আমানত ফিরিয়ে দেওয়ার বিধান
Family Life · Hanafi
Question
Answer
মূলনীতি
১. আমানত (Trust) সংরক্ষণ ও ফেরত দেওয়া ফরজ
যে ব্যক্তি কারো কাছে আমানত রাখে, তা ফেরত দেওয়া তার উপর ফরজ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারকে ফেরত দাও।" (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
أَدِّ الْأَمَانَةَ إِلَى مَنِ ائْتَمَنَكَ "যে ব্যক্তি তোমার কাছে আমানত রেখেছে, তার আমানত তুমি ফেরত দাও।" (আবু দাউদ, তিরমিজি)
২. ঋণ (Debt) পরিশোধ করা ওয়াজিব
বড় ভাই ছোট ভাইয়ের টাকা নিজের ব্যবসায় ব্যবহার করেছেন—এটি ঋণ হিসেবে গণ্য হবে। ঋণ পরিশোধ করা ওয়াজিব। হাদিসে এসেছে:
مَنْ أَخَذَ أَمْوَالَ النَّاسِ يُرِيدُ أَدَاءَهَا أَدَّى اللَّهُ عَنْهُ "যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ গ্রহণ করে তা পরিশোধ করার নিয়তে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করে দেন।" (বুখারি)
৩. স্বেচ্ছায় দান (Hibah) বনাম ঋণ (Qard)
ছোট ভাই বড় ভাইকে যে টাকা দিয়েছেন—তা যদি আমানত/জমা হিসেবে দিয়ে থাকেন (যেমনটি প্রশ্ন থেকে প্রতীয়মান), তবে তা ঋণ হিসেবে গণ্য হবে এবং ফেরত দেওয়া আবশ্যক। কিন্তু যদি স্বেচ্ছায় দান/উপহার হিসেবে দিয়ে থাকেন, তবে তা ফেরত দেওয়া আবশ্যক নয়।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) বলেন:
الْقَرْضُ يَلْزَمُ رَدُّهُ وَالْهِبَةُ لَا يَلْزَمُ رَدُّهَا "ঋণ ফেরত দেওয়া আবশ্যক, আর উপহার ফেরত দেওয়া আবশ্যক নয়।" (রদ্দুল মুহতার)
নির্দিষ্ট মাসআলার সমাধান
১. জমাকৃত ২৮ লক্ষ টাকা
ছোট ভাই প্রতি মাসে বড় ভাইয়ের কাছে টাকা জমা রেখেছেন—এটি স্পষ্টতই আমানত/ঋণ হিসেবে গণ্য হবে। বড় ভাইয়ের জন্য তা ফেরত দেওয়া ফরজ/ওয়াজিব। এ টাকা তিনি নিজের ব্যবসায় খাটিয়ে লাভ করেছেন—লাভের অংশ ছোট ভাইকে দিতে হবে কি না, তা নির্ভর করে চুক্তির উপর। যদি চুক্তি ছিল "ব্যবসায় খাটাও, পরে দিয়ে দিও"—তবে এটি ঋণ হিসেবে গণ্য হবে এবং শুধু মূল টাকা ফেরত দিলেই চলবে, লাভের অংশ দিতে হবে না। কিন্তু যদি চুক্তি ছিল অংশীদারত্বের (Mudaraba), তবে লাভের অংশও দিতে হবে।
২. বড় ভাই কর্তৃক গৃহীত ৩ লক্ষ টাকা
বড় ভাই ২০২৫ সালের ঈদের আগে ৩ লক্ষ টাকা নিয়েছেন এবং বলেছেন "ঈদের পর দিয়ে দেব"—এটি স্পষ্ট ঋণ। ঈদের পর না দেওয়া সম্পূর্ণ অন্যায়। এটি ফেরত দেওয়া ওয়াজিব।
৩. বাসার টাকা (১০-১২ লক্ষ)
ছোট ভাই বাসার জন্য ১০-১২ লক্ষ টাকা বেশি দিয়েছেন। বড় ভাই বলেছিলেন "ওই টাকার সাথে দিয়ে দেব"—অর্থাৎ এটি ঋণ হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু ছোট ভাই বলছেন "এটি আমি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ দিয়েছি, ফেরত নেব না"—যদি ছোট ভাই সত্যিই স্বেচ্ছায় এটি দান করে থাকেন, তবে তা ফেরত দেওয়া আবশ্যক নয়। তবে যদি এটি দানের নিয়তে না হয়ে বিনিয়োগ/ঋণ হিসেবে ছিল, তবে ফেরত দিতে হবে।
৪. আগের খরচের হিসাব (বোনের বিয়ে, দোকান পুড়ে যাওয়ার ঋণ ইত্যাদি)
বড় ভাই আগে পরিবারের জন্য যে খরচ করেছেন—তা যদি স্বেচ্ছায় করেছেন (যেমন বড় ছেলে হিসেবে সংসার চালানো), তবে তা ফেরত দাবি করা যাবে না। ইসলামে পিতা-মাতা ও ভাই-বোনের জন্য খরচ করা সওয়াবের কাজ, যা ফেরত দাবি করা যায় না।
তবে যদি সেসব খরচ ঋণ হিসেবে ছিল (যেমন কারো কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বোনের বিয়ে দেওয়া, যা পরিবারের সবার উপর দায়িত্ব ছিল), তবে সেক্ষেত্রে সব ভাই মিলে তা পরিশোধ করা উচিত ছিল। কিন্তু যেহেতু বড় ভাই স্বেচ্ছায় তা করেছেন, তাই এখন ছোট ভাইকে তা ফেরত দিতে বলা সঠিক নয়।
ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) বলেন:
مَا أَنْفَقَ الرَّجُلُ عَلَى أَهْلِهِ وَأَقَارِبِهِ مُتَطَوِّعًا لَا يَرْجِعُ بِهِ "কোনো ব্যক্তি নিজ পরিবার ও আত্মীয়দের উপর স্বেচ্ছায় যা খরচ করে, তা ফেরত দাবি করতে পারে না।" (আল-মাবসুত, সারাখসি)
করণীয় সম্পর্কে ইসলামী নির্দেশনা
১. বড় ভাইয়ের কর্তব্য
- ছোট ভাইয়ের জমাকৃত ২৮ লক্ষ টাকা এবং গৃহীত ৩ লক্ষ টাকা ফেরত দেওয়া ফরজ।
- বাসার জন্য ছোট ভাই যে টাকা দিয়েছেন—যদি তা ঋণ হিসেবে ছিল, তবে ফেরত দিতে হবে; যদি দান ছিল, তবে ফেরত দেওয়া আবশ্যক নয়।
- ছোট ভাইয়ের টাকা ব্যবসায় খাটিয়ে লাভ করেছেন—যদি অংশীদারত্বের চুক্তি না থাকে, তবে লাভের অংশ দিতে হবে না, শুধু মূল টাকা ফেরত দিলেই হবে।
২. ছোট ভাইয়ের কর্তব্য
- বড় ভাই ছোটবেলায় তার জন্য যা করেছেন—তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকা উচিত এবং দোয়া করা উচিত।
- বড় ভাই যদি আর্থিক সংকটে থাকেন, তবে কিছু সময় দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণ মাফ করা তার ইচ্ছার উপর নির্ভর করে।
- ছোট ভাই যদি স্বেচ্ছায় কিছু টাকা মাফ করতে চান (বড় ভাইয়ের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে), তবে তা তার জন্য সওয়াবের কাজ হবে।
৩. পারিবারিক সমাধান
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلَاثٍ "কোনো মুসলিমের জন্য তার ভাইকে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক ছিন্ন করা বৈধ নয়।" (বুখারি, মুসলিম)
তাই উত্তম হলো—পারিবারিকভাবে বসে সমস্যার সমাধান করা। পরিবারের বড়রা (বাবা, মুরুব্বি) মধ্যস্থতা করতে পারেন। যদি পারিবারিকভাবে সমাধান না হয়, তবে ইসলামী সালিশি পরিষদ বা মসজিদের ইমাম-এর মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে।
ফতোয়া
প্রশ্নের আলোকে আমাদের ফতোয়া:
১. ছোট ভাই বড় ভাইয়ের কাছে যে ২৮ লক্ষ টাকা জমা রেখেছিলেন—তা আমানত/ঋণ হিসেবে গণ্য হবে। বড় ভাইয়ের জন্য তা ফেরত দেওয়া ফরজ। এ টাকা ফেরত না দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম ও গুনাহের কাজ।
২. বড় ভাই কর্তৃক গৃহীত ৩ লক্ষ টাকা—এটিও ঋণ। ঈদের পর ফেরত দেওয়ার কথা বলে না দেওয়া অন্যায়। এটি ফেরত দেওয়া ওয়াজিব।
৩. বাসার জন্য ছোট ভাইয়ের দেওয়া ১০-১২ লক্ষ টাকা—ছোট ভাই যদি স্বেচ্ছায় দান করে থাকেন (কৃতজ্ঞতা হিসেবে), তবে তা ফেরত দেওয়া আবশ্যক নয়। কিন্তু বড় ভাই যদি "দিয়ে দেব" বলে থাকেন, তবে সেটি ঋণ হিসেবে গণ্য হবে এবং ফেরত দেওয়া উচিত।
৪. বড় ভাই আগে পরিবারের জন্য যে খরচ করেছেন—তা স্বেচ্ছায় করায় ফেরত দাবি করা যাবে না। তবে বোনের বিয়ে ও দোকান পুড়ে যাওয়ার ঋণ যদি পরিবারের সবার উপর দায়িত্ব ছিল এবং বড় ভাই একাই পরিশোধ করেছেন, তবে ন্যায়সঙ্গতভাবে অন্য ভাইদেরও অংশ দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এখন ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে তা ফেরত নেওয়া সঠিক নয়, বিশেষ করে যখন ছোট ভাই তখন নাবালক/ছোট ছিল।
৫. বড় ভাইয়ের উচিত—ছোট ভাইয়ের টাকা ফেরত দেওয়া এবং সম্পর্ক ঠিক রাখা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
مَنْ كَانَتْ عِنْدَهُ مَظْلِمَةٌ لِأَخِيهِ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهَا "যে ব্যক্তির কাছে তার ভাইয়ের কোনো হক থাকে, সে যেন তা আদায় করে দেয়।" (বুখারি)
উপসংহার
ইসলামে আমানত ফেরত দেওয়া এবং ঋণ পরিশোধ করা ফরজ। বড় ভাইয়ের জন্য ছোট ভাইয়ের টাকা আত্মসাৎ করা সম্পূর্ণ হারাম। তবে পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য উভয় পক্ষের সদিচ্ছা প্রয়োজন। ছোট ভাই বড় ভাইয়ের অবদানের জন্য কৃতজ্ঞ থাকবেন এবং সম্ভব হলে কিছু টাকা মাফ করতে পারেন, কিন্তু বড় ভাইয়ের উচিত নয় জোর করে ছোট ভাইয়ের টাকা আটকে রাখা।
আল্লাহ তাআলা উভয়কে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন এবং পারিবারিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করুন। আমিন।