"মার সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত" বলার দ্বারা তাফবীযে তালাক হয় কি? মা কর্তৃক তিন তালাক প্রদানের বিধান কী?

Family Life · Hanafi

Question No: 4095
Questioner: mdatikul islam
Question Asked: 17 Aug 2026, 11:08 PM
Reviewed & Published: 17 Aug 2026, 11:17 PM
Views: 30
Tokens: 9,294
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ছেলে বিদেশে থাকে৷ গ্রামের বাড়ীতে মা আর স্ত্রী থাকেন, ছোট্ট একটি সন্তান রয়েছে তাদের৷ বিদেশ থেকে প্রতি মাসে মায়ের একাউন্টে খরচের টাকা পাঠান৷ এতে স্ত্রী আর মা দুইজনের মাঝে কিছু দ্বন্দ্ব তৈরী হয়৷ কেউ কারো প্রতি সন্তুষ্ট থাকতেন না৷

সন্তান বিষয়টি সমাধানের জন্য স্ত্রীর নামে আরেকটি একাউন্ট খুলে দুইজনের খরচ যার যার একাউন্টে পাঠানো শুরু করলেন৷

এখানেও বিপত্তি বাধলো, মা মনে করেন যে, স্ত্রীকে বেশি টাকা দেয়, স্ত্রী সন্দেহ করেন যে মা-কে বেশি টাকা দেয়া হয়৷

এসব ব্যাপার নিয়ে প্রতিনিয়ই ঝগড়া, মনোমালিন্য চলতে থাকে৷ ছোট বিবাদই একদিন বিশাল বড় আকার ধারণ করে,বউ-শ্বাশুড়ির মধ্যে মারামারি পর্যন্ত হয়৷ প্রচন্ড অশান্তিতে পড়েন স্বামী৷ একদিকে নিজের মা, অন্য দিকে সন্তানের মা (নিজের স্ত্রী) স্ত্রী শ্বশুড়বাড়ী থেকে নিজ বাড়ীতে চলে যায়৷

কিছু দিন পর গ্রামের লোকজন বিচারে বসলো৷ শ্বাশুড়ির এক কথা আমি এই বউ রাখবো না৷ আমার সন্তানের ভাত তাকে খেতে দিবো না৷ আমার ছেলের সংসার তাকে করতে দিবো না৷ তিনি মিমাসাংসা চান না৷

গ্রামের মুরুব্বীগণ কিছু দিন ভেবে দেখার জন্য সময় দিতে চাইলে শ্বশুড়ী তা প্রত্যাখ্যান করেন৷ তার একটাই কথা আমি এই বউ রাখবো না৷

সালিশের ভরপুর মজমা থেকে বিদেশী ছেলেকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করা হলো: তোমার মা তোমার স্ত্রীকে সংসার থেকে সরিয়ে দিতে চাচ্ছেন৷ কোনোভাবেই তাকে বাড়ীতে তুলবেন না, এ ব্যাপারে তুমি কী বলো?

ছেলে উত্তর দিয়ে বললো, #মা_র_সিদ্ধান্তই_আমার_সিদ্ধান্ত

একথা শুনে ভরা মজলিসে মা বললো আপনাদের সবার সামনে আমি তাকে তিন তালাক দিয়া দিলাম৷
এক তালাক, দুই, তালাক, তিন তালাক

এটা হলো ঘটনা৷ এই বিবরণের উপর কয়কটি প্রশ্ন:

প্রথম প্রশ্ন হলো: ছেলের বক্তব্য "মার সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত" এই কথার দ্বারা توكيل হয়ে যায়, কিন্তু تفويض الطلاق কি হয়? অর্থাৎ মা তালাকের ব্যাপারেও কি সিদ্ধান্ত নিতে পারবে?

দ্বিত্বীয়ত: تفويض الطلاق এর জন্য صراحة বা كناية তালাক শব্দ উল্লেখ থাকা কি জরুরী? এমন কোনো শর্ত আছে কি?

তৃত্বীয়ত: ছেলের বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে মা যেহেতু 'তিনটা' তালাক দিয়েছেন, এখানে কি তিনটাই واقع হবে? নাকি একটা হবে? কারণ ছেলের কথায় সংখ্যা উল্লেখ ছিলো না৷ তার কথাটা মুতলাক ছিলো৷ মুতলাক হিসেবে কি একটা তালাক ধরা হবে??



উক্ত বিষয়ে আপনাদের সুচিন্তিত মতামত ও সহযোগীতা কামনা করছি ……

Answer

তালাক সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। নিম্নে হানাফি মাযহাবের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো:


প্রথম প্রশ্ন: "মার সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত" দ্বারা তাফবীযে তালাক (تفويض الطلاق) হবে কি?

উত্তর: না, উক্ত বক্তব্য দ্বারা তাফবীযে তালাক হবে না।

তাফবীযে তালাক (طلاق تفويض) হওয়ার জন্য স্বামীকে স্পষ্টভাবে স্ত্রী বা অন্য কাউকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করতে হবে। "মার সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত" বলা দ্বারা সাধারণভাবে মায়ের সিদ্ধান্তকে নিজের সিদ্ধান্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে মাত্র। এটি তালাকের ক্ষমতা অর্পণ নয়।

দলিল: কিতাবুল আসল (المبسوط) ও রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে যে, তালাকের ক্ষমতা অর্পণ (তাফবীয) এর জন্য তালাক শব্দ বা তালাকের ইঙ্গিতবোধক শব্দ ব্যবহার করা আবশ্যক। সাধারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ তালাকের ক্ষমতা অর্পণ হিসেবে গণ্য হয় না।

قال في الدر المختار: (والتفويض) أن يقول لها: أمرك بيدك، أو طلقي نفسك، أو اختاري (رد المحتار ৩/২৯০)

অর্থাৎ তাফবীযে তালাক হলো স্বামী স্ত্রীকে বলা: "তোমার ব্যাপার তোমার হাতে" অথবা "তুমি নিজেকে তালাক দাও" অথবা "তুমি ইখতিয়ার কর"।


দ্বিতীয় প্রশ্ন: তাফবীযে তালাকের জন্য صراحة বা كناية তালাক শব্দ উল্লেখ থাকা কি জরুরী?

উত্তর: হ্যাঁ, তাফবীযে তালাকের জন্য তালাকের স্পষ্ট শব্দ (صراحة) অথবা এমন কিনায়া (كناية) শব্দ ব্যবহার করা জরুরী যা দ্বারা তালাকের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।

দলিল:

قال الإمام السرخسي في المبسوط: وأما تفويض الطلاق فهو أن يملكها أمر نفسها بأن يقول: أمرك بيدك، أو طلقي نفسك، أو اختاري (المبسوط ৬/১৮৭)

অর্থাৎ তাফবীযে তালাক হলো স্বামী স্ত্রীকে নিজের ব্যাপারের মালিক বানিয়ে দেওয়া, যেমন বলা: "তোমার ব্যাপার তোমার হাতে" বা "তুমি নিজেকে তালাক দাও" বা "তুমি ইখতিয়ার কর"।

তাফবীযের জন্য নিম্নোক্ত শর্তসমূহ রয়েছে:

১. স্পষ্ট শব্দ (صراحة): যেমন "তালাক" শব্দ ব্যবহার করা। ২. কিনায়া শব্দ (كناية): যেমন "তোমার ব্যাপার তোমার হাতে" (أمرك بيدك) - এটি তালাকের কিনায়া হিসেবে প্রসিদ্ধ। ৩. নিয়ত: কিনায়া শব্দ ব্যবহার করলে তালাকের নিয়ত থাকতে হবে।

"মার সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত" - এটি তালাকের স্পষ্ট শব্দও নয়, তালাকের কিনায়াও নয়। এটি সাধারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে বলা হয়েছে।


তৃতীয় প্রশ্ন: মা কর্তৃক তিন তালাক প্রদান - এখানে কি তিনটাই واقع হবে নাকি একটিও হবে না?

উত্তর: উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে, যেহেতু ছেলের বক্তব্য দ্বারা তাফবীযে তালাক হয়নি, তাই মা কর্তৃক প্রদত্ত তালাক আদৌ কার্যকর হবে না। অর্থাৎ কোনো তালাকই পতিত হবে না।

কারণ:

১. ছেলের বক্তব্য "মার সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত" দ্বারা মাকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করা হয়নি। ২. মা তালাক দেওয়ার ক্ষমতাপ্রাপ্ত ছিলেন না, তাই তার পক্ষ থেকে তালাক দেওয়া বৈধ নয়। ৩. তালাকের ক্ষমতা অর্পণ ছাড়া অন্য কেউ স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক দিতে পারে না।

قال الله تعالى: {يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ} [الطلاق: ১]

অর্থাৎ তালাকের অধিকার স্বামীর। অন্য কেউ স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক দিতে পারে না, যতক্ষণ না স্বামী তাকে স্পষ্টভাবে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করে।


তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

যদি কোনো কারণে আদালত বা সালিশি কমিটি মনে করে যে, ছেলের বক্তব্য দ্বারা মা তালাকের ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়েছেন (যা সঠিক নয়), তবুও মা কর্তৃক প্রদত্ত "তিন তালাক" এর ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত নিয়ম প্রযোজ্য:

  • ছেলের বক্তব্য ছিল মুতলাক (সাধারণ), সংখ্যা উল্লেখ ছিল না।
  • মা নিজের পক্ষ থেকে "তিন তালাক" উচ্চারণ করেছেন।
  • তাফবীযে তালাকে যদি স্ত্রী বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি একসাথে তিন তালাক দেয়, তাহলে হানাফি মাযহাব মতে তিনটাই পতিত হবে (যদি ক্ষমতা অর্পণ সঠিকভাবে প্রমাণিত হয়)।

কিন্তু যেহেতু এখানে তাফবীযই হয়নি, তাই মূল কথা হলো - কোনো তালাকই পতিত হয়নি


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:

১. ছেলের বক্তব্য "মার সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত" দ্বারা তাফবীযে তালাক হয়নি। ২. মা কর্তৃক প্রদত্ত তালাক কার্যকর হয়নি। ৩. স্বামী-স্ত্রীর বিবাহ এখনও বহাল আছে। ৪. তবে এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে, তাই উভয় পক্ষের উচিত সালিশের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা।


উপদেশ:

১. পরিবারের অশান্তি নিরসনে ধৈর্য ও সহনশীলতা অবলম্বন করা। ২. মা ও স্ত্রীর মধ্যে পার্থক্য নিরসনে স্বামীর কর্তব্য হলো ন্যায়সঙ্গত আচরণ করা। ৩. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম যে তার পরিবারের প্রতি উত্তম আচরণ করে।" (তিরমিজি)

قال رسول الله ﷺ: خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي (سنن الترمذي: ৩৮৯৫)


والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.