জাদুর প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাই।
Waswasa-OCD · Hanafi
Question
পূর্ববর্তী কিছু প্রশ্নের দরুন, ওস্তাদ সিহর এর সম্ভাবনা আছে বলেছিলেন।
আমলে মাঝেমধ্যে পিছটান হয়ে যায়। আল্লাহ মাফ করুন।
তবে, আজ রাতে হঠাৎ ১:৩০ এমন সময়ের দিকে ঘুমোতে গেলে,ফোন হাতে থাকা অবস্থায় হঠাৎ মনে হলো, খাট কেঁপে উঠছে। ভয়ে লাইট অন করি,মনে হচ্ছিল সব ঘোলা হচ্ছে। মনে পড়লো হিফাজতের আমল বাকি এবং বাকারাহ শুনাও বাকি ছিল ২৩৫ থেকে সম্ভবত। এরপর আমলে করেে শুনতে থাকি। তবুও শরীর কাঁপা কাপা অনুভব হচ্ছিল যদিও হাত পা দেখে মনে হচ্ছিল না যে কাঁপছে। আবার হঠাৎ কেমন কেমন সাউন্ড অনুভব করছিলাম ফোন থেকে। ২য়বার শুনতে গেলে মনে হচ্ছিল কোনো বাচ্চার কান্নার আওয়াজ ভাসা ভাসা। আমার মনের ভুল কি না জানিনা যেহেতু আশেপাশে ছোট বাচ্চারাও থাকে।
গত কয়েক মাস-ই ঘুমোলে কাঁপা কাঁপা অনুভব করি। উঠেও এখন বুঝতে পারি। গতরাত থেকে বাকারাহ নিয়মিত শুনার আবার নিয়ত করেছি, শুনতে শুনতেই রাতে ঘুমেই ভয় পাই। দেকি যপ জিন পুরুষ আমাকে আটকে রাখচে। শোয়ার এঙ্গেল আমার মতোই। রুম অন্ধকারে। পা ও আটকে রাখছে,আর আমি ছেড়ে দিতে বলছি। সে বলছে আৃার গুনাহেরি ফল সে ছাড়বেনা বা হয়তো আমিই বলছিলাম গুনাহের কারভে আমার এমন হচ্ছে। আগে দেখতাম আমল করেও আমার থেকে জিন যাচ্ছে না। এখন কাল দেখলাম আমল করার পর ছেড়ে দিলো। চাপ ছিল। ঘুম ভাঙতেই আগের দিনগুলোর মতো ভয় আর ঝাঁকুনি অনুভব করলাম।
নামাজ ছিলনা তাই গতকালপ হিফাজতের আমল ভুলেন গিয়েছওলাম। বাথরুমে কাপড় বেশি সময় রাখার অভ্যেস ছিল যা চেন্জ করারও চেস্টা করছি ইন্ শা আল্লহ। বারান্দায় মেলেই আসছি তবে এমন হলো। বারান্দায় না রাখারও চেষ্টা করবো। তবে এসব আসলে কী? সিহর/জিন ঘটিত কিছু/ নজর? কীভাবে বুঝবো। আনার এখানে পানির মোটর সমস্যার কারণে পানি দেরিতে আসে তাই যে-কোন কাজেও বাথরুমে অনেক সময় লেগে যায়। সবকিছু মিলে কী ভাবে রুকিয়াহ করবো এও বুঝে উঠতে পারছিনা। ঢাকায় কেমন পে করতে হয় তাও জানিনা আবার আমার পক্ষে কোনো মুদাব্বিরের কাছে যাওয়াও সম্ভব নয়। বাসায় কাউকে জানানো ও যাবেনা। গুছিয়ে বলতে না পারার জন্য আফওয়ান। তবে, আমার পড়াশোনা, আমল সব আটকে আছে। এমনকি আইওএম এর পড়াশোনা তেও সামলে না নিতে পারায় ড্রপ দিতে হয়েছে। নফসের কন্ট্রোল ও হচ্ছে না। সমস্যা বুঝতে পারছিনা, আবার কী করবো এও না। আরেকদিন স্বপ্নে দেখেছি। খাটের উপর অনেক উইপোকা যদিও রেশমপোকার মতো,আমি স্বপ্নে উইপোকা বলছিলাম। খাট ভরা ছিল, আমি ঝারছিলাম,তখন কওছু হাতপ উঠে হাত ভরে যায় ২ হাত,এবং কিছু পোলা কামড়ও দেয়,আমি সরায়ও শেষ করতে পারছিলাম না। এরপ থেকেই উল্টো পাল্টে দেখেই যাচ্ছি। আল্লাহ মাফ করুন
আল্লাহ ভালো জানেন!
দ্রুত সমাধান জানানোর অনুরোধ
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতuh।
আপনার বিস্তারিত প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি যে সমস্ত জিনিসের সম্মুখীন হচ্ছেন—ঘুমের সময় খাট কাঁপা, শরীর কাঁপা, ভয়, অদ্ভুত শব্দ, স্বপ্নে জিন/পোকা দেখা, আমলে অলসতা, পড়াশোনায় মনোযোগ না থাকা—এগুলো ইসলামী পরিভাষায় 'সিহর' (জাদু), 'জিন আছর' (জ্বিনের প্রভাব) অথবা 'নজর' (বদনজর) এর লক্ষণ হতে পারে। তবে, এর পাশাপাশি এটি 'ওয়াসওয়াসা' (মনের সন্দেহ ও ভয়) এবং মানসিক চাপের কারণেও হতে পারে। যেহেতু আপনি উল্লেখ করেছেন যে আপনার ওস্তাদ সিহরের সম্ভাবনার কথা বলেছেন, তাই আমরা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এর সমাধান এবং রুকিয়াহ (চিকিৎসা) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।
সিহর, জিন ও নজর: পার্থক্য ও লক্ষণ
১. সিহর (জাদু): এটি সাধারণত কারো ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে কুরআনের আয়াত বা জাদুকরী মন্ত্র ব্যবহার করে করা হয়। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে: * ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখা (যেমন: সাপ, বিচ্ছু, পোকা দেখা)। * ঘুম থেকে উঠে শরীরে দুর্বলতা বা ব্যথা অনুভব করা। * স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি বা ঘৃণা সৃষ্টি হওয়া। * কোনো কাজে অলসতা ও অনীহা। * হঠাৎ করে শরীর কাঁপা বা খিচুনি।
-
জিন আছর (জ্বিনের প্রভাব): এটি কোনো জিনের দ্বারা সরাসরি ক্ষতি বা প্রভাব। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- ঘুমের মধ্যে ভয় পাওয়া, খাট কাঁপানো বা শরীরে ভারী অনুভব করা।
- হঠাৎ করে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া।
- কারো সাথে কথা বলার সময় অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা খিঁচুনি হওয়া।
- ইবাদত-বন্দেগিতে অলসতা ও বিরক্তি।
-
নজর (বদনজর): এটি কারো প্রশংসা বা হিংসার কারণে ক্ষতি হওয়া। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- হঠাৎ করে শারীরিক বা মানসিক অবনতি।
- কোনো কারণ ছাড়াই অসুস্থ বোধ করা।
- পড়াশোনায় বা কাজে মনোযোগ কমে যাওয়া।
আপনার বর্ণিত লক্ষণগুলো (খাট কাঁপা, শরীর কাঁপা, ভয়, স্বপ্নে পোকা দেখা, আমলে অলসতা) সিহর বা জিন আছরের সাথে মিলে যায়। তবে, আপনি নিজেই বলেছেন যে আপনার "নফসের কন্ট্রোল" হচ্ছে না এবং "পড়াশোনা, আমল সব আটকে আছে"। এটি মানসিক চাপ এবং ওয়াসওয়াসার কারণেও হতে পারে। তাই প্রথমে আপনাকে মানসিকভাবে শান্ত হতে হবে এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখতে হবে।
রুকিয়াহ (চিকিৎসা) করার নিয়ম
রুকিয়াহ হলো কুরআন ও হাদিসের বর্ণিত দোয়া দ্বারা চিকিৎসা। এটি নিজে করা উত্তম। আপনাকে কোনো মুদাব্বির বা পীরের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আপনি নিজেই ঘরে বসে নিম্নোক্ত নিয়মে রুকিয়াহ করতে পারেন:
১. পবিত্রতা ও নিয়ত: প্রথমে অজু করুন এবং নিয়ত করুন যে, আপনি আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর শেখানো দোয়া দ্বারা চিকিৎসা নিচ্ছেন।
২. পানি পড়া: একটি পরিষ্কার পাত্রে পানি নিন। এই পানি দিয়ে রুকিয়াহ করুন। রুকিয়াহর জন্য নিম্নোক্ত সূরাগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিতে পারেন: * সূরা ফাতিহা (১ বার) * আয়াতুল কুরসি (১ বার) * সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (আমানার রাসূলু) (১ বার) * সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস (প্রতিটি ৩ বার) * সূরা কাফিরুন (১ বার)
এই পানি দিয়ে ৩ দিন পর্যন্ত গোসল করুন এবং কিছু পানি পান করুন। এছাড়া এই পানি দিয়ে ঘরের মেঝে, দেয়াল এবং বিছানায় ছিটিয়ে দিতে পারেন।
৩. তেল পড়া: অলিভ অয়েল বা কালোজিরার তেলের বোতলে উপরোক্ত সূরাগুলো পড়ে ফুঁ দিয়ে সেই তেল দিয়ে শরীরের যে অংশে ব্যথা বা কাঁপুনি অনুভব করেন, সেখানে মালিশ করতে পারেন।
৪. সূরা বাকারাহ তিলাওয়াত: আপনি ইতিমধ্যেই সূরা বাকারাহ নিয়মিত শোনার নিয়ত করেছেন, এটি খুবই ভালো। সূরা বাকারাহ নিয়মিত তিলাওয়াত বা শ্রবণ করলে ঘর থেকে জিন-শয়তান পালিয়ে যায়। হাদিসে এসেছে, "তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না। নিশ্চয়ই শয়তান সেই ঘর থেকে পালিয়ে যায়, যেখানে সূরা বাকারাহ তিলাওয়াত করা হয়।" (সহীহ মুসলিম: ৭৮০)
৫. সকাল-সন্ধ্যার আমল: সকাল-সন্ধ্যার যিকিরগুলো (যেমন: আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস, সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার) নিয়মিত পড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো জিন-শয়তান ও জাদু থেকে রক্ষা করার জন্য ঢাল স্বরূপ।
অতিরিক্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
-
নামাজের প্রতি যত্নবান হোন: আপনি উল্লেখ করেছেন যে "নামাজ ছিলনা তাই গতকাল হিফাজতের আমল ভুলে গিয়েছিলাম"। নামাজ হলো মুমিনের মেরাজ এবং এটি সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে রক্ষা করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করার চেষ্টা করুন। নামাজের পর আয়াতুল কুরসি ও সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস পড়া অভ্যাস করুন।
-
পর্দা ও পরিচ্ছন্নতা: ঘরের পর্দা, বিশেষ করে বিছানার চাদর ও কাপড়-চোপড় সবসময় পরিষ্কার রাখুন। ঘুমানোর আগে বিছানা ঝেড়ে নিন এবং "বিসমিল্লাহ" বলে ঘুমানোর চেষ্টা করুন। আপনি যে বাথরুমে কাপড় বেশি সময় রাখার অভ্যাসের কথা বলেছেন, সেটি পরিবর্তন করার চেষ্টা করছেন, এটি খুবই ভালো উদ্যোগ। কাপড়চোপড় যেন বেশি দিন নোংরা অবস্থায় না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন।
-
মানসিক চাপ কমানো: আপনি পড়াশোনা এবং নফস নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। এই চাপ আপনার ওয়াসওয়াসাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম, হাঁটাহাঁটি এবং পরিবারের সাথে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে একজন ভালো মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের (সাইকোলজিস্ট) পরামর্শ নিতে পারেন। কারণ, ঘুমের মধ্যে কাঁপা বা ভয়ের অনেকগুলো শারীরবৃত্তীয় কারণও থাকতে পারে।
-
মনে রাখবেন: আপনি যে স্বপ্নে জিন বা পোকা দেখেছেন, সেগুলো সিহরের সাধারণ লক্ষণ। তবে, এর অর্থ এই নয় যে আপনি সবসময় ভয়ে থাকবেন। ভয় পেলে সাথে সাথে "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।
দোয়া ও যিকির
- ঘুমানোর আগে: আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে দুই হাতে ফুঁ দিয়ে সারা শরীরে মালিশ করুন। এটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর শেখানো আমল।
- সকাল-সন্ধ্যায়: "বিসমিল্লাহিল্লাযি লা ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিসসামা'ই ওয়া হুয়াস সামিউল আলিম" (যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় এই দোয়াটি ৩ বার পড়বে, তাকে কোনো জিন বা জাদু ক্ষতি করতে পারবে না) - এই দোয়াটি নিয়মিত পড়ুন।
- সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার: এটি পড়া গুনাহ মাফের জন্য খুবই উত্তম। আপনি গুনাহের কথা উল্লেখ করেছেন, তাই এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়ুন।
উপসংহার
আপনার সমস্যা যাই হোক না কেন, আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখুন। তিনি সবকিছুর সমাধান দিতে সক্ষম। উপরোক্ত রুকিয়াহ এবং আমলগুলো নিয়মিত করলে, ইনশাআল্লাহ, আপনি ধীরে ধীরে আরাম পাবেন। মনে রাখবেন, এটি একটি পরীক্ষা। ধৈর্য ধরুন এবং আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করুন। আপনার জন্য এই দোয়া করছি যে, আল্লাহ আপনাকে এই সকল সমস্যা থেকে মুক্তি দিন এবং আপনার পড়াশোনা ও আমলগুলোতে বরকত দান করুন। আমিন।
বিঃ দ্রঃ আপনি যদি মনে করেন সমস্যা গুরুতর, তাহলে কোনো অভিজ্ঞ ও আলেম (যিনি কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক রুকিয়াহ করেন) এর সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। তবে, ঘরে বসে নিজে রুকিয়াহ করাই সবচেয়ে নিরাপদ ও উত্তম পদ্ধতি।