ফেসবুকের গিভওয়ে গুলোতে অংশগ্রহণ করা জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর:
ফেসবুকের বিভিন্ন গিভওয়ে (Giveaway) প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে পুরস্কার নেওয়ার বিধান প্রসঙ্গে ইসলামী ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী নিম্নরূপ বিশ্লেষণ করা হলো:
১. গিভওয়ের প্রকৃতি ও শর্ত:
আপনি যে ধরনের গিভওয়ের কথা উল্লেখ করেছেন—যেখানে পেজ লাইক, ফলো, পোস্ট শেয়ার, কমেন্ট করতে বলা হয়—তা মূলত একটি জুয়া বা কিস্তি (Lottery/Raffle) প্রকৃতির প্রতিযোগিতা। ইসলামী ফিকহে এ ধরনের লেনদেনকে "মাইসির" (জুয়া) বা "কিমার" বলা হয়, যা কুরআন ও হাদিস দ্বারা স্পষ্টভাবে হারাম।
২. কুরআন ও হাদিসের দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ "হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, পাথরের বেদি এবং তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ধারণ—এসব শয়তানের কাজের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তোমরা এসব থেকে বিরত থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।" (সূরা আল-মায়িদাহ: ৯০)
ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) এই আয়াতের তাফসিরে বলেন, "মাইসির" হলো এমন সব প্রতিযোগিতা যেখানে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে অর্থ বা শ্রম আদায় করা হয় এবং বিজয়ী নির্ধারণ করা হয় লটারির মাধ্যমে। (তাফসির ইবনে কাসির, ৩/১৮৫)
৩. হানাফি ফিকহের নীতি:
হানাফি মাযহাবের প্রখ্যাত ফকিহ ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ রাদ্দুল মুহতার -এ বলেন:
"জুয়া হলো এমন লেনদেন যেখানে দুই পক্ষের মধ্যে এমন শর্ত থাকে যে, বিজয়ী নির্ধারিত অর্থ বা বস্তু পাবে এবং পরাজিত তা হারাবে। এটি হারাম।" (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯৯)
৪. গিভওয়েতে অংশগ্রহণের বিধান:
আপনি যে গিভওয়ের কথা বলেছেন, সেখানে অংশগ্রহণের জন্য পেজ লাইক, ফলো, শেয়ার, কমেন্ট করতে বলা হয়। এটি মূলত অংশগ্রহণকারীর শ্রম ও সময় ব্যয় করে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া, যেখানে বিজয়ী নির্ধারিত হয় লটারির মাধ্যমে। এটি স্পষ্টতই জুয়া (মাইসির) এর অন্তর্ভুক্ত।
৫. ব্যতিক্রম ক্ষেত্র:
তবে যদি কোনো গিভওয়ে এমন হয় যেখানে:
- অংশগ্রহণের জন্য কোনো শর্ত না থাকে (যেমন: শুধু পেজে প্রবেশ করলেই অংশগ্রহণ করা যায়)
- বিজয়ী নির্ধারণে কোনো লটারি বা দৈবচয়ন না থাকে
- বরং সঠিক উত্তর দেওয়ার ভিত্তিতে বিজয়ী নির্ধারিত হয় (যেমন: কুইজ প্রতিযোগিতা)
তাহলে সেটি জায়েজ হতে পারে, কারণ এটি জ্ঞানের প্রতিযোগিতা, যা ইসলামে অনুমোদিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘোড়দৌড় ও তীরন্দাজি প্রতিযোগিতায় পুরস্কার দেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৭৪)
৬. ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়ার নির্দেশনা:
মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) তার ফতোয়ায় বলেন:
"যে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য অর্থ বা শ্রম ব্যয় করতে হয় এবং বিজয়ী নির্ধারিত হয় লটারির মাধ্যমে, তা জুয়া। আর যে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীর কোনো প্রকার ক্ষতি হয় না এবং বিজয়ী নির্ধারিত হয় যোগ্যতার ভিত্তিতে, তা জায়েজ।" (ফিকহুল বুয়ু, ২/১২৩)
৭. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, ফেসবুকের গিভওয়েতে পেজ লাইক, ফলো, শেয়ার, কমেন্ট করে অংশগ্রহণ করা এবং লটারির মাধ্যমে বিজয়ী নির্ধারণ করা—এটি হারাম (নাজায়েজ)। কারণ:
- এটি মাইসির (জুয়া) এর অন্তর্ভুক্ত
- অংশগ্রহণকারীর সময় ও শ্রম ব্যয় হয়
- বিজয়ী নির্ধারণে দৈবচয়ন (লটারি) থাকে
৮. পরামর্শ:
আপনি যদি এই ধরনের গিভওয়েতে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন, তবে তা আপনার জন্য কল্যাণকর। যদি কোনো কারণে অংশগ্রহণ করে ফেলেন এবং পুরস্কার পান, তবে সেই পুরস্কার গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত এবং তা দান করে দেওয়া উত্তম। কারণ হারাম উপার্জন নিজে ব্যবহার করা জায়েজ নয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিকের তাওফিক দান করুন। আমিন।
দলিলসমূহ:
- সূরা আল-মায়িদাহ: ৯০
- রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯৯
- ফিকহুল বুয়ু, ২/১২৩
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৯৪
- ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫৬