কষ্টদায়ক মানুষদের সাথে সম্পর্ক রাখার বিধান কি?

Family Life · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 4130
Questioner: Syeda Fatima Banu
Question Asked: 18 Aug 2026, 04:52 PM
Reviewed & Published: 18 Aug 2026, 05:44 PM
Views: 11
Tokens: 8,550
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, মুহতারাম উস্তায।
আমার একটি পারিবারিক বিষয়ে শরীয়তের নির্দেশনা জানার প্রয়োজন ছিল।
আমার শ্বশুরবাড়ির কিছু নিকটাত্মীয় নিয়মিত আমার এবং আমার পরিবার সম্পর্কে অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও আপত্তিকর কথাবার্তা বলেন। এমনকি তারা আমার সন্তানদের প্রতি চরম ঘৃণা প্রকাশ করেন এবং আমার স্বামীর মারাত্মক অনিষ্ট বা ক্ষতির বদদোয়া পর্যন্ত দিয়ে থাকেন। আমার সেবাযত্ন বা ভালো ব্যবহারকেও তারা পরবর্তীতে বিকৃত ও নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেন।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, আমার স্বামীর কাছে বা গোপনে এমন কটূক্তি করার পর তারা আবার প্রকাশ্যে আমার সাথে স্বাভাবিক ও ভালো আচরণ করার চেষ্টা করেন। অতীতে এমন আচরণের পর তারা কখনো কখনো মুখে ক্ষমাও চেয়েছেন, কিন্তু পরবর্তীতে আবারও একই কর্মের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছেন।
এই ধারাবাহিক তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে আমি মুখে তাদেরকে ক্ষমা বলে দিলেও, মন থেকে আর কোনোভাবেই তাদের সাথে আন্তরিক বা স্বাভাবিক যোগাযোগ রক্ষা করতে পারছি না। আমার প্রশ্নগুলো হলো:
১. এ ধরনের বিষাক্ত আচরণ ও মানসিক নির্যাতনের প্রেক্ষিতে আমি যদি তাদের মন থেকে ক্ষমা করতে না পারি, তবে কি আমি শরীয়তের দৃষ্টিতে গুনাহগার হবো?
২. আত্মরক্ষা ও পরিবারের মানসিক সুস্থতার স্বার্থে আমি যদি তাদের সাথে যোগাযোগ ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসি বা তাদের সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলি, তবে তা কি 'ক্বাতয়ে রেহমি' বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার কবিরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত হবে?
৩. এমন দ্বিমুখী আত্মীয়দের ক্ষেত্রে শরীয়তের সীমারেখা রক্ষা করে একজন নারীর ঠিক কী ধরনের আচরণ করা উচিত?
৪. তাদের এমন সব আচরণের কারনে আমি প্রায় সময়ে মানসিক অশান্তিতে থাকি, আমি এই অশান্তি থেকে মুক্তির জন্য কী আমল করবো?
উক্ত বিষয়ে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে বাধিত করবেন।

Answer

উত্তর

ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার পারিবারিক পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন এবং মানসিকভাবে যন্ত্রণাদায়ক। আমি কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে এবং সালাফে সালেহীনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিচ্ছি।


১. ক্ষমা করতে না পারলে কি গুনাহগার হবো?

উত্তর: আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا ۗ أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ "তারা যেন ক্ষমা করে এবং মার্জনা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন? আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আন-নূর: ২২)

ক্ষমা করা একটি মহৎ গুণ এবং আল্লাহ তা'আলা ক্ষমাশীলদের ভালোবাসেন। তবে ক্ষমা করা ওয়াজিব নয়—এটি মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) এবং উচ্চ মর্যাদার কাজ। যদি কেউ মানসিকভাবে ক্ষমা করতে না পারে, তবে সে গুনাহগার হবে না, ইনশাআল্লাহ। তবে চেষ্টা করা উচিত ক্ষমা করার।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "ক্ষমা করা মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়। তবে যে ক্ষমা করে, তার জন্য আল্লাহর নিকট মহা প্রতিদান রয়েছে।"

আপনি যদি মুখে ক্ষমা করে দেন কিন্তু মনে কষ্ট থাকে, তবে এতে আপনি গুনাহগার হবেন না, কারণ এটি মানবীয় স্বাভাবিক বিষয়। তবে দোয়া করুন আল্লাহ যেন আপনার অন্তর থেকে এই কষ্ট দূর করে দেন এবং আপনাকে ক্ষমা করার তাওফীক দেন।


২. যোগাযোগ কমিয়ে দিলে বা এড়িয়ে চললে কি 'ক্বাতয়ে রেহমি' হবে?

উত্তর: আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা (ক্বাতয়ে রেহমি) একটি কবিরা গুনাহ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعٌ "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (সহীহ বুখারী: ৫৯৮৪, সহীহ মুসলিম: ২৫৫৬)

তবে শরীয়তে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার অর্থ এই নয় যে, ক্ষতিকারক আত্মীয়দের সাথে সর্বদা মেলামেশা করতে হবে বা তাদের অনিষ্ট সহ্য করতে হবে। ইসলাম কখনোই ক্ষতিকারক সম্পর্ক বজায় রাখতে বাধ্য করে না।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "যদি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে ধর্মীয় বা পার্থিব ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েয, বরং কখনো কখনো ওয়াজিবও হতে পারে।"

আপনি যদি তাদের সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন না করে ন্যূনতম পর্যায়ে যোগাযোগ রাখেন—যেমন: ঈদে, অসুস্থতায়, বা প্রয়োজনীয় বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া—তাহলে এটি ক্বাতয়ে রেহমি হবে না। বরং এটি একটি বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।

শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন: "আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা মানে এই নয় যে, ক্ষতিকারক আত্মীয়দের সাথে সর্বদা মেলামেশা করতে হবে। বরং সম্পর্ক রক্ষা করা হলো তাদের খোঁজখবর নেওয়া, প্রয়োজনে সাহায্য করা এবং তাদের প্রতি সদয় হওয়া—যদিও তা দূর থেকে হয়।"

তবে যদি তারা আপনার এবং আপনার পরিবারের জন্য গুরুতর ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে আপনি তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে পারেন। এটি জায়েয, বিশেষ করে যখন তারা আপনার সন্তানদের ক্ষতি করে বা আপনার স্বামীর বদদোয়া করে।


৩. দ্বিমুখী আত্মীয়দের ক্ষেত্রে নারীর কী আচরণ করা উচিত?

উত্তর: শরীয়তের আলোকে আপনার আচরণ নিম্নরূপ হওয়া উচিত:

ক. সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করা:

যদি সম্ভব হয়, তবে সম্পর্কের বন্ধন একেবারে ছিন্ন করবেন না। তবে ন্যূনতম পর্যায়ে যোগাযোগ রাখুন—যেমন: প্রয়োজনে ফোন করা, ঈদের শুভেচ্ছা জানানো ইত্যাদি।

খ. সীমারেখা নির্ধারণ করা:

আপনার স্বামীর সাথে আলোচনা করে স্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করুন—কী গ্রহণযোগ্য এবং কী নয়। যদি তারা সীমা অতিক্রম করে, তবে বিনয়ের সাথে জানিয়ে দিন যে, এই ধরনের আচরণ আপনি সহ্য করবেন না।

গ. নিজের পরিবারকে প্রাধান্য দেওয়া:

আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا "হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করো জাহান্নামের আগুন থেকে।" (সূরা আত-তাহরীম: ৬)

আপনার প্রথম দায়িত্ব আপনার নিজের পরিবার এবং সন্তানদের মানসিক ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যদি তাদের উপস্থিতি আপনার পরিবারের জন্য ক্ষতিকর হয়, তবে দূরত্ব বজায় রাখা জায়েয।

ঘ. উত্তম আচরণ বজায় রাখা:

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

لَيْسَ الْوَاصِلُ بِالْمُكَافِئِ، وَلَكِنِ الْوَاصِلُ الَّذِي إِذَا قُطِعَتْ رَحِمُهُ وَصَلَهَا "সে-ই প্রকৃত আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী নয় যে প্রতিদান দেয়, বরং সে-ই প্রকৃত সম্পর্ক রক্ষাকারী যে সম্পর্ক ছিন্ন করা সত্ত্বেও তা পুনরায় স্থাপন করে।" (সহীহ বুখারী: ৫৯৯১)

আপনি যদি তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করেন এবং তারা মন্দ ব্যবহার করে, তবে আপনি সাওয়াব পাবেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আপনাকে নিজের ক্ষতি সহ্য করতে হবে।

ঙ. স্বামীর সাথে পরামর্শ:

আপনার স্বামীকে বিষয়টি জানান এবং তার সাথে পরামর্শ করুন। স্বামী যদি আপনাকে সমর্থন করেন, তবে এটি আপনার জন্য সহায়ক হবে। যদি স্বামী না-ও বোঝেন, তবে ধৈর্য ধরে দোয়া করুন।


৪. মানসিক অশান্তি থেকে মুক্তির জন্য কী আমল করবো?

উত্তর: মানসিক অশান্তি থেকে মুক্তির জন্য নিম্নলিখিত আমলগুলো করুন:

ক. ধৈর্য ও তাকওয়া অবলম্বন:

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)

খ. দোয়া ও যিকির:

  • সকাল-সন্ধ্যার যিকির নিয়মিত পড়ুন।
  • দোয়া: "হে আল্লাহ! আমার জন্য আমার দ্বীন, আমার দুনিয়া, আমার পরিবার এবং আমার সম্পদের ব্যাপারে কল্যাণ দিন।"
  • সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (আমানার রাসূলু) প্রতি রাতে পড়ুন।

গ. সালাত ও কুরআন তিলাওয়াত:

সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করুন। আল্লাহ বলেন:

وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ "তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।" (সূরা আল-বাকারাহ: ৪৫)

ঘ. তাওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর ভরসা):

আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখুন। তিনি বলেন:

وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ "যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" (সূরা আত-তালাক: ৩)

ঙ. ক্ষমার চেষ্টা:

যদিও ক্ষমা করা কঠিন, তবে চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, ক্ষমা করলে আপনি মানসিকভাবে মুক্তি পাবেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

مَا زَادَ اللَّهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ إِلَّا عِزًّا "যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।" (সহীহ মুসলিম: ২৫৮৮)

চ. পরিবারের সাথে সময় কাটানো:

আপনার সন্তান এবং স্বামীর সাথে মানসম্মত সময় কাটান। এটি আপনার মানসিক প্রশান্তি আনবে।

ছ. দুশ্চিন্তা দূর করার দোয়া:

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) শিখিয়েছেন:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ "হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণের ভার ও মানুষের দমন-পীড়ন থেকে।" (সহীহ বুখারী: ২৮৯৩)


সংক্ষিপ্ত উপসংহার:

১. ক্ষমা করতে না পারলে আপনি গুনাহগার হবেন না, তবে ক্ষমা করার চেষ্টা করুন—এতে আপনারই কল্যাণ।

২. ক্ষতিকারক আত্মীয়দের সাথে ন্যূনতম যোগাযোগ রাখা বা দূরত্ব বজায় রাখা জায়েয, যদি তা আত্মরক্ষার জন্য হয়। তবে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন না করাই উত্তম।

৩. আপনার প্রথম দায়িত্ব আপনার নিজের পরিবার ও সন্তানদের নিরাপত্তা। প্রয়োজনে দূরত্ব বজায় রাখুন, তবে উত্তম আচরণ বজায় রাখুন।

৪. ধৈর্য, দোয়া, যিকির এবং আল্লাহর উপর ভরসার মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি অর্জন করুন।

আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও সাহস দিন এবং আপনার অবস্থার উন্নতি করুন। আমীন।

وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.