বোনের চিকিৎসায় সহযোগিতা করার জন্য ফুফুর বাসায় অবস্থান করে টিউশনি করা, ফুফুর বাসায় পর্দা রক্ষা অসম্ভব পর্যায়ের হলে করণীয় কি?
Family Life · Hanafi
Question
আমি মা-বাবার সঙ্গে গ্রামে থাকি। আমার বড় বোন ঢাকায় ফুফির বাসায় থেকে টিউশনি করতেন। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁর অপারেশন করতে হয়েছে। বর্তমানে তাঁর চিকিৎসার খরচ মেটাতে তাঁর টিউশনিগুলো চালিয়ে যাওয়া খুবই জরুরি। তাই বোনের অনুরোধে এবং তাঁর চিকিৎসার খরচে সহযোগিতা করার উদ্দেশ্যেই আমি গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছি, যেন তাঁর টিউশনিগুলো আমি করাতে পারি।
কিন্তু বর্তমানে ফুফির বাসায় থাকার কারণে এখানে ফুফাতো ভাই, ফুফা ও অন্যান্য পুরুষ সদস্যদের সামনে আমাকে চলাফেরা করতে হচ্ছে। এতে আমার জন্য যথাযথভাবে পর্দা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিষয়টি নিয়ে আমি মানসিকভাবেও অস্বস্তিতে আছি। আমি চাই, বোনের এই কঠিন সময়ে তাঁর পাশে দাঁড়াতে এবং তাঁর চিকিৎসার জন্য যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করতে। একই সঙ্গে আমি আমার পর্দা ও দ্বীনি দায়িত্বের ব্যাপারেও অবহেলা করতে চাই না।আমার এখন কি করণীয়?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার বোনের চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা করার মানসিকতা অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং সওয়াবের কাজ। তবে মনে রাখতে হবে, ইসলামে পর্দা রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিম নারীর জন্য ফরজ। পর্দা রক্ষা করে দ্বীনদারিতা বজায় রাখা যেকোনো পার্থিব কাজের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো এবং জাহেলিয়াত যুগের মতো সাজসজ্জা প্রদর্শন করে বের হয়ো না।" (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)
আপনার করণীয়:
১. পর্দার বিকল্প ব্যবস্থা করুন: আপনি যদি ফুফির বাসায় অবস্থান করেন এবং সেখানে পুরুষ সদস্যদের সামনে চলাচল করতে হয়, তাহলে প্রথম চেষ্টা করুন এমন একটি ঘরে অবস্থান করার যেখানে পুরুষদের প্রবেশাধিকার নেই। নিজের ঘরে থাকা অবস্থায় দরজা বন্ধ রাখুন এবং প্রয়োজন ছাড়া বের হবেন না। বের হওয়ার সময় অবশ্যই পূর্ণ পর্দা (বোরকা/নিকাব) পরিধান করুন। ফুফাতো ভাই, ফুফা প্রভৃতি গায়রে মাহরাম — তাদের সামনে পর্দা করা ফরজ। (সূরা আন-নূর: ৩১, রদ্দুল মুহতার ৬/৩৭০)
২. টিউশনি করানোর বিকল্প উপায়:
- টিউশনি করানোর জন্য শিক্ষার্থীদের আপনার কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন, তবে এমন জায়গায় যেখানে পুরুষদের দেখা যায় না। যেমন: পর্দার আড়াল থেকে বা দরজার ওপাশ থেকে পড়ানো।
- সম্ভব হলে অনলাইনে (ভিডিও কলে) টিউশনি করাতে পারেন, যেখানে ছাত্র/ছাত্রীর সাথে সরাসরি দেখা না-ও লাগতে পারে। তবে খেয়াল রাখবেন, ভিডিও কলে পুরুষ শিক্ষার্থী হলে সেটিও পর্দার বিধানের আওতায় আসে। তাই চেষ্টা করুন শুধুমাত্র ছাত্রীদের টিউশনি করানোর।
- বোনের টিউশনিগুলোর মধ্যে যদি ছাত্রী থাকে, তাহলে সেগুলো করান। আর ছাত্র থাকলে সেগুলো অন্য কোনো মাহরাম বা নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির মাধ্যমে করানোর ব্যবস্থা করুন।
৩. ফুফির বাসায় অবস্থান না করে বিকল্প আবাসন: যদি ফুফির বাসায় পর্দা রক্ষা করা সত্যিই অসম্ভব হয়ে পড়ে, তাহলে বোনের চিকিৎসার খরচে সহযোগিতা করার জন্য আপনি গ্রামে থেকেও চেষ্টা করতে পারেন। যেমন:
- বোনের টিউশনিগুলো অনলাইনে করানো।
- বোনের চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহ করা বা অন্য কোনোভাবে সহায়তা করা।
- প্রয়োজনে বোনকে গ্রামে নিয়ে এসে চিকিৎসা করানো, যেখানে আপনি পর্দার সাথে থাকতে পারবেন।
৪. দ্বীনের বিধান লঙ্ঘন করে কোনো কাজ করবেন না: আল্লাহ তাআলার বিধান লঙ্ঘন করে কোনো উপকার লাভ করা বরকতহীন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতার মাধ্যমে কোনো কাজ করে, আল্লাহ তাকে তার প্রত্যাশিত ফল থেকে বঞ্চিত করেন।" (মুসনাদ আহমাদ: ২/২১৪) তাই পর্দা ভঙ্গ করে টিউশনি করানো আপনার জন্য বৈধ হবে না, এমনকি বোনের চিকিৎসার জন্যও।
৫. ফাতাওয়ায় উল্লেখিত নীতি: হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে স্পষ্ট বলা হয়েছে, নারীর জন্য গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে পর্দা করা ফরজ এবং এতে কোনো শিথিলতার সুযোগ নেই। (ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/৩২৯, রদ্দুল মুহতার ৬/৩৭০) প্রয়োজনের সময়ও পর্দার মৌলিক বিধান লঙ্ঘন করা জায়েজ নয়, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী ন্যূনতম পরিমাণ প্রকাশ করা যেতে পারে, কিন্তু চলাফেরা ও দেখা-সাক্ষাতের ক্ষেত্রে নয়।
সিদ্ধান্ত: আপনি যদি ফুফির বাসায় থেকে পর্দা রক্ষা করা সম্ভব মনে না করেন, তাহলে সেখানে অবস্থান করা আপনার জন্য জায়েজ নয়। বোনের প্রতি সহানুভূতি দেখানো ভালো, তবে আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করে নয়। বোনকে জানান যে, আপনি তার জন্য দোয়া করবেন এবং যতটুকু সম্ভব অন্য উপায়ে সহযোগিতা করবেন। প্রয়োজনে বোনের চিকিৎসার জন্য গ্রামে থেকেই অর্থ সংগ্রহ বা অনলাইনে টিউশনি করানোর চেষ্টা করুন। আল্লাহ তায়ালা আপনার নিয়তের বিনিময় দেবেন এবং আপনার বোনকে সুস্থতা দান করবেন, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।