বিবিধ বিষয়ে ওয়াসওয়াসা নিয়ে প্রশ্ন

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 4031
Questioner: Arif Mahir
Question Asked: 16 Aug 2026, 01:04 AM
Reviewed & Published: 16 Aug 2026, 02:38 AM
Views: 4
Tokens: 3,860
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

এতবার প্রশ্নের জন্য মাফ চাই,প্রশ্ন ৪০২৭,তার ওয়াসওয়াসা আসে নমরুদের মতো আল্লাহকে হত্যা এত্ত জঘন্য,আসতাগফিরুল্লাহ এই কাজ করলে এইটা ওই কাজ করলে এইটা এইটার জন্য সে সব বন্ধ করে বসে থাকে আর সে ভয় পায় আল্লাহ তাকে ঘুমের মধ্যে কি করবেন,আজাব হায়াত এইগুলা তার মনে মৃত্যু নিয়ে ওয়াসওয়াসা আসে,মনের অজান্তে খারাপ দোয়া মনে আসে

Answer

উত্তর

প্রশ্নকারী ভাই/বোন, প্রথমেই বলে নিচ্ছি—আপনার এই ওয়াসওয়াসা (মনের খারাপ চিন্তা) নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার কারণে হয়ে থাকে। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এই ধরনের খারাপ চিন্তা মনে আসা গুনাহ নয়, যতক্ষণ না তা মুখে উচ্চারণ করা হয় বা কাজে পরিণত করা হয়।

কুরআন ও হাদীসের আলোকে সমাধান

১. খারাপ চিন্তা মনে আসা গুনাহ নয়

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ" "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের মনের কথা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা কাজে পরিণত করে বা মুখে উচ্চারণ করে।" (সহীহ বুখারী: ৫২৬৯, সহীহ মুসলিম: ১২৭)

২. ওয়াসওয়াসা সম্পর্কে হাদীস

সাহাবায়ে কিরাম একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে বললেন:

"ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মনে এমন খারাপ চিন্তা আসে যা মুখে বলতে আমাদের কাছে অত্যন্ত জঘন্য মনে হয়।"

রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন:

"সেটিই তো ঈমানের প্রমাণ (অর্থাৎ তোমরা এগুলোকে জঘন্য মনে করছ বলেই তোমাদের ঈমান আছে)।"

(সহীহ মুসলিম: ১৩২)

৩. ওয়াসওয়াসা দূর করার উপায়

ক. আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করুন:

قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ ۝ مَلِكِ النَّاسِ ۝ إِلَٰهِ النَّاسِ ۝ مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ "বলুন, আমি আশ্রয় চাই মানুষের রবের, মানুষের বাদশাহের, মানুষের মাবুদের, সেই কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে, যে বারবার ফিরে আসে।" (সূরা আন-নাস: ১-৪)

খ. ওয়াসওয়াসা এলে "আমন্ত্রা বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন

গ. ওয়াসওয়াসা এলে "আমানতু বিল্লাহি ওয়া রুসুলিহি" বলুন

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"يَأْتِي الشَّيْطَانُ أَحَدَكُمْ فَيَقُولُ: مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ حَتَّى يَقُولَ: مَنْ خَلَقَ رَبَّكَ؟ فَإِذَا بَلَغَهُ فَلْيَسْتَعِذْ بِاللَّهِ وَلْيَنْتَهِ" "শয়তান তোমাদের কারো কাছে এসে বলে: কে এটা সৃষ্টি করেছে? কে ওটা সৃষ্টি করেছে? এমনকি বলে: তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে? যখন এই পর্যায়ে পৌঁছে, তখন সে যেন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায় এবং (চিন্তা করা) বন্ধ করে দেয়।" (সহীহ বুখারী: ৩২৭৬, সহীহ মুসলিম: ১৩৪)

ঘ. ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন:

"ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের পক্ষ থেকে এমন খারাপ চিন্তা যা মানুষের মনে নিক্ষেপ করা হয়। এর প্রতিকার হলো—একে গুরুত্ব না দেওয়া এবং আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকা।" (রদ্দুল মুহতার: ১/৪২৩)

৪. মৃত্যু ও আজাবের ভয় সম্পর্কে

মৃত্যুর ভয় প্রতিটি মুমিনেরই থাকে, তবে তা যেন আতঙ্কে পরিণত না হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ "তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।" (সূরা আলে ইমরান: ১০২)

মৃত্যুর ভয় থাকা ভালো, কারণ এটি মানুষকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে এবং আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। তবে আতঙ্কিত হয়ে সব কাজ বন্ধ করে দেওয়া সঠিক নয়।

৫. খারাপ দোয়া মনে আসা সম্পর্কে

মনের অজান্তে খারাপ দোয়া মনে আসা—এটিও ওয়াসওয়াসার অংশ। যতক্ষণ না তা মুখে উচ্চারণ করা হয়, ততক্ষণ তা গুনাহ নয়। হাদীসে এসেছে:

"إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا" "আল্লাহ আমার উম্মতের মনের কথা ক্ষমা করে দিয়েছেন।" (সহীহ বুখারী: ৫২৬৯)

৬. ইমামদের বক্তব্য

হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন:

"ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের অস্ত্র। এর সর্বোত্তম চিকিৎসা হলো—একে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা। ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দিলে তা আরও বেড়ে যায়।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/৩৯২)

মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেছেন:

"যে ব্যক্তি ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত, তার উচিত আল্লাহর জিকির বেশি করা এবং এই চিন্তাগুলোকে দূর করার জন্য দৃঢ় সংকল্প করা। ওয়াসওয়াসা কোনো গুনাহ নয়, বরং এটি ঈমানের পরীক্ষা।" (মা'আরিফুল কুরআন: ৮/৭৮৫)

মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন:

"ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো—একে গুরুত্ব না দেওয়া। যত বেশি গুরুত্ব দেবেন, তত বেশি বাড়বে। এটা শয়তানের কৌশল।" (ফাতাওয়া উসমানী: ১/৪৫০)

ব্যবহারিক পরামর্শ

১. নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ুন — এটি ওয়াসওয়াসা দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

২. সকাল-সন্ধ্যার যিকির ও দোয়া পড়ুন — বিশেষ করে আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক ও সূরা নাস।

৩. ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে ঘুমান

৪. ওয়াসওয়াসা এলে "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন এবং চিন্তা পরিবর্তন করুন

৫. একাকীত্ব এড়িয়ে চলুন — বেশি একা থাকলে ওয়াসওয়াসা বাড়ে।

৬. আলেম বা মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নিন — যদি সমস্যা গুরুতর হয়।

৭. বেশি বেশি ইস্তিগফার পড়ুন — "আস্তাগফিরুল্লাহ"।

৮. মনে করুন—এই চিন্তাগুলো শয়তানের পক্ষ থেকে আসছে, আপনার নিজের নয়

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

আপনার এই সমস্যা সম্পূর্ণ সমাধানযোগ্য। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে:

  • মনে খারাপ চিন্তা আসা গুনাহ নয়
  • মনে খারাপ দোয়া আসা গুনাহ নয়
  • মৃত্যুর ভয় থাকা স্বাভাবিক, তবে আতঙ্কিত হওয়া উচিত নয়
  • ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দেওয়াই এর চিকিৎসা

আল্লাহ তাআলা আপনাকে এই ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তি দিন এবং আপনার ঈমানকে মজবুত করুন। আমীন।

وَأَنَا أَسْأَلُ اللَّهَ أَنْ يَشْفِيَكَ وَيُعَافِيَكَ مِنْ كُلِّ وَسْوَاسٍ "আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আপনাকে সুস্থতা দান করেন এবং সকল প্রকার ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তি দেন।"


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.