তাহাজ্জুদ পড়ার কারণে অন্যের ঘুম নষ্ট হলে করণীয় কি? আজানের উত্তর মনে মনে দেওয়া যাবে কি? মাসনূন দুআ মনে মনে পড়া যাবে কি?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
২কোনো একটা রুমে ৪ জন থাকে তার মধ্যে একজনের স্লিপ ডিসঅর্ডার অন্য একজন নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তাহাজ্জুদের ওঠার কারনে যার স্লিপ ডিসঅর্ডার তার ঘুম ভেঙে যায় দেখা যায় আর ঘুম আসেনা অনেক সময় দিনেও ঘুমাতে পারেনা অনেকদিন এটা তার জন্য কষ্টের কারন হয়ে দাড়ায় যিনি তাহাজ্জুদ পড়েন তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক্ষেত্রে তার জন্য তাহাজ্জুদ পড়া জায়েজ হবে কি?
Answer
উত্তরের সূচনা
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيدنا محمد وعلى آله وأصحابه أجمعين
আপনার প্রশ্ন দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি ক্রমান্বয়ে উত্তর দিচ্ছি:
প্রশ্ন ১: মনে মনে মাসনূন দুআ, আজানের উত্তর দেওয়া এবং আজানের দুআ পড়া যাবে কি?
উত্তর:
আজানের উত্তর দেওয়া সম্পর্কে শরীয়তের বিধান হলো—মুয়াজ্জিনের আজান শুনে মুসল্লির জন্য আজানের উত্তর দেওয়া সুন্নত (মুয়াক্কাদাহ)। এটি মুখে উচ্চারণ করেই দিতে হবে, শুধু মনে মনে নয়। কারণ, আজানের উত্তর দেওয়ার উদ্দেশ্যই হলো মুয়াজ্জিনের শব্দের জবাব দেওয়া, যা উচ্চারণ ছাড়া সম্ভব নয়।
তবে মনে মনে দুআ করা সম্পর্কে শরীয়তের বিধান হলো—দুআয়ের ক্ষেত্রে মনে মনে দুআ করা জায়েয। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেন:
ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً "তোমরা তোমাদের রবকে ডাকো বিনয়ের সাথে এবং গোপনে।" (সূরা আল-আ'রাফ: ৫৫)
তবে আজানের পরের দুআ (اللهم رب هذه الدعوة التامة...) মুখে উচ্চারণ করে পড়া উচিত ও উত্তম।কারণ এটি মাসনূন দুআ এবং হাদীসে এর নির্দেশ এসেছে।
মাসনূন দুআ (যেমন: খাওয়ার আগে-পরে, ঘুমানোর আগে, ঘুম থেকে উঠে ইত্যাদি) মুখে উচ্চারণ করা উচিত ও উত্তম। কারণ, মুখে উচ্চারণ করলে জিহ্বা ও ঠোঁটের ইবাদতও হয় এবং মনোযোগও বেশি থাকে।
সারকথা:
- আজানের উত্তর মুখে উচ্চারণ করে দেওয়া সুন্নত, মনে মনে যথেষ্ট নয়।
- আজানের পরের দুআ মুখে পড়া উচিত ও উত্তম, মনে মনে পড়লেও সেটিও অনুমোদিত, কেননা এটা দোয়া।
- অন্যান্য মাসনূন দুআ মুখে উচ্চারণ করে পড়া উচিত ও উত্তম।
প্রশ্ন ২: স্লিপ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তির কারণে তাহাজ্জুদ পড়া জায়েয হবে কি?
উত্তর:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا "আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২৮৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ لِرَبِّكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَلِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَلِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، فَأَعْطِ كُلَّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ "নিশ্চয়ই তোমার রবের তোমার উপর হক আছে, তোমার নিজেরও তোমার উপর হক আছে, তোমার পরিবারেরও তোমার উপর হক আছে। সুতরাং প্রত্যেক হকদারকে তার হক আদায় করো।" (সহীহ বুখারী: ১৯৬৮)
তাহাজ্জুদ সুন্নত (গাইরে মুয়াক্কাদাহ) বা নফল ইবাদত। এটি ওয়াজিব বা ফরজ নয়। ইসলামে অন্যের ক্ষতি করে ইবাদত করা নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ "কোনো ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিশোধও নেওয়া যাবে না।" (মুয়াত্তা মালিক: ১২৩৫, মুসনাদ আহমাদ: ২৮৬৫)
বিস্তারিত বিশ্লেষণ:
প্রথম অবস্থা: যদি তাহাজ্জুদ পড়ার কারণে স্লিপ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তির ঘুম ভেঙে যায় এবং তার ঘুম না আসে, ফলে তার শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হয়, তাহলে এই অবস্থায় তাহাজ্জুদ পড়া মাকরূহ হবে। কারণ, অন্যের ক্ষতি করা জায়েয নয়, বিশেষ করে যখন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি এর জন্য দায়ী নয়।
দ্বিতীয় অবস্থা: যদি তাহাজ্জুদ পড়া ব্যক্তি অন্য কোনো উপায়ে তাহাজ্জুদ পড়তে পারেন—যেমন: অন্য রুমে গিয়ে, অথবা এমনভাবে চলাফেরা করেন যাতে অন্যের ঘুম না ভাঙে—তাহলে সেভাবে পড়া উচিত।
তৃতীয় অবস্থা: যদি কোনোভাবেই অন্যের ক্ষতি না করে তাহাজ্জুদ পড়া সম্ভব না হয়, তাহলে তাহাজ্জুদ ছেড়ে দেওয়া বা অন্য সময়ে (যেমন: ফজরের আগে কিছুক্ষণ) পড়া উত্তম। কেননা, নফল ইবাদতের চেয়ে অন্যের ক্ষতি না করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর নীতি:
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
إِذَا تَعَارَضَتْ مَفْسَدَتَانِ رُوعِيَ أَعْظَمُهُمَا ضَرَرًا بِارْتِكَابِ أَخَفِّهِمَا "যখন দুটি ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়, তখন সবচেয়ে বড় ক্ষতি এড়িয়ে হালকা ক্ষতিকে বেছে নেওয়া হয়।"
এখানে তাহাজ্জুদ না পড়ার ক্ষতি (নফল ইবাদত থেকে বঞ্চিত হওয়া) তুলনামূলকভাবে কম, আর স্লিপ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তির ঘুম নষ্ট হওয়ার ক্ষতি অনেক বেশি। তাই হালকা ক্ষতি (তাহাজ্জুদ না পড়া) বেছে নেওয়া উচিত।
সমাধান:
১. সরাসরি কথা বলা: তাহাজ্জুদ পড়া ব্যক্তি স্লিপ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিষয়টি জানিয়ে তার অনুমতি নিতে পারেন। যদি তিনি অনুমতি দেন, তাহলে পড়া জায়েয হবে।
২. বিকল্প ব্যবস্থা: অন্য রুমে বা অন্য জায়গায় তাহাজ্জুদ পড়ার চেষ্টা করা।
৩. সময় পরিবর্তন: শেষ রাতে নয়, বরং ফজরের কিছু আগে বা অন্য কোনো সময়ে তাহাজ্জুদ পড়া।
৪. ক্ষতি না হলে: যদি স্লিপ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তি ঘুম ভাঙার পর আবার ঘুমিয়ে পড়তে পারেন, তাহলে তাহাজ্জুদ পড়া জায়েয।
ফাতাওয়া উসমানী থেকে:
মুফতী মুহাম্মদ তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:
"নফল ইবাদতের কারণে যদি অন্য মুসলমানের ক্ষতি হয়, তাহলে সেই নফল ইবাদত করা মাকরূহ। কেননা, অন্যের ক্ষতি করা হারাম, আর নফল ইবাদত করা জায়েয। হারাম কাজ এড়ানো জায়েয কাজ করার চেয়ে বেশি জরুরি।"
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
প্রশ্ন ১: মনে মনে মাসনূন দুআ পড়া জায়েয, তবে মুখে উচ্চারণ করা মুস্তাহাব। আজানের উত্তর মুখে উচ্চারণ করেই দিতে হবে, মনে মনে যথেষ্ট নয়। আজানের পরের দুআ মুখে পড়া উচিত ও উত্তম।
প্রশ্ন ২: যে ব্যক্তি তাহাজ্জুদ পড়ার কারণে স্লিপ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তির ঘুম নষ্ট করছে এবং তার কষ্টের কারণ হচ্ছে, তার জন্য এই অবস্থায় তাহাজ্জুদ পড়া জায়েয নয় (মাকরূহ)। তাকে উচিত:
- প্রথমে স্লিপ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে কথা বলে অনুমতি নেওয়া
- অথবা এমন ব্যবস্থা করা যাতে তার ঘুম না ভাঙে
- অথবা অন্য সময়ে বা অন্য জায়গায় তাহাজ্জুদ পড়া
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।