সম্পর্ক বজায় রাখা
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা প্রসঙ্গে ইসলামী নির্দেশনা
প্রশ্নের উত্তর
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আসুন আমরা কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।
আত্মীয়তার সম্পর্ক (সিলাতুর রাহিম) এর গুরুত্ব
ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন ও হাদিসে এর উপর ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে চাও এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক।" (সূরা আন-নিসা: ১)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে আল্লাহ ও শেষ দিনের উপর, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।" (সহিহ বুখারী: ৬১৩৮)
এই প্রসঙ্গে শরয়ী বিধান
১. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার অর্থ
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা বলতে সাধারণত সম্পূর্ণভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করা বুঝায়—যেমন কথা বলা বন্ধ করে দেওয়া, খোঁজখবর না নেওয়া, প্রয়োজনে সাহায্য না করা ইত্যাদি। তবে কিছু ক্ষেত্রে সম্পর্ক বজায় রাখার পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে।
২. ক্ষতিকর সম্পর্ক থেকে দূরত্ব বজায় রাখা
ইসলামে এমন সম্পর্ক বজায় রাখা উচিত নয় যা কারো জন্য ক্ষতির কারণ হয়। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার এ উল্লেখ করেছেন যে, যদি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার কারণে কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে সে ক্ষেত্রে দূরত্ব বজায় রাখা জায়েয।
হাদিসে এসেছে:
"কোনো ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিশোধও নেওয়া যাবে না।" (ইবনে মাজাহ: ২৩৪১)
৩. সম্পর্ক বজায় রাখার বিকল্প পদ্ধতি
আপনার ভাই যদি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন এবং নানির পরিবারের সাথে কথা বলা তার জন্য কষ্টকর হয়, তবে তিনি সরাসরি কথা না বলে অন্যান্য মাধ্যমে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন:
- মাঝে মাঝে খোঁজখবর নেওয়া
- প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদান করা
- মেয়ের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সম্পর্ক বজায় রাখা
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (সহিহ বুখারী: ৫৯৮৪)
তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, যদি আত্মীয়রা ক্ষতিকর হয় এবং তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা ধর্মীয় বা পার্থিব ক্ষতির কারণ হয়, তবে সে ক্ষেত্রে ন্যূনতম সম্পর্ক বজায় রাখা যথেষ্ট।
এই বিশেষ ক্ষেত্রে নির্দেশনা
আপনার ভাইয়ের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত:
১. মেয়ের স্বার্থ
৪ বছরের মেয়েটির জন্য তার নানি-নানা ও মামা-খালাদের সাথে সম্পর্ক রাখা মানসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি তার জন্য ক্ষতিকর নয় বরং উপকারী হতে পারে।
২. ভাইয়ের মানসিক অবস্থা
আপনার ভাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, তাই তিনি সরাসরি কথা না বললেও মেয়ের মাধ্যমে বা অন্য কোনো মাধ্যমে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন।
৩. সম্পর্ক ছিন্ন না করা
সম্পূর্ণভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করা উচিত নয়। তবে সীমিত পরিসরে সম্পর্ক রাখা যেতে পারে—যেমন:
- মাসে একবার বা দুইবার খোঁজখবর নেওয়া
- মেয়েকে নানির বাড়িতে পাঠানো (যদি নিরাপদ মনে হয়)
- ফোনে সংক্ষিপ্ত কথা বলা
ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়ার নির্দেশনা
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) এবং মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) এর ফতোয়ায় উল্লেখ আছে যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ওয়াজিব, তবে যদি সম্পর্ক বজায় রাখার কারণে ধর্মীয় বা পার্থিব ক্ষতি হয়, তবে সে ক্ষেত্রে ন্যূনতম সম্পর্ক বজায় রাখা যথেষ্ট।
মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) উল্লেখ করেছেন যে, সম্পর্ক ছিন্ন করা মানে সম্পূর্ণভাবে সম্পর্ক ত্যাগ করা নয়, বরং সম্পর্ক বজায় রাখার পদ্ধতি পরিবর্তন করা যেতে পারে।
সুপারিশ
১. সম্পূর্ণভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না - এটি গুনাহের কাজ হবে। ২. সীমিত পরিসরে সম্পর্ক রাখুন - যেমন মাসে একবার ফোন করা বা খোঁজ নেওয়া। ৩. মেয়ের মাধ্যমে সম্পর্ক বজায় রাখুন - মেয়েকে নানির বাড়িতে পাঠানো বা ভিডিও কলের ব্যবস্থা করা। ৪. ভাইয়ের জন্য সীমা নির্ধারণ করুন - তিনি সরাসরি কথা না বলে অন্য কোনো মাধ্যমে সম্পর্ক রাখতে পারেন। ৫. পরিস্থিতি উন্নতির পর সম্পর্ক আরও বাড়ানো যেতে পারে - সময়ের সাথে সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে।
উপসংহার
আপনার ভাই যদি সম্পূর্ণভাবে নানির পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন, তবে তা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার শামিল হবে এবং এটি ইসলামী দৃষ্টিতে গুনাহের কাজ। তবে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকায় সীমিত পরিসরে সম্পর্ক রাখতে পারেন। মেয়েটির জন্য নানির পরিবারের সাথে সম্পর্ক রাখা গুরুত্বপূর্ণ, তাই মেয়ের মাধ্যমে সম্পর্ক বজায় রাখা উত্তম পদ্ধতি হতে পারে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন।
"আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তম পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)