ছবি তোলা কি জায়েজ নয়?আর যারা ছবি তুলে তারা কি ধার্মিক নয়?নিকাব পরিহিতা ছবিও কি নাজায়েজ
Faith and Belief · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
ছবি তোলা কি জায়েজ নয়? — একটি পরিপূর্ণ ইসলামি বিশ্লেষণ
ভূমিকা
বিষয়: ছবি তোলার বিধান, ছবি তোলাকারীদের ধার্মিকতা, এবং নিকাব পরিহিতা নারীর ছবি তোলার বিধান মাযহাব: আহলে হাদীস / সালাফী
১. ছবি তোলার মূল বিধান
কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে
ছবি তোলা (ফটোগ্রাফি) সম্পর্কে ইসলামি পণ্ডিতদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। বিষয়টি দুটি ভাগে বিভক্ত:
ক. প্রাণীবিশিষ্ট ছবি (যা হারাম):
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যারা এই ছবিগুলো তৈরি করে, কিয়ামতের দিন তাদেরকে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে।" (সহীহ বুখারী: ৫৯৫০, সহীহ মুসলিম: ২১০৯)
আরও বলেছেন:
"প্রতিটি ছবি প্রস্তুতকারী জাহান্নামে যাবে। প্রতিটি ছবির বদলে তার একটি প্রাণ সৃষ্টি করা হবে, যা দিয়ে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে।" (সহীহ বুখারী: ২২২৫, সহীহ মুসলিম: ২১১০)
খ. প্রাণীবিহীন ছবি (যা জায়েজ):
পাহাড়, নদী, গাছপালা, দালান-কোঠা ইত্যাদির ছবি তোলা জায়েজ। কেননা নবী ﷺ যে ছবি তৈরি করতে নিষেধ করেছেন তা প্রাণীবিশিষ্ট ছবি।
২. ফটোগ্রাফি (ছবি তোলা) সম্পর্কে সালাফি আলেমদের মত
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ):
ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"যে ছবি হারাম, তা হলো এমন ছবি যা হাতে আঁকা বা তৈরি করা হয়। আর ফটোগ্রাফি (ক্যামেরায় তোলা ছবি) সম্পর্কে পরবর্তী যুগের আলেমরা মতভেদ করেছেন। অনেকেই এটাকে জায়েজ বলেছেন, কারণ এটি হাতে তৈরি নয়, বরং এটি আল্লাহর সৃষ্টির প্রতিচ্ছবি সংরক্ষণ মাত্র।" (মাজমু' ফাতাওয়া: ১২/৩৯)
তবে ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) নিজে ফটোগ্রাফির যুগে ছিলেন না, তাই তার মূল আলোচনা হাতে আঁকা ছবি সম্পর্কে।
শায়খ ইবনে বায (রহিমাহুল্লাহ):
শায়খ ইবনে বায (রহিমাহুল্লাহ) ফটোগ্রাফিকে জায়েজ বলেছেন যদি নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হয়:
- ছবিটি হারাম কাজের জন্য না হয়
- ছবিতে কোনো নারী (বেগানা) না থাকে
- ছবিটি পূজা বা শ্রদ্ধার জন্য না হয়
- ছবিটি অশ্লীল না হয়
তিনি বলেন:
"ফটোগ্রাফি জায়েজ, যদি তা বৈধ উদ্দেশ্যে হয় — যেমন পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ডকুমেন্টেশন ইত্যাদির জন্য। কিন্তু যদি ছবি তোলা হয় হারাম উদ্দেশ্যে — যেমন অশ্লীলতা, ফিতনা, বা নারীদের প্রদর্শনীর জন্য — তাহলে তা হারাম।" (মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে বায: ২/৩৯)
শায়খ আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ):
শায়খ আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) ফটোগ্রাফিকে জায়েজ বলেছেন। তিনি বলেন:
"ফটোগ্রাফি (ক্যামেরায় তোলা ছবি) হাতে আঁকা ছবির মতো নয়। এটি একটি ছায়া (প্রতিচ্ছবি) সংরক্ষণ মাত্র। তাই এটি জায়েজ, যদি বৈধ উদ্দেশ্যে হয়।" (সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর)
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ):
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"ফটোগ্রাফি সম্পর্কে সঠিক মত হলো: এটি জায়েজ যদি বৈধ উদ্দেশ্যে হয়। কারণ এটি হাতে তৈরি ছবি নয়, বরং এটি আল্লাহর সৃষ্টির প্রতিচ্ছবি। কিন্তু যদি ছবি তোলা হয় হারাম উদ্দেশ্যে — যেমন নারীদের ছবি তোলা ফিতনার জন্য — তাহলে তা হারাম।" (মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন: ২/২৮৫)
শায়খ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ):
শায়খ আল-ফাওযান বলেন:
"ফটোগ্রাফি জায়েজ, যদি তা বৈধ কাজে ব্যবহৃত হয় — যেমন পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, শিক্ষা ইত্যাদি। কিন্তু যে ছবি হারাম কাজে ব্যবহৃত হয় — যেমন অশ্লীলতা, নারী প্রদর্শন — তা হারাম।" (আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান)
৩. যারা ছবি তোলে তারা কি ধার্মিক নয়?
এই প্রশ্নের উত্তর হলো: ছবি তোলা নিজেই হারাম নয় (বৈধ উদ্দেশ্যে হলে)। তাই যারা বৈধ উদ্দেশ্যে ছবি তোলে তারা ধার্মিক হতে পারে। কিন্তু যারা হারাম উদ্দেশ্যে ছবি তোলে — যেমন অশ্লীল ছবি, নারীদের ছবি ফিতনার জন্য — তারা গুনাহগার হবে।
তবে মনে রাখতে হবে: কোনো মুসলিমকে "ধার্মিক নয়" বলা বা তাকফির করা খুবই বড় বিষয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যদি কোনো ব্যক্তি তার ভাইকে 'কাফির' বলে ডাকে, তবে তাদের মধ্যে একজন কাফির হয়ে যাবে (যদি সে সত্যিই কাফির না হয়, তাহলে ডাকনেওয়ালা নিজেই কাফির হয়ে যাবে)।" (সহীহ বুখারী: ৬১০৩, সহীহ মুসলিম: ৬০)
সুতরাং কোনো মুসলিমকে "ধার্মিক নয়" বা "কাফির" বলা যাবে না, যতক্ষণ না স্পষ্ট প্রমাণ থাকে।
৪. নিকাব পরিহিতা নারীর ছবি তোলার বিধান
নিকাব পরিহিতা নারীর ছবি তোলা কি জায়েজ?
এখানে কয়েকটি দিক বিবেচনা করতে হবে:
ক. নিকাব পরিহিতা নারীর ছবি তোলা (যেখানে শুধু চোখ দেখা যায়):
বেশিরভাগ সালাফি আলেমের মতে, নিকাব পরিহিতা নারীর ছবি তোলা জায়েজ হতে পারে যদি:
- ছবিটি বৈধ উদ্দেশ্যে হয় (যেমন পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট)
- ছবিটি প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে না হয়
- ছবিতে নারীর সৌন্দর্য প্রকাশ না পায়
তবে শর্ত হলো: ছবিটি যেন ফিতনার কারণ না হয়।
খ. নিকাব পরিহিতা নারীর ছবি প্রকাশ করা:
নিকাব পরিহিতা নারীর ছবি প্রকাশ করা (সোশ্যাল মিডিয়ায়, ওয়েবসাইটে) নাজায়েজ, কারণ:
- এটি ফিতনার কারণ হতে পারে
- নারীর চোখও সৌন্দর্যের অংশ
- ইসলাম নারীকে গোপন রাখতে নির্দেশ দিয়েছে
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তোমরা নিজেদেরকে সাজিয়ে প্রদর্শন করো না, যেমন জাহেলিয়াতের যুগে প্রদর্শন করা হতো।" (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)
গ. নিকাব পরিহিতা নারীর ছবি তোলা (যেখানে সম্পূর্ণ মুখ ঢাকা):
যদি ছবিতে নারীর সম্পূর্ণ মুখ ঢাকা থাকে এবং কোনো সৌন্দর্য প্রকাশ না পায়, তাহলে তা জায়েজ হতে পারে বৈধ উদ্দেশ্যে। তবে প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
৫. ছবি তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শর্তসমূহ
সালাফি আলেমদের মতে, ছবি তোলা জায়েজ হওয়ার শর্ত:
- বৈধ উদ্দেশ্য — পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, শিক্ষা, ডকুমেন্টেশন, মেডিকেল ইত্যাদি
- নারীদের ছবি না হওয়া — বিশেষ করে বেগানা নারীর ছবি তোলা বা রাখা হারাম
- অশ্লীলতা না থাকা — কোনো অশ্লীল ছবি তোলা বা রাখা হারাম
- পূজা বা শ্রদ্ধার উদ্দেশ্যে না হওয়া — কোনো ছবিকে পূজা করা বা শ্রদ্ধা করা হারাম
- প্রাণীবিশিষ্ট ছবি না হওয়া — যদি প্রাণীবিশিষ্ট ছবি তোলা হয়, তবে তা বৈধ উদ্দেশ্যে হতে হবে (যেমন পাসপোর্ট)
