বড় ভাই ছোট ভাইয়ের টাকা না দিলে করণীয়

Family Life · Hanafi

Question No: 4155
Questioner: Sraboni Tabassum
Question Asked: 19 Aug 2026, 08:41 AM
Reviewed & Published: 19 Aug 2026, 09:06 AM
Views: 32
Tokens: 9,313
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

৩১ লাখ + বাসার ১০ লাখের মতো। ৪১ লাখ। তো হিসাবের কিছুদিন পরই তাদের মধ্যে এক বিষয় নিয়া অনেক ঝগড়া হয়। তো ছোট ভাই বলে আচ্ছা আমার টাকা আমাকে ফেরত দিয়ে দিও সময় নিয়ে পরে তুমি তোমার মতো ভালো থাকো আমি আমার মতো। তো ঝগড়ার এক পর্যায়ে বড় ভাই বলে কিসের টাকা পাস তুই। কোনো টাকা না। এরপর আবার বলে ২০ লাখ পায়। বাকি টাকার হিসাব নাই এখন। তো ছোট ভাই আমার হাসবেন্ড অনেক ভেঙে পড়ে।ভাই কে বিশ্বাস করে নিজের সব ইনকাম দিয়ে গেছে এখন ওই ভাই বলে টাকার হিসাব নাই অথচ কয়েকদিন আগেই হিসাব হয়েছে।বাবা মা ও খুশি ছিল এই ভেবে বড় সন্তান সবার জন্য করেছে একসময় এখন ছোট জনের টাকা বড়জনকে পাঠাচ্ছে। এখন কিছু হলেই বলে আগের বোনের বিয়ে ঋণ সবকিছুর ভাগও ছোট ভাইকে এখন নিতে হবে। বড় ভাই তখন করেছে। এখন ছোট ভাই ইনকাম করে তাই বড় ভাইকে ফেরত দিতে হবে যদিও তখন ছোট ভাই বাচ্চা ছেলে ছিল।তবে তারা মেঝ ভাই কে এসব বোনের বিয়ে ঋণ কিছুই দিতে বলে না। এখন বাবা মা ও বড় সন্তানের পক্ষেই বলতে গেলে। তাদের খারাপ সময়ে বড় সন্তুান হাল ধরেছে এখন বড় ভাই যা দিবে সেটাই নিলে ভালো হয়। কিছু হলেই বলে বড় ভাই এতো আদর যত্ন করে বড় করেছে। এখন আসলে কি করা উচিত??? বড় ভাইবোনদের ভালোবাসা একদিকে টাকার হিসাব আরেকদিকে এমনটাই জানি আমি। একটা কথা আছে অপরকে সাহায্য করো আপন মনে করে আর টাকার হিসাবের সময় আপনকেও পর ভাবো। যখন টাকা জমা রাখছিল তখন কেন বললো না যে এসব কিন্তু আগের সব খরচে তারা কাটিয়ে দিবে। তখন কেন বলছে সব ফেরত দিবে। এতো বিশ্বাসের পর সব দিয়ে যদি এভাবে এখন এমন করে করণীয় কি? এমন হতে পারে বড় ভাইকে ছোট ভাই যেগুলো আমানত হিসাবে দিছিলো সেগুলো আগে ফেরত দিক পরে তিন ভাই বাবা সহ বসে ওই সময় ঋণ বিয়ে কত খরচ হয়েছিল সবাই ভাগ করে নিবে একা একজনের উপর কেন আসবে সব?এখন সব পরিবারেই বড় ছেলে থাকলে সংসারের হাল ধরে বাবার সাথে তাই বলে কি যে ওইসময় ছোট ছিল কাজ করার বয়স হয় নাই তার উপর যাবে? আর গেলেও ওই টাকাগুলো তার কাছে আমানত দেওয়া ছিল এতদিন পর্যন্ত বলেছে দিয়ে দিবে এখন কেন হঠাৎ পুরনো দিনের ওইসব কথা তুলে আনছে? টাকা জমা রাখার সময় তো এটা বলে জমা রাখে নাই তখন এগুলো করেছিল তাই পরে টাকা কাটা হবে? টাকা কি ফেরত দেওয়া উচিত?? প্রশ্ন বুঝাতে পারছি কি না জানি না

