মহিলাদের দাওয়াতী কাজ নিয়ে
Faith and Belief · Hanafi
Question
আমি আগে মহিলা তাবলীগের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম, তাদের দলে থাকলে প্রত্যেক সপ্তাহে জেলায় এবং মাসে ১ বার বিভাগে সফর করতে হয়। বিভিন্ন হুজুরের বয়ান শুনে আমি বুঝতে পারছি মেয়েদের জন্য মাহরাম ছাড়া এবং পরিবারের দায়িত্ব অবহেলা করে দূরে সফরে যাওয়া উচিৎ নয়। তাই আমি আর তাবলীগে যায় না।এখন ওরা আমাকে ভয় দেখাচ্ছে আমি নাকি আল্লাহর অপ্রিয়দের তালিকায় নাম লিখছি এবং শয়তানের ধোঁকায় পড়েছি।তাই দাওয়াতি কাজ ছেড়ে দিচ্ছি।আমি এক্ষেত্রে কী করব যদি দয়া করে উত্তর দিতেন...
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার উদ্বেগটি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত এবং ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে স্পষ্টভাবে সমাধানযোগ্য। নিচে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো:
১. মহিলাদের জন্য মাহরাম ছাড়া সফরের বিধান:
ইসলামে মহিলাদের জন্য মাহরাম (নিকটাত্মীয় যাদের সাথে বিবাহ হারাম) ছাড়া সফর করা নিষিদ্ধ। এটি কুরআন, হাদিস এবং সর্বসম্মত ফিকহি মতামত দ্বারা প্রমাণিত।
-
হাদিস:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:"কোনো মহিলা যেন মাহরাম ছাড়া (দূরের) সফর না করে।"
(সহিহ বুখারী: ১০৮৮, সহিহ মুসলিম: ১৩৩৯) -
হানাফি ফিকহ:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, মাহরাম ছাড়া মহিলার সফর (প্রায় ৭৭ কিমি বা তার বেশি) করা হারাম। এমনকি ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-ও এই মতের সমর্থক।
(বাদায়েউস সানায়ি, ২/১২৩; রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৩) -
ব্যতিক্রম:
যদি সফরটি ফরজ (যেমন: হজ্জ) হয় এবং সাথে নির্ভরযোগ্য মহিলা সঙ্গী থাকে, তবে কিছু আলেম অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু সাধারণ দাওয়াতি কাজের জন্য এটি জরুরি নয়।
২. পরিবারের দায়িত্ব অবহেলা করা:
ইসলামে পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করা ফরজ। বিশেষত স্ত্রী, সন্তান এবং পিতামাতার অধিকার রক্ষা করা অপরিহার্য।
-
কুরআন:
"হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।"
(সূরা আত-তাহরিম: ৬) -
হাদিস:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:"প্রত্যেক ব্যক্তি তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।"
(সহিহ বুখারী: ৮৯৩)
যদি দাওয়াতি কাজের কারণে পরিবারের প্রয়োজনীয় অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়, তবে তা জায়েয নয়।
৩. তাবলীগের দাওয়াতি কাজের গুরুত্ব:
তাবলীগ বা দাওয়াতি কাজ ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি নিজের সামর্থ্য, সময় এবং পরিবারের দায়িত্বের সাথে সামঞ্জস্য রেখে করতে হবে।
-
কুরআন:
"তোমাদেরকে সেই পথে দাওয়াত দাও যা তোমাদের রবের দিকে নিয়ে যায়।"
(সূরা ফুসসিলাত: ৩৩) -
হানাফি ফিকহ:
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেছেন:"ফরজ দায়িত্ব পালনের পরই নফল ইবাদতের গুরুত্ব।"
(রদ্দুল মুহতার, ১/৪৫)
৪. আপনাকে ভয় দেখানোর জবাব:
যারা আপনাকে বলছে যে, "আল্লাহর অপ্রিয়দের তালিকায় নাম লিখছ" বা "শয়তানের ধোঁকায় পড়েছ", তাদের এই কথা ভুল ও ভিত্তিহীন।
-
ইসলামের মূলনীতি:
ইসলামে জবরদস্তি বা ভয় দেখিয়ে ধর্ম পালন করানো নিষিদ্ধ।"ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই।"
(সূরা আল-বাকারা: ২৫৬) -
আপনার সিদ্ধান্ত সঠিক:
আপনি মাহরাম ছাড়া সফর না করে এবং পরিবারের দায়িত্ব পালন করে আল্লাহর বিধান মেনে চলেছেন। এটি শয়তানের ধোঁকা নয়, বরং দ্বীনের সঠিক অনুসরণ।
৫. আপনার করণীয়:
১. দাওয়াতি কাজ চালিয়ে যান তবে এমনভাবে যা শরিয়তসম্মত এবং পরিবারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- যেমন: ঘরে বসে মহিলাদের জন্য দ্বীনি মাহফিলের আয়োজন করা, বই-পুস্তক বিতরণ করা, অনলাইনে দাওয়াতি কাজ করা ইত্যাদি।
২. মাহরাম ছাড়া সফর করবেন না এবং পরিবারের দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিন।
৩. তাবলীগের ভাইদের সাথে বিনয়ের সাথে আপনার অবস্থান ব্যাখ্যা করুন এবং তাদেরকে শরিয়তের দলিল দেখান।
৪. আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আপনার নিয়তকে কবুল করেন এবং আপনাকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দেন।
৬. দলিলভিত্তিক রেফারেন্স:
- কুরআন: সূরা আত-তাহরিম (৬), সূরা ফুসসিলাত (৩৩), সূরা আল-বাকারা (২৫৬)
- হাদিস: সহিহ বুখারী (১০৮৮), সহিহ মুসলিম (১৩৩৯), সহিহ বুখারী (৮৯৩)
- হানাফি ফিকহ: বাদায়েউস সানায়ি (২/১২৩), রদ্দুল মুহতার (২/৪৬৩, ১/৪৫)
উপসংহার:
আপনার সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ ইসলামসম্মত। আপনি মাহরাম ছাড়া সফর না করে এবং পরিবারের দায়িত্ব পালন করে আল্লাহর বিধান মেনে চলেছেন। যারা আপনাকে ভয় দেখাচ্ছে, তাদের কথা শুনে বিভ্রান্ত হবেন না। দ্বীনের কাজ এমনভাবে করুন যা শরিয়তসম্মত এবং আপনার পরিবারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আল্লাহ আপনার নিয়ত কবুল করুন এবং আপনাকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।