বড় ভাই ছোট ভাইয়ের টাকা না দিলে করণীয়
Family Life · Hanafi
Question
Answer
টাকা-পয়সা আমানত ও পারিবারিক হিসাব-নিকাশ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
উত্তর:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এর সমাধান নিম্নরূপ:
১. আমানতের বিধান
যে টাকা ছোট ভাই বড় ভাইয়ের কাছে আমানত হিসেবে জমা রেখেছিল, তা ফেরত দেওয়া বড় ভাইয়ের উপর ফরজ (অবশ্যকীয়) । আল্লাহ তাআলা বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দাও।" (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"আমানত আদায় করো সেই ব্যক্তির প্রতি, যে তোমাকে আমানত দিয়েছে।" (আবু দাউদ, তিরমিজি)
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ বলেন:
"আমানতকারী যখন আমানত ফেরত চায়, তখন আমানতদারকের জন্য তা ফেরত দেওয়া ওয়াজিব। বিনা কারণে বিলম্ব করা জায়েয নয়।" (রাদ্দুল মুহতার, ৫/৬৮০)
২. বোনের বিয়ের ঋণ ও খরচের হিসাব
বোনের বিয়ের খরচ বা পারিবারিক ঋণ কে বহন করবে—এ বিষয়ে ইসলামী নিয়ম হলো:
- পিতার উপর সন্তানদের ভরণপোষণ ও বিবাহের খরচ দেওয়া ওয়াজিব যদি পিতা সামর্থ্যবান হন।
- পিতা অসামর্থ্য হলে সন্তানদের মধ্যে সামর্থ্য অনুযায়ী ভাগ করে দেওয়া উচিত।
- কোনো এক সন্তানের উপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া জুলুম এবং ইসলামসম্মত নয়।
ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় আছে:
"পিতার উপর সন্তানের বিবাহের খরচ দেওয়া ওয়াজিব, যদি পিতা সামর্থ্যবান হয়। পিতা অসামর্থ্য হলে সন্তানদের উপর ওয়াজিব হয়—প্রত্যেকে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী অংশগ্রহণ করবে।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৫৫০)
৩. বড় ভাইয়ের দাবি "টাকার হিসাব নাই"—এটা কি জায়েয?
না, এটি সম্পূর্ণ অন্যায় ও জুলুম।
- যে টাকা আমানত হিসেবে জমা রাখা হয়েছে, তা ফেরত দেওয়া ফরজ।
- টাকার অস্তিত্ব অস্বীকার করা বা "হিসাব নাই" বলা মিথ্যা ও গুনাহের কাজ।
- রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি কারো সম্পদ আত্মসাৎ করল, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (বুখারি, মুসলিম)
ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেন:
"আমানতদারকের জন্য আমানত অস্বীকার করা বা আত্মসাৎ করা কবিরা গুনাহ। তাকে অবশ্যই ফেরত দিতে হবে এবং তওবা করতে হবে।" (আল-আসার, ২/৮৫)
৪. ছোট ভাই তখন নাবালক ছিল—এখন কি দায়িত্ব নিতে হবে?
- ছোট ভাই তখন নাবালক (বাচ্চা) ছিল, কাজ করার বয়স হয়নি—এমতাবস্থায় তার উপর বোনের বিয়ের খরচ বহন করা ওয়াজিব নয়।
- বড় ভাই তখন স্বেচ্ছায় খরচ করেছে—এখন তা ফেরত দাবি করা জুলুম।
- ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বলেন:
"যদি কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কারো জন্য খরচ করে, তবে তা দান হিসেবে গণ্য হবে; পরবর্তীতে ফেরত দাবি করা জায়েয নয়।" (আল-আসার, ২/৯০)
৫. মেঝো ভাইকে বাদ দিয়ে শুধু ছোট ভাইকে দায়িত্ব দেওয়া
এটি স্পষ্ট বৈষম্য ও জুলুম। ইসলামে ন্যায়বিচারের নির্দেশ রয়েছে:
"তোমরা ন্যায়বিচার করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।" (সূরা আল-হুজুরাত: ৯)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন:
"পারিবারিক খরচে সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য করা জায়েয নয়। প্রত্যেকে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী অংশগ্রহণ করবে।" (মা'আরিফুল কুরআন, ৪/৪৫০)
৬. করণীয় কী?
আপনার (ছোট ভাইয়ের) করণীয়:
১. বড় ভাইকে শান্তভাবে বলুন: "আমার টাকা আমার আমানত ছিল, ইসলামের বিধান অনুযায়ী তা ফেরত দিন।"
২. বোনের বিয়ের খরচের হিসাব: তিন ভাই ও বাবা মিলে বসে নির্ধারণ করুন—সে সময় কে কত খরচ করেছে এবং কার উপর কত দায়িত্ব ছিল। ন্যায়সঙ্গতভাবে ভাগ করুন।
৩. মধ্যস্থতা: পরিবারের কোনো বিজ্ঞ ব্যক্তি বা স্থানীয় ইমাম/মুফতির মাধ্যমে মীমাংসা করুন।
৪. আমানতের টাকা আগে: বোনের বিয়ের খরচের হিসাব যাই হোক, আমানতের টাকা আগে ফেরত নেওয়া আপনার হক। এটি ফেরত দেওয়া বড় ভাইয়ের উপর ফরজ।
৫. মামলা-মোকদ্দমা: যদি বড় ভাই টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং মধ্যস্থতায় সমাধান না হয়, তবে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জায়েয। ইসলামে জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাওয়া বৈধ।
৭. বাবা-মায়ের ভূমিকা
- বাবা-মায়ের উচিত ন্যায়বিচার করা এবং কোনো সন্তানের পক্ষ না নিয়ে সত্য কথা বলা।
- মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:
"পিতামাতার জন্য সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য করা এবং একজনের হক নষ্ট করা জায়েয নয়। তাদের উচিত সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করা।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩২০)
৮. ভালোবাসা ও টাকার হিসাব
- ইসলাম ভালোবাসা ও টাকার হিসাব আলাদা রাখতে শেখায়।
- হযরত উমর (রা.) বলেছেন:
"ভালোবাসার সম্পর্ক টাকার লেনদেনের দ্বারা নষ্ট করো না।"
- টাকা দাবি করা ভালোবাসার পরিপন্থী নয়; বরং নিজের হক আদায় করা ইসলামী দায়িত্ব।
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া:
| বিষয় | বিধান | |-------|-------| | আমানতের টাকা ফেরত | ফরজ — অবশ্যই ফেরত দিতে হবে | | টাকা অস্বীকার করা | হারাম ও কবিরা গুনাহ | | বোনের বিয়ের খরচ | পিতা সামর্থ্যবান হলে পিতার উপর; নতুবা সব সন্তান সামর্থ্য অনুযায়ী ভাগ করবে | | নাবালক অবস্থায় খরচ | ছোট ভাই তখন নাবালক ছিল—তার উপর দায়িত্ব ওয়াজিব নয় | | মেঝো ভাইকে বাদ দেওয়া | জুলুম ও বৈষম্য — জায়েয নয় | | বড় ভাই যা দিবে তাই নেওয়া | জরুরি নয় — নিজের হক আদায় করা বৈধ |
আল্লাহ তাআলা সবাইকে ন্যায়বিচার করার তাওফিক দিন। আমিন।
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করেন আমানত তার প্রাপককে ফেরত দিতে এবং মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়বিচার করতে।" (সূরা আন-নিসা: ৫৮)