Answer

টাকা-পয়সা আমানত ও পারিবারিক হিসাব-নিকাশ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর

উত্তর:

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এর সমাধান নিম্নরূপ:

১. আমানতের বিধান

যে টাকা ছোট ভাই বড় ভাইয়ের কাছে আমানত হিসেবে জমা রেখেছিল, তা ফেরত দেওয়া বড় ভাইয়ের উপর ফরজ (অবশ্যকীয়) । আল্লাহ তাআলা বলেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দাও।" (সূরা আন-নিসা: ৫৮)

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

"আমানত আদায় করো সেই ব্যক্তির প্রতি, যে তোমাকে আমানত দিয়েছে।" (আবু দাউদ, তিরমিজি)

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ বলেন:

"আমানতকারী যখন আমানত ফেরত চায়, তখন আমানতদারকের জন্য তা ফেরত দেওয়া ওয়াজিব। বিনা কারণে বিলম্ব করা জায়েয নয়।" (রাদ্দুল মুহতার, ৫/৬৮০)

২. বোনের বিয়ের ঋণ ও খরচের হিসাব

বোনের বিয়ের খরচ বা পারিবারিক ঋণ কে বহন করবে—এ বিষয়ে ইসলামী নিয়ম হলো:

  • পিতার উপর সন্তানদের ভরণপোষণ ও বিবাহের খরচ দেওয়া ওয়াজিব যদি পিতা সামর্থ্যবান হন।
  • পিতা অসামর্থ্য হলে সন্তানদের মধ্যে সামর্থ্য অনুযায়ী ভাগ করে দেওয়া উচিত।
  • কোনো এক সন্তানের উপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া জুলুম এবং ইসলামসম্মত নয়।

ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় আছে:

"পিতার উপর সন্তানের বিবাহের খরচ দেওয়া ওয়াজিব, যদি পিতা সামর্থ্যবান হয়। পিতা অসামর্থ্য হলে সন্তানদের উপর ওয়াজিব হয়—প্রত্যেকে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী অংশগ্রহণ করবে।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৫৫০)

৩. বড় ভাইয়ের দাবি "টাকার হিসাব নাই"—এটা কি জায়েয?

না, এটি সম্পূর্ণ অন্যায় ও জুলুম।

  • যে টাকা আমানত হিসেবে জমা রাখা হয়েছে, তা ফেরত দেওয়া ফরজ
  • টাকার অস্তিত্ব অস্বীকার করা বা "হিসাব নাই" বলা মিথ্যা ও গুনাহের কাজ
  • রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

    "যে ব্যক্তি কারো সম্পদ আত্মসাৎ করল, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (বুখারি, মুসলিম)

ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেন:

"আমানতদারকের জন্য আমানত অস্বীকার করা বা আত্মসাৎ করা কবিরা গুনাহ। তাকে অবশ্যই ফেরত দিতে হবে এবং তওবা করতে হবে।" (আল-আসার, ২/৮৫)

৪. ছোট ভাই তখন নাবালক ছিল—এখন কি দায়িত্ব নিতে হবে?

  • ছোট ভাই তখন নাবালক (বাচ্চা) ছিল, কাজ করার বয়স হয়নি—এমতাবস্থায় তার উপর বোনের বিয়ের খরচ বহন করা ওয়াজিব নয়
  • বড় ভাই তখন স্বেচ্ছায় খরচ করেছে—এখন তা ফেরত দাবি করা জুলুম
  • ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বলেন:

    "যদি কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কারো জন্য খরচ করে, তবে তা দান হিসেবে গণ্য হবে; পরবর্তীতে ফেরত দাবি করা জায়েয নয়।" (আল-আসার, ২/৯০)

৫. মেঝো ভাইকে বাদ দিয়ে শুধু ছোট ভাইকে দায়িত্ব দেওয়া

এটি স্পষ্ট বৈষম্য ও জুলুম। ইসলামে ন্যায়বিচারের নির্দেশ রয়েছে:

"তোমরা ন্যায়বিচার করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।" (সূরা আল-হুজুরাত: ৯)

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন:

"পারিবারিক খরচে সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য করা জায়েয নয়। প্রত্যেকে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী অংশগ্রহণ করবে।" (মা'আরিফুল কুরআন, ৪/৪৫০)

৬. করণীয় কী?

আপনার (ছোট ভাইয়ের) করণীয়:

১. বড় ভাইকে শান্তভাবে বলুন: "আমার টাকা আমার আমানত ছিল, ইসলামের বিধান অনুযায়ী তা ফেরত দিন।"

২. বোনের বিয়ের খরচের হিসাব: তিন ভাই ও বাবা মিলে বসে নির্ধারণ করুন—সে সময় কে কত খরচ করেছে এবং কার উপর কত দায়িত্ব ছিল। ন্যায়সঙ্গতভাবে ভাগ করুন

৩. মধ্যস্থতা: পরিবারের কোনো বিজ্ঞ ব্যক্তি বা স্থানীয় ইমাম/মুফতির মাধ্যমে মীমাংসা করুন।

৪. আমানতের টাকা আগে: বোনের বিয়ের খরচের হিসাব যাই হোক, আমানতের টাকা আগে ফেরত নেওয়া আপনার হক। এটি ফেরত দেওয়া বড় ভাইয়ের উপর ফরজ।

৫. মামলা-মোকদ্দমা: যদি বড় ভাই টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং মধ্যস্থতায় সমাধান না হয়, তবে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জায়েয। ইসলামে জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাওয়া বৈধ।

৭. বাবা-মায়ের ভূমিকা

  • বাবা-মায়ের উচিত ন্যায়বিচার করা এবং কোনো সন্তানের পক্ষ না নিয়ে সত্য কথা বলা।
  • মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:

    "পিতামাতার জন্য সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য করা এবং একজনের হক নষ্ট করা জায়েয নয়। তাদের উচিত সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করা।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩২০)

৮. ভালোবাসা ও টাকার হিসাব

  • ইসলাম ভালোবাসা ও টাকার হিসাব আলাদা রাখতে শেখায়।
  • হযরত উমর (রা.) বলেছেন:

    "ভালোবাসার সম্পর্ক টাকার লেনদেনের দ্বারা নষ্ট করো না।"

  • টাকা দাবি করা ভালোবাসার পরিপন্থী নয়; বরং নিজের হক আদায় করা ইসলামী দায়িত্ব

সংক্ষিপ্ত ফতোয়া:

| বিষয় | বিধান | |-------|-------| | আমানতের টাকা ফেরত | ফরজ — অবশ্যই ফেরত দিতে হবে | | টাকা অস্বীকার করা | হারাম ও কবিরা গুনাহ | | বোনের বিয়ের খরচ | পিতা সামর্থ্যবান হলে পিতার উপর; নতুবা সব সন্তান সামর্থ্য অনুযায়ী ভাগ করবে | | নাবালক অবস্থায় খরচ | ছোট ভাই তখন নাবালক ছিল—তার উপর দায়িত্ব ওয়াজিব নয় | | মেঝো ভাইকে বাদ দেওয়া | জুলুম ও বৈষম্য — জায়েয নয় | | বড় ভাই যা দিবে তাই নেওয়া | জরুরি নয় — নিজের হক আদায় করা বৈধ |


আল্লাহ তাআলা সবাইকে ন্যায়বিচার করার তাওফিক দিন। আমিন।

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করেন আমানত তার প্রাপককে ফেরত দিতে এবং মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়বিচার করতে।" (সূরা আন-নিসা: ৫৮)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.