৬. ছবি তোলার ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ
- নারীদের ছবি তোলা — বিশেষ করে বেগানা নারীদের ছবি তোলা বা রাখা হারাম
- অশ্লীল ছবি — যেকোনো অশ্লীল ছবি তোলা, রাখা, বা দেখা হারাম
- প্রাণীবিশিষ্ট ছবি ঝুলানো — ঘরে বা দেয়ালে প্রাণীবিশিষ্ট ছবি ঝুলানো নিষিদ্ধ (সহীহ বুখারী: ৫৯৫৯)
- ছবি তোলা হারাম উদ্দেশ্যে — যেমন ফিতনা সৃষ্টি, প্রদর্শনী, অহংকার ইত্যাদি
৭. গুরুত্বপূর্ণ হাদীস
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমার কাছে আসতে চাননি, কারণ ঘরে একটি ছবি ছিল।" (সহীহ বুখারী: ৩২২৬, সহীহ মুসলিম: ২১০৪)
আরও বলেছেন:
"যে ঘরে ছবি থাকে, সেখানে ফেরেশতারা প্রবেশ করেন না।" (সহীহ বুখারী: ৩২২৬, সহীহ মুসলিম: ২১০৬)
তবে এই হাদীসগুলো প্রাণীবিশিষ্ট ছবি সম্পর্কে, যা ঘরে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
৮. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
ছবি তোলার বিধান:
- প্রাণীবিহীন ছবি (প্রাকৃতিক দৃশ্য, স্থাপনা) — জায়েজ
- প্রাণীবিশিষ্ট ছবি (মানুষ, পশু) — বৈধ উদ্দেশ্যে জায়েজ (পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, শিক্ষা), অবৈধ উদ্দেশ্যে হারাম
- নারীদের ছবি — হারাম (বেগানা নারীর ছবি তোলা, রাখা, দেখা)
- নিকাব পরিহিতা নারীর ছবি — বৈধ উদ্দেশ্যে জায়েজ (পরিচয়পত্র), প্রকাশ করা হারাম
যারা ছবি তোলে তারা কি ধার্মিক নয়?
না, ছবি তোলা নিজেই ধার্মিকতা নষ্ট করে না। যদি কেউ বৈধ উদ্দেশ্যে ছবি তোলে, সে ধার্মিক হতে পারে। কিন্তু যদি কেউ হারাম উদ্দেশ্যে ছবি তোলে — যেমন অশ্লীল ছবি, নারীদের ছবি — তাহলে সে গুনাহগার হবে। তবে তাকে "ধার্মিক নয়" বলা বা তাকফির করা যাবে না।
৯. উপদেশ
- ছবি তোলার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করুন — বৈধ উদ্দেশ্য ছাড়া ছবি তোলা থেকে বিরত থাকুন
- নারীদের ছবি তোলা থেকে বিরত থাকুন — বিশেষ করে বেগানা নারীদের ছবি তোলা, রাখা, বা দেখা হারাম
- নিজের ছবি প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকুন — বিশেষ করে নারীদের জন্য, কারণ এটি ফিতনার কারণ
- অন্যের ধার্মিকতা নিয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন — কারো ধার্মিকতা নিয়ে সন্দেহ করা বা তাকে "ধার্মিক নয়" বলা হারাম
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।
রেফারেন্সসমূহ:
- সহীহ বুখারী: ৫৯৫০, ২২২৫, ৬১০৩, ৩২২৬, ৫৯৫৯
- সহীহ মুসলিম: ২১০৯, ২১১০, ৬০, ২১০৪, ২১০৬
- সূরা আল-আহযাব: ৩৩
- মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ: ১২/৩৯
- মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে বায: ২/৩৯
- মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন: ২/২৮৫
- আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান