একাধিক কসম, সঠিক সংখ্যা মনে না থাকলে কাফফারা কিভাবে আদায় করতে হবে?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
কসম (শপথ) ভঙ্গের কাফফারা সম্পর্কে বিস্তারিত ফতোয়া
প্রশ্ন: একজন ব্যক্তি আল্লাহর ইজ্জতের কসম খেয়েছে অনেকবার (হাজার হাজার বার), কিন্তু তার আয় নেই যে কাফফারা আদায় করবে। সে জানেও না কতগুলো কসম খেয়েছে। এখন সে কি কাফফারা আদায় না করা পর্যন্ত গুগল অ্যাকাউন্ট, গেম ইত্যাদি স্বাভাবিক কাজ করতে পারবে? আর তার মাথায় এখন অটো কসম হয়, মুখে না বললেই কি হলো?
উত্তর
১. কসমের সংজ্ঞা ও শর্ত
কসম (শপথ) শুধুমাত্র মুখে উচ্চারণ করলেই হয়। মনে মনে বা মাথায় চিন্তা করলে কসম হয় না। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কসমের জন্য জবান (মুখ) দ্বারা উচ্চারণ করা শর্ত। অন্তরের সংকল্প বা চিন্তা দ্বারা কসম সম্পন্ন হয় না।
قال الإمام أبو حنيفة: لا تنعقد اليمين إلا باللسان ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: কসম শুধুমাত্র জবান দ্বারা সম্পন্ন হয়। (বাদায়েউস সানায়ে, ৩/৪; ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/৫১)
সুতরাং, মাথায় অটো কসম হওয়া বা মনে মনে কসম করার চিন্তা আসা—এগুলো দ্বারা কোনো কসম হয় না। মুখে উচ্চারণ না করলে কোনো কসম সংঘটিত হবে না।
২. কসম ভঙ্গের কাফফারা
কুরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَٰكِنْ يُؤَاخِذُكُمْ بِمَا عَقَّدْتُمُ الْأَيْمَانَ ۖ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ ۖ فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ ۚ "আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের অনর্থক শপথসমূহের জন্য পাকড়াও করবেন না; কিন্তু তিনি তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন সেই শপথের জন্য যা তোমরা দৃঢ়ভাবে করেছ। তার কাফফারা হলো—তোমরা নিজ পরিবারকে যে খাবার দাও, তার মাঝামাঝি মানের খাবার দশজন মিসকীনকে খাওয়ানো, অথবা তাদেরকে বস্ত্র দান করা, অথবা একটি দাস মুক্ত করা। আর যে সামর্থ্য রাখে না, সে তিন দিন সিয়াম পালন করবে।" (সূরা আল-মায়িদা: ৮৯)
কাফফারার বিধান:
- দশজন মিসকীনকে দুই বেলা পেট ভরে খাওয়ানো (মধ্যম মানের)
- অথবা দশজন মিসকীনকে পোশাক দান করা
- অথবা একটি দাস/দাসী মুক্ত করা
- যার সামর্থ্য নেই, সে তিন দিন সিয়াম (রোজা) পালন করবে
৩. একাধিক কসমের কাফফারা
মাসআলা: যদি কেউ একাধিক কসম ভঙ্গ করে, তবে প্রতিটি কসমের জন্য আলাদা কাফফারা দিতে হবে। কিন্তু যদি একই বিষয়ে বারবার কসম করে এবং ভঙ্গ করে, তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটি কাফফারাই যথেষ্ট হতে পারে।
قال صاحب الهداية: ومن حلف على شيء ثم حنث، فعليه الكفارة، وإن تكرر الحنث في يمين واحدة فكفارة واحدة হেদায়ার গ্রন্থকার বলেন: যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ে কসম করে অতঃপর ভঙ্গ করে, তার উপর কাফফারা ওয়াজিব। যদি একই কসম বারবার ভঙ্গ করে, তবে একটি কাফফারাই যথেষ্ট। (আল-হেদায়া, ২/৮৫)
কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন কসম হলে প্রতিটির জন্য আলাদা কাফফারা দিতে হবে।
৪. যার সংখ্যা জানে না তার করণীয়
যদি কেউ জানে না কতগুলো কসম খেয়েছে এবং কতগুলো ভঙ্গ করেছে, তাহলে:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে: অনুমান করে সংখ্যা নির্ধারণ করবে এবং সেই অনুযায়ী কাফফারা আদায় করবে। যদি সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব না হয়, তবে অধিকাংশ সংখ্যা ধরে নিয়ে কাফফারা আদায় করবে।
- ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে: ইস্তিগফার করবে এবং একটি কাফফারাই যথেষ্ট হবে যদি সংখ্যা জানা না থাকে।
وفي اليمين إذا لم يدر كم حلف، قال أبو حنيفة: يتحرى ويخرج بقدر ما غلب على ظنه، وقال أبو يوسف ومحمد: يكفيه كفارة واحدة কসমের সংখ্যা জানা না থাকলে, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: অনুমান করে সংখ্যা নির্ধারণ করবে এবং সেই অনুযায়ী কাফফারা দেবে। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বলেন: একটি কাফফারাই যথেষ্ট। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/৫২; রদ্দুল মুহতার, ৩/৭৩৬)
আমাদের প্রেক্ষাপটে: যেহেতু ব্যক্তি জানে না কতগুলো কসম খেয়েছে, এবং তার আয়ও নেই, তাই সে তিন দিন রোজা রাখতে পারে। যদি সংখ্যা অনেক বেশি হয় এবং প্রতিটির জন্য আলাদা কাফফারা দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত অনুযায়ী একটি কাফফারা (তিন দিন রোজা) আদায় করলেই যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ।
৫. কাফফারা আদায় না করা পর্যন্ত কি স্বাভাবিক কাজ করা যাবে?
হ্যাঁ, কাফফারা আদায় না করা পর্যন্ত সে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে। গুগল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার, গেম খেলা ইত্যাদি কাজে কোনো বাধা নেই। কাফফারা আদায় না করার কারণে তার উপর গুনাহ থাকবে, কিন্তু এটি তাকে স্বাভাবিক কাজকর্ম থেকে বিরত রাখবে না।
তবে, কসম ভঙ্গের গুনাহ থেকে মুক্তির জন্য দ্রুত কাফফারা আদায়ের চেষ্টা করা উচিত। যেহেতু তার আয় নেই, তাই সে তিন দিন রোজা রাখতে পারে, যা কোনো আর্থিক খরচ ছাড়াই সম্ভব।
قال العلامة ابن عابدين: من حنث في يمينه وجبت عليه الكفارة على الترتيب، فإن لم يجد فصيام ثلاثة أيام আল্লামা ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: কসম ভঙ্গ করলে পর্যায়ক্রমে কাফফারা ওয়াজিব হয়। যদি সামর্থ্য না থাকে, তবে তিন দিন সিয়াম পালন করবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৭৩৫)
৬. মুখে না বললে কসম হবে কি?
না, মুখে উচ্চারণ না করলে কসম হবে না। শুধু মাথায় চিন্তা আসা বা মনে মনে সংকল্প করাকে কসম বলা হয় না। কসমের জন্য মুখে উচ্চারণ করা আবশ্যক।
قال العلامة ابن عابدين: ولا تنعقد اليمين بالنية ما لم يتلفظ بها আল্লামা ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: উচ্চারণ না করা পর্যন্ত নিয়ত দ্বারা কসম সম্পন্ন হয় না। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৭০২)
সুতরাং, মাথায় অটো কসম হওয়া বা মনে মনে কসমের চিন্তা আসা—এগুলো দ্বারা কোনো কসম হবে না। মুখে উচ্চারণ না করলে কোনো সমস্যা নেই।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
১. মুখে উচ্চারণ না করলে কসম হয় না — মাথায় অটো কসম হওয়া বা মনে মনে চিন্তা করাকে কসম বলা হয় না।
২. কাফফারা আদায় না করা পর্যন্ত স্বাভাবিক কাজ করা যাবে — গুগল অ্যাকাউন্ট, গেম ইত্যাদি ব্যবহারে কোনো বাধা নেই।
৩. আয় না থাকলে তিন দিন রোজা রাখবে — এটি কোনো আর্থিক খরচ ছাড়াই সম্ভব।
৪. সংখ্যা জানা না থাকলে — ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে একটি কাফফারাই যথেষ্ট। তাই তিন দিন রোজা রাখলেই যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ।
৫. ভবিষ্যতে কসম থেকে বিরত থাকা — যেহেতু কসম ভঙ্গ করা গুনাহ, তাই ভবিষ্যতে কসম করা থেকে বিরত থাকা উচিত। প্রয়োজনে "ইনশাআল্লাহ" বলে কথা বলা উচিত, কসম না করে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।
উত্তর প্রদানে সহায়ক গ্রন্থসমূহ:
- সূরা আল-মায়িদা: ৮৯
- আল-হেদায়া, ২/৮৫
- ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/৫১-৫২
- রদ্দুল মুহতার, ৩/৭০২, ৭৩৫-৭৩৬
- বাদায়েউস সানায়ে, ৩/৪