন, ওয়াকিয়াহ ও হাশরের বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে
সূরা ইয়াসিন ফজরের পর পড়া: হাদিসে এসেছে—
"যে ব্যক্তি ফজরের নামাজের পর সূরা ইয়াসিন পড়বে, তার জন্য দশ খতম কুরআনের সওয়াব লেখা হবে।"
তবে এই হাদিসটি দুর্বল (যঈফ)। ইমাম তিরমিজি ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ এটিকে দুর্বল বলেছেন। (তিরমিজি: ২৮৮৭; মিজানুল ই'তিদাল: ৩/১২৩)
তবে সূরা ইয়াসিন পড়ার সাধারণ ফজিলত সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন:
"প্রত্যেক বস্তুর একটি হৃদয় আছে, আর কুরআনের হৃদয় হলো সূরা ইয়াসিন।" (তিরমিজি: ২৮৮৭ - তবে এটি দুর্বল)
সূরা ওয়াকিয়াহ মাগরিবের পর পড়া: হাদিসে এসেছে—
"যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা ওয়াকিয়াহ পড়বে, সে কখনো দারিদ্র্যের সম্মুখীন হবে না।" (বায়হাকী শুআবুল ঈমান: ২২৪৪)
এই হাদিসটি দুর্বল হলেও অনেক আলেম এর উপর আমল করেছেন। তবে দুর্বল হাদিসের উপর ফজিলতের ক্ষেত্রে আমল করা জায়েজ আছে, যদি তা মারাত্মক দুর্বল না হয় এবং কোনো সহিহ হাদিসের বিপরীত না হয়। (ফাতাওয়া উসমানি: ২/১২৩)
সূরা হাশরের শেষ ৩ আয়াত: হাদিসে এসেছে—
"যে ব্যক্তি সকালে সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পড়বে, আল্লাহ তার জন্য সত্তর হাজার ফেরেশতা নিয়োজিত করেন, যারা তার জন্য দোয়া করে। যদি সে ঐ দিন মারা যায়, তবে শহীদের মৃত্যু পাবে।" (তিরমিজি: ২৯২২)
এই হাদিসটি হাসান পর্যায়ের। ইমাম তিরমিজি বলেছেন এটি গারীব। তবে অনেক মুহাদ্দিস এটিকে হাসান বলেছেন। (তিরমিজি: ২৯২২; মিশকাত: ২১৭৮)
প্রশ্ন ৩: শহীদি মৃত্যু পাওয়ার সহিহ দোয়া বা আমল
শহীদি মৃত্যু পাওয়ার জন্য নিম্নোক্ত সহিহ দোয়া ও আমলগুলো রয়েছে:
১. দোয়া: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি искренне আল্লাহর কাছে শহীদি মৃত্যু চায়, আল্লাহ তাকে শহীদদের মর্যাদায় পৌঁছে দেবেন, যদিও সে নিজ বিছানায় মৃত্যুবরণ করে।" (সহিহ মুসলিম: ১৯০৯)
দোয়াটি হলো: اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي شَهَادَةً فِي سَبِيلِكَ (উচ্চারণ: আল্লাহুম্মারযুকনী শাহাদাতান ফী সাবীলিক) অর্থ: "হে আল্লাহ! আমাকে তোমার পথে শহীদি দান করুন।"
২. সূরা হাশরের শেষ ৩ আয়াত: উপরে উল্লেখিত হাদিস অনুযায়ী সূরা হাশরের শেষ ৩ আয়াত (৫৯:২২-২৪) পড়লে শহীদি মৃত্যুর ফজিলত রয়েছে।
৩. দরুদ শরিফ: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আমার উপর দরুদ পড়বে, আল্লাহ তার উপর দশটি রহমত নাজিল করেন।" (সহিহ মুসলিম: ৪০৮)
৪. সূরা আল-মুলক: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"সূরা মুলক কবরের আজাব থেকে রক্ষাকারী।" (তিরমিজি: ২৮৯০)
প্রশ্ন ৪: নামাজে সূরা পরিবর্তন করলে নামাজ ভঙ্গ হবে কি?
উত্তর: নামাজে সূরা ফাতিহার পর কোনো নির্দিষ্ট সূরা পড়ার নিয়ত করার পর মুখ ফসকে অন্য সূরা পড়ে ফেললে বা সূরা শুরুর প্রথম শব্দ বলে ফেললে, তারপর সেটা বাদ দিয়ে ইচ্ছাকৃত সূরা পড়লে—নামাজ ভঙ্গ হবে না। তবে কিছু শর্ত রয়েছে:
১. যদি কেউ সূরা ফাতিহার পর অন্য সূরা পড়া শুরু করে এবং পড়তে পড়তে মনে করে যে, আমি তো ইখলাস পড়ার নিয়ত করেছিলাম, তাহলে সে সেটা বাদ দিয়ে ইখলাস পড়তে পারবে। এতে নামাজ ভঙ্গ হবে না এবং সিজদা সাহুও ওয়াজিব হবে না। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/১০৮; রদ্দুল মুহতার: ১/৬৩০)
২. তবে যদি কেউ একটি সূরা পড়া শুরু করে অর্ধেকের বেশি পড়ে ফেলে, তাহলে সেটা বাদ দিয়ে অন্য সূরা পড়া মাকরুহ হবে, তবে নামাজ ভঙ্গ হবে না। (ফাতাওয়া উসমানি: ১/২৮৫)
৩. যদি কেউ সূরা ফাতিহার পর "আলহামদু..." বলে ফেলে (যা সূরা ফাতিহারই অংশ), তাহলে সেটা সমস্যা নয়, কারণ সূরা ফাতিহা তো পড়াই হয়েছে। কিন্তু যদি অন্য সূরা শুরু করে প্রথম শব্দ বলে ফেলে, তাহলে সেটা বাদ দিয়ে ইখলাস পড়া জায়েজ আছে।
মূলনীতি: নামাজে কিরাত পরিবর্তন করলে নামাজ ভঙ্গ হয় না, তবে উত্তম হলো যা শুরু করেছে তা-ই সম্পন্ন করা। যদি ভুলে অন্য সূরা শুরু করে ফেলে, তাহলে সেটাই পড়ে শেষ করা উত্তম। (আল-হিদায়া: ১/৪৮; ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ: ৪/১০২)
والله أعلم بالصواب