হানাফী মাযহাব অনুযায়ী অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া নারীর বিবাহের বিধান কী?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
বর্ণনাকারী: ‘আয়িশাহ (রাঃ)
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ কোন নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে তার সে বিয়ে বাতিল। তিনি এই কথাটি তিনবার বলেছেন। আর সে যদি তার সাথে সহবাস করে, তাহলে এজন্য তাকে মোহর দিবে। যদি উভয় পক্ষের (অভিভাবকদের) মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়, তাহলে শাসক হবেন তার অভিভাবক। কারণ যাদের অভিভাবক নাই, তাদের অভিভাবক শাসক।
সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২০৮৩
হাদিসের মান: সহিহ
Answer
বিবাহ: অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত নারীর বিবাহের বিধান
উত্তর
আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু 'আলা রাসূলিল্লাহ।
আপনি যে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন—সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২০৮৩—এটি সহীহ এবং এই বিষয়ে ইসলামী ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, কোনো নারী যদি তার অভিভাবকের (ওয়ালীর) অনুমতি ব্যতীত বিবাহ করে, তবে সেই বিবাহ বাতিল।
হানাফী মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফী মাযহাবের ইমামগণ এই হাদীসকে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেছেন এবং এর ভিত্তিতে নিম্নোক্ত বিধান প্রদান করেছেন:
১. প্রাপ্তবয়স্কা নারীর বিবাহে অভিভাবকের সম্মতি
হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কা নারী অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া শরীয়তের শর্তাবলী মেনে বিবাহ করলে তা বৈধ।
তবে গায়রে কুফুতে বিবাহ করলে পাত্রীর বাবা আদালতের শরণাপন্ন হয়ে সেই বিবাহ বাতিল করে দিতে পারবেন। সে অধিকার পাত্রীর বাবার রয়েছে।
২. ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের মত
ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) এবং ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, প্রাপ্তবয়স্কা নারী অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করলে তা বাতিল হবে যদি অভিভাবক আপত্তি করেন। তবে অভিভাবক সম্মতি দিলে বিবাহ বৈধ হয়ে যায়।
৩. অপ্রাপ্তবয়স্কা নারীর বিবাহ
অপ্রাপ্তবয়স্কা (নাবালিগা) নারীর বিবাহ সম্পন্ন করার অধিকার শুধুমাত্র অভিভাবকের রয়েছে। তার নিজের সম্মতি বা অসম্মতি বিবাহের বৈধতার জন্য শর্ত নয়, তবে বিবাহের পর তাকে "খিয়ারুল বুলূগ" (বালিগ হওয়ার পর বিবাহ বহাল রাখা বা ভঙ্গ করার অধিকার) দেওয়া হয়েছে।
হাদীসটির ব্যাখ্যা
উল্লেখিত হাদীসে "মাওয়ালী" (অভিভাবক) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। হানাফী ফুকাহায়ে কেরামের মতে, এই হাদীসটি মূলত সেই সকল নারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা অপ্রাপ্তবয়স্কা অথবা অসুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্না—কারণ তাদের বিবাহের অধিকার সম্পূর্ণরূপে অভিভাবকের হাতে। অথবা এটি সেই সকল নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা সমকক্ষ (কুফু) পাত্র ব্যতীত অন্য কাউকে বিবাহ করে।
ইমাম তহাবী (রহ.) তাঁর শারহু মা'আনিল আসার গ্রন্থে এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন:
"এই হাদীসটি সেই নারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা নিজেদের বিবাহের ব্যাপারে স্বাধীন নয়—অর্থাৎ অপ্রাপ্তবয়স্কা বা জ্ঞানহীনা নারী। কারণ প্রাপ্তবয়স্কা ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্না নারীর বিবাহের ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহতে তার নিজের সম্মতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।"
কুরআনের দলীল
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"অতঃপর তারা (নারীরা) নিজেদের ব্যাপারে সন্তুষ্ট থাকলে, তবে তোমরা তাদেরকে বিবাহ করতে বাধা দিও না।"
(সূরা আল-বাকারা: ২৩২)
এই আয়াতে নারীদের নিজেদের সম্মতির গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, অভিভাবকের অনুমতি একান্তই প্রয়োজন নেই—বরং অভিভাবকের সম্মতির সাথে সাথে নারীর সম্মতিও শর্ত।
ফাতাওয়া ও ফিকহী গ্রন্থসমূহের উদ্ধৃতি
১. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) তাঁর রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে বলেন:
"হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কা ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্না নারী নিজে বিবাহ করলে তা বৈধ, তবে শর্ত হলো পাত্র সমকক্ষ (কুফু) হতে হবে এবং মোহর ন্যূনতম পরিমাণের কম হবে না। কিন্তু যদি পাত্র সমকক্ষ না হয়, তাহলে অভিভাবকের আপত্তিতে বিবাহ বাতিল হয়ে যাবে।"
২. ফাতাওয়া আলমগীরী
ফাতাওয়া আলমগীরী (ফাতাওয়া হিন্দিয়া) গ্রন্থে উল্লেখ আছে:
"প্রাপ্তবয়স্কা নারী যদি অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া সমকক্ষ পাত্রের সাথে বিবাহ করে, তবে বিবাহ বৈধ। কিন্তু অসমকক্ষ পাত্রের সাথে বিবাহ করলে তা বৈধ নয়, অভিভাবক আপত্তি করলে।"
৩. ফাতাওয়া উসমানী
মুফতী মুহাম্মদ তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) তাঁর ফাতাওয়া উসমানী গ্রন্থে বলেন:
"হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত হলো, প্রাপ্তবয়স্কা নারী অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করলে তা বাতিল নয়, বরং বৈধ—যদি পাত্র সমকক্ষ হয় এবং মোহর ন্যূনতম পরিমাণের কম না হয়। তবে অভিভাবকের সম্মতি গ্রহণ করা সুন্নত ও উত্তম।"
৪. বেহেশতী জেওর
মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) তাঁর বেহেশতী জেওর গ্রন্থে বলেন:
"নারীর বিবাহের জন্য অভিভাবকের সম্মতি গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও হানাফী মাযহাবে প্রাপ্তবয়স্কা নারী নিজে বিবাহ করতে পারে, তবুও অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করা উচিত নয়। কারণ এতে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে এবং অনেক সময় বিবাহ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।"
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | হানাফী মাযহাবের বিধান | |-------|------------------------| | প্রাপ্তবয়স্কা নারীর নিজে বিবাহ করা | বৈধ (যদি পাত্র সমকক্ষ হয় ও মোহর ন্যূনতম পরিমাণের কম না হয়) | | অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত বিবাহ | বৈধ (শর্তসাপেক্ষে), তবে অভিভাবকের সম্মতি উত্তম | | অসমকক্ষ পাত্রের সাথে বিবাহ | বাতিল (অভিভাবক আপত্তি করলে) | | অপ্রাপ্তবয়স্কা নারীর বিবাহ | শুধুমাত্র অভিভাবকই করতে পারেন | | অভিভাবক না থাকলে | শাসক (সুলতান) অভিভাবক হিসেবে কাজ করবেন |
উপসংহার
উল্লেখিত হাদীসটি সহীহ এবং এর শিক্ষা হলো—বিবাহের ক্ষেত্রে অভিভাবকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কা নারী অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া শরীয়তের শর্তাবলী মেনে বিবাহ করলে তা বৈধ।
তবে গায়রে কুফুতে বিবাহ করলে পাত্রীর বাবা আদালতের শরণাপন্ন হয়ে সেই বিবাহ বাতিল করে দিতে পারবেন। সে অধিকার পাত্রীর বাবার রয়েছে।
উল্লেখ্য, অভিভাবকের সম্মতি গ্রহণ করা অত্যন্ত উত্তম এবং ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।