Islamic Ruling (Fatwa) on Conditions and Financial Penalties in Column 17 of the Nikah Nama (Marriage Contract)
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
১. বিবাহ-পরবর্তী সময়ে স্বামী বা স্ত্রী কেউ পরকীয়ায় লিপ্ত হতে পারবে না।
২. একে অপরের প্রতি শারীরিক নির্যাতন চালানো যাবে না।
৩. স্ত্রীর স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবে না।
৪.বিবাহের পর স্ত্রী চাইলে সম্পূর্ণ পর্দার সহিত এবং ইসলামের বিধান মেনে পড়াশোনা এবং চাকরি বা ব্যবসা করার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে।
৪. উপরোক্ত যে কোনো শর্ত ভঙ্গ করলে, শর্তভঙ্গকারীকে বাদীপক্ষকে অতিরিক্ত মোহরানা বা জরিমানা/ক্ষতিপূরণ বাবদ নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ (উদাহরণস্বরূপ ৫,০০,০০০ টাকা/.... স্বর্ণ) প্রদান করতে হবে।
Answer
কাবিননামায় শর্ত ও আর্থিক জরিমানা: শরিয়তের বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
কাবিননামার বিশেষ শর্তাবলির (১৭ নম্বর কলাম) ঘরে নিম্নলিখিত শর্তগুলো এবং শর্ত ভঙ্গের ক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতিপূরণ (যেমন ৫,০০,০০০ টাকা বা স্বর্ণ) দেওয়ার বিধান রাখা কি শরিয়তসম্মত?
১. পরকীয়ায় লিপ্ত না হওয়া
২. শারীরিক নির্যাতন না করা
৩. স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে না করা
৪. স্ত্রীর পর্দা ও ইসলামি বিধান মেনে পড়াশোনা/চাকরি/ব্যবসার স্বাধীনতা
৫. শর্ত ভঙ্গ করলে নির্ধারিত অর্থ বা স্বর্ণ জরিমানা/ক্ষতিপূরণ
উত্তর
সাধারণ নীতি: বিবাহের শর্তাবলি
ইসলামি শরিয়তে বিবাহের চুক্তিতে শর্ত আরোপের ব্যাপারে ‘মুসলিমগণ তাদের শর্তাবলির ওপর প্রতিষ্ঠিত’ (আবু দাউদ, তিরমিজি) হাদিসটি মূলনীতি। তবে শর্ত অবশ্যই হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল করার উদ্দেশ্যে নয়। হানাফি মতে, বিবাহের শর্ত দু’প্রকার:
- সহিহ শর্ত (مشروع) – যা বিবাহের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং শরিয়তসম্মত।
যেমন: মোহরানা নির্ধারণ, স্ত্রীর আবাসন, ভরণপোষণ ইত্যাদি। - ফাসিদ শর্ত (فاسد) – যা বিবাহের মূল চুক্তির পরিপন্থী বা শরিয়তের কোনো বিধানের বিপরীত।
যেমন: স্ত্রীকে বিনা কারণে তালাক দেওয়ার আগে অন্য বিয়ে না করা, অথবা এমন জরিমানা যা সুদ বা জুয়ার শামিল।
উল্লিখিত শর্তগুলোর পর্যালোচনা
১. পরকীয়ায় লিপ্ত না হওয়া
এটি একটি অপরিহার্য ইসলামি বিধান (জিনা হারাম)। সুতরাং এই শর্ত শরিয়তসম্মত। তবে এটি একটি পূর্বঘোষিত নিষেধাজ্ঞা; শর্ত হিসেবে উল্লেখ করলে তা জোরদার হয়।
২. শারীরিক নির্যাতন না করা
এটিও স্বাভাবিকভাবে নিষিদ্ধ (সুরা নিসা ৪:১৯)। শর্ত হিসেবে বৈধ।
৩. স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে না করা
হানাফি মতে, এই শর্তটি সহিহ বলে গণ্য। কারণ এটি শরিয়তের কোনো হারামকে হালাল করে না, বরং স্বামীর ইচ্ছাকে সীমাবদ্ধ করে। ইবনে আবিদিন (রহ.) লিখেছেন:
“যদি স্ত্রী শর্ত করে যে, স্বামী আরেক বিয়ে করবে না, তাহলে এই শর্ত সহিহ এবং স্বামীর জন্য তা পালন করা ওয়াজিব। সে যদি ভঙ্গ করে, তাহলে স্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী তালাক দেওয়ার অধিকার থাকবে।”
(রদ্দুল মুহতার, ৩/১৬৪)
ফতোয়া আলমগিরিতে বলা হয়েছে: “যদি স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে, স্ত্রী এই শর্তের ভিত্তিতে আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ চাইতে পারে।”
(ফতোয়া আলমগিরি, ১/২৮৬)
সতর্কতা: দ্বিতীয় বিয়ে ইসলামে বৈধ, তাই এই শর্ত স্বামীর জন্য শরিয়তসম্মতভাবে বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু সেটি শর্ত হিসেবে ধার্য করা হলে তা পালন করা আবশ্যক। কোনো কোনো হানাফি ফকিহ এটিকে ফাসিদ বলেছেন, তবে প্রাধান্য শর্তটি সহিহ হওয়ার পক্ষে।
৪. স্ত্রীর পর্দা ও ইসলামি বিধান মেনে পড়াশোনা/চাকরি/ব্যবসার স্বাধীনতা
ইসলাম নারীকে পর্দার মধ্যে শিক্ষা, চাকরি ও ব্যবসার অনুমতি দেয়, তবে তা স্বামীর অনুমতি সাপেক্ষে এবং শরিয়তের সীমাবদ্ধতার মধ্যে। এই শর্তটি বিবাহের মূল চুক্তির পরিপন্থী নয়, বরং স্ত্রীর অধিকার সুরক্ষায় সহায়ক। তাই এটি শর্ত হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
শর্ত ভঙ্গের জন্য আর্থিক জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ বিধান
এটি শরিয়তসম্মত নয়। নিম্নোক্ত কারণে:
-
জরিমানা (غرامة) শুধু রাষ্ট্র বা আদালত আরোপ করতে পারে, ব্যক্তিগত চুক্তিতে জরিমানা ধার্য করা জুয়া বা সুদের শামিল হতে পারে।
(ফতোয়া উসমানি, ২/২৪২) -
হানাফি মতে, বিবাহের চুক্তিতে আর্থিক জরিমানা শর্ত ফাসিদ (অবৈধ) গণ্য। ইবনে আবিদিন (রহ.) লিখেছেন:
“যদি স্বামী শর্ত করে যে, সে যদি স্ত্রীকে প্রহার করে তাহলে তাকে এক হাজার টাকা দেবে, তাহলে এই শর্ত বাতিল। কারণ এটি জরিমানা, যা কেবল কাজি (বিচারক) নির্ধারণ করতে পারেন।”
(রদ্দুল মুহতার, ৩/১৬৫) -
ক্ষতিপূরণ (تضمين) শুধু সুনির্দিষ্ট ক্ষতির বিপরীতে আদায়যোগ্য, এবং তা আদালতের মাধ্যমে নির্ধারিত হতে হয়। অপরাধ না হলেও শর্ত ভঙ্গে পূর্বনির্ধারিত অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে আদায় করা জায়েজ নয়।
-
শর্ত ভঙ্গের জন্য জরিমানা কাবিননামায় থাকলে তা বিবাহের মূল চুক্তির পরিপন্থী। হাদিসে এসেছে:
“প্রত্যেক শর্ত যা কিতাবুল্লাহ (কুরআন) তে নেই, তা বাতিল, যদিও তা একশো শর্তও হয়।”
(বুখারি, মুসলিম) -
ফতোয়া উসমানির ভাষ্য:
“বিবাহের শর্তে আর্থিক জরিমানার বিধান রাখা জায়েজ নয়। বরং শর্ত ভঙ্গ করলে স্ত্রী তালাকের অধিকার বা বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারে।”
(ফতোয়া উসমানি, ২/২৩৯)
বিকল্প:
আর্থিক জরিমানার পরিবর্তে স্ত্রী তালাকের অধিকার বা প্রতিনিধি (তাফবিদ) হিসেবে রাখতে পারেন। যেমন:
- “যদি স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে, তাহলে স্ত্রী তালাক দেওয়ার অধিকার রাখবে।” (তাফবিদ তালাক)
- অথবা স্বামীর ওপর শর্ত ভঙ্গের জন্য একটি অতিরিক্ত মোহরানা (مهر) ধার্য করা, যা স্বামীকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি (واعد) হতে পারে—তবে তা বাধ্যতামূলক নয়, বরং ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে আদায়যোগ্য।
- আদালতের মাধ্যমে শর্ত ভঙ্গ প্রমাণ করে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করা।
সারসংক্ষেপ:
- ১, ২, ৪ নম্বর শর্তগুলো শরিয়তসম্মত।
- ৩ নম্বর শর্ত (দ্বিতীয় বিয়েতে স্ত্রীর অনুমতি) হানাফি মতে সহিহ ও বৈধ, তবে সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত।
- আর্থিক জরিমানা/ক্ষতিপূরণের বিধান শরিয়তসম্মত নয়। এটি ফাসিদ শর্ত, যা কাবিননামায় সংযোজন করা উচিত নয়।
প্রয়োজনীয় সুপারিশ
কাবিননামার ১৭ নম্বর কলামে বর্তমান যে শর্তগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলো শরিয়তসম্মত। তবে জরিমানার ধারাটি বাদ দিয়ে, শর্ত ভঙ্গের পরিণতি হিসেবে তালাকের অধিকার বা বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করার কথা উল্লেখ করা উত্তম। কোনো আর্থিক জরিমানা শর্ত না করাই সঙ্গত।