নরম স্বভাব ইসলামের দৃষ্টিতে,দুর্বলতা ও ভীরুতা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি,মন স্ট্রং হওয়ার আমল ও উপায় জানুন।
Family Life · Hanafi
Question
আমার মনে হয় পৃথিবীতে মানুষের সাথে চলা খুব কষ্ট প্রেসার লাগে
আমি নিজের মতো চলতে পছন্দ করি
কারো আন্ডারে চলাল প্রেসার লাগে আমার কথা সহজ কেউ বুঝে না শুধু ভুল বুঝে কারণ আমর বুদ্ধি নাই তাই গুছিয়ে কথা বলতে পারি না ইসলামে এই বিষয়ে কি বেলে
কোনো আমল আছে
মন স্ট্রং হওয়ার
Answer
মন স্ট্রং হওয়ার ইসলামিক দিকনির্দেশনা
প্রশ্ন: আমি স্বভাবগতভাবে খুব সংবেদনশীল ও নরম মনের মানুষ। অল্পতেই কষ্ট পাই, ভয় পাই, ঝগড়া-তর্ক করতে পারি না, নিজের কথা জোর দিয়ে বলতে সংকোচ হয়। ইসলামে এই বিষয়ে কী বলা হয়েছে? মন স্ট্রং হওয়ার কোনো আমল আছে কি?
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার অনুভূতিগুলো খুবই স্বাভাবিক এবং অনেক মানুষেরই এমন স্বভাব থাকে। ইসলাম এই বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। আসুন আমরা কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিষয়টি বুঝার চেষ্টা করি।
১. নরম স্বভাব ইসলামের দৃষ্টিতে
আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নরম স্বভাবের প্রশংসা করে কুরআনে বলেছেন:
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللّهِ لِنتَ لَهُمْ ۖ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لاَنفَضُّواْ مِنْ حَوْلِكَ
"আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য নম্র হয়েছেন। যদি আপনি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।" (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ اللَّهَ رَفِيقٌ يُحِبُّ الرِّفْقَ فِي الأَمْرِ كُلِّهِ»
"নিশ্চয়ই আল্লাহ নম্র এবং তিনি সকল বিষয়ে নম্রতা পছন্দ করেন।" (সহীহ বুখারী: ৬৯২৭)
সুতরাং আপনার নরম স্বভাব কোনো দোষ নয়, বরং এটি একটি প্রশংসনীয় গুণ। তবে এর সাথে সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সমন্বয় প্রয়োজন।
২. দুর্বলতা ও ভীরুতা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলাম ভীরুতা ও দুর্বলতাকে পছন্দ করে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর কাছে ভীরুতা থেকে আশ্রয় চেয়েছেন:
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْجُبْنِ وَالْبُخْلِ»
"হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, ভীরুতা ও কৃপণতা থেকে।" (সহীহ বুখারী: ৬৩৬৯)
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) ফাতহুল বারীতে এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন: "ভীরুতা (জুবন) হলো এমন একটি গুণ যা মানুষকে হক কথা বলতে বাধা দেয় এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে সংকোচ বোধ করায়।"
৩. মন স্ট্রং হওয়ার আমল ও উপায়
ক. আল্লাহর উপর ভরসা (তাওয়াক্কুল)
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
"যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" (সূরা আত-তালাক: ৩)
আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখলে অন্তর শক্তিশালী হয় এবং মানুষের ভয় দূর হয়।
খ. দৈনিক সকাল-সন্ধ্যার যিকির
রাসূলুল্লাহ ﷺ যে দোয়াগুলো সকাল-সন্ধ্যায় পড়তেন, সেগুলো নিয়মিত পড়ুন। বিশেষ করে:
«حَسْبِيَ اللَّهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ»
"আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আমি তাঁর উপরই ভরসা করেছি এবং তিনি মহান আরশের রব।" (সুনানে আবু দাউদ: ৫০৮১)
যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় এই দোয়াটি ৭ বার পড়ে, আল্লাহ তার সকল চিন্তা-দুশ্চিন্তা দূর করে দেন। (মুসনাদ আহমাদ)
গ. নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الْخَاشِعِينَ
"তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর।" (সূরা আল-বাকারাহ: ৪৫)
নিয়মিত নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত অন্তরকে প্রশান্তি দেয় এবং মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করে।
ঘ. দরুদ শরীফ বেশি পড়া
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا»
"যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন।" (সহীহ মুসলিম: ৪০৮)
দরুদ শরীফ বেশি পড়লে অন্তর প্রশান্ত হয় এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।
ঙ. দোয়া করা
رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي
"হে আমার রব! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজ সহজ করে দিন।" (সূরা ত্বাহা: ২৫-২৬)
এই দোয়াটি নিয়মিত পড়ুন। এটি অন্তরের সংকীর্ণতা দূর করে এবং কথা বলার সাহস বৃদ্ধি করে।
৪. আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির ইসলামিক উপায়
ক. নিজের পরিচয় মনে রাখা
আপনি আল্লাহর সম্মানিত সৃষ্টি। আল্লাহ বলেছেন:
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ
"নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি।" (সূরা বনী ইসরাইল: ৭০)
খ. হক কথা বলার সাহস
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«سَيِّدُ الشُّهَدَاءِ حَمْزَةُ بْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ، وَرَجُلٌ قَامَ إِلَى إِمَامٍ جَائِرٍ فَأَمَرَهُ وَنَهَاهُ فَقَتَلَهُ»
"সৈয়দুশ শুহাদা (শহীদদের নেতা) হলেন হামযা (রা.) এবং সেই ব্যক্তি যে জালিম শাসকের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে এবং এর জন্য নিহত হয়।" (মুস্তাদরাকে হাকিম: ৫১৩৬)
গ. ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করা
একদিনেই সব পরিবর্তন সম্ভব নয়। ছোট ছোট পদক্ষেপ নিন:
- প্রথমে পরিবারের সদস্যদের সাথে নিজের মতামত প্রকাশ করুন
- তারপর বন্ধুদের সাথে
- ধীরে ধীরে সাহস বাড়বে
৫. গুরুত্বপূর্ণ নসীহত
১. নিজেকে দোষারোপ করবেন না: আপনার নরম স্বভাব আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ গুণ। অনেক মানুষ এই গুণের অভাবে অন্যের কষ্ট দেয়। আপনি সেই দোষ থেকে মুক্ত।
২. আত্মবিশ্বাস বাড়ান: আপনি যে "বুদ্ধি নেই" বলে মনে করেন, এটি ভুল ধারণা। প্রতিটি মানুষের আলাদা আলাদা গুণ রয়েছে। আপনার মধ্যে সহানুভূতি ও সংবেদনশীলতার মতো মহান গুণ রয়েছে।
৩. ইলম অর্জন করুন: জ্ঞান অর্জন করলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ»
"জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজ।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৪)
৪. ভালো সঙ্গী নির্বাচন করুন: যারা আপনাকে বুঝবে এবং উৎসাহ দেবে এমন বন্ধু নির্বাচন করুন।
৫. ধৈর্য ধরুন: আল্লাহ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১৫৩)
৬. একটি বিশেষ দোয়া
রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত:
«اللَّهُمَّ لَا سَهْلَ إِلَّا مَا جَعَلْتَهُ سَهْلًا، وَأَنْتَ تَجْعَلُ الْحَزْنَ إِذَا شِئْتَ سَهْلًا»
"হে আল্লাহ! আপনি যা সহজ করেন তা ছাড়া কোনো কিছুই সহজ নয়। আর আপনি চাইলে কঠিন বিষয়কেও সহজ করে দেন।" (সহীহ ইবনে হিব্বান: ৯৭৪)
সারসংক্ষেপ
১. আপনার নরম স্বভাব ইসলামে প্রশংসনীয়, তবে এর সাথে দৃঢ়তা অর্জন করতে হবে ২. নিয়মিত নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির ও দরুদ পড়ুন ৩. আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখুন ৪. ধীরে ধীরে নিজের মতামত প্রকাশের চেষ্টা করুন ৫. নিজেকে দোষারোপ করা বন্ধ করুন ৬. ভালো সঙ্গী নির্বাচন করুন ৭. ধৈর্য ধরুন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকুন
আল্লাহ তাআলা আপনাকে মনোবল ও সাহস দান করুন এবং আপনার সকল দুশ্চিন্তা দূর করুন। আমিন।
সূত্র:
- সূরা আলে ইমরান: ১৫৯
- সূরা আত-তালাক: ৩
- সূরা আল-বাকারাহ: ৪৫
- সহীহ বুখারী: ৬৯২৭, ৬৩৬৯
- সহীহ মুসলিম: ৪০৮
- সুনানে আবু দাউদ: ৫০৮১
- সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৪
- ফাতহুল বারী (ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী)