ওয়াসওয়াসা বা শয়তানি কুমন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায়, কসম ভাঙার কাফফারা, এবং মানসিক রোগের ইসলামী চিকিৎসা সম্পর্কে জানতে চাই?
Faith and Belief · Hanafi
Question
আমি যা লিখার সংক্ষিপ্ত করে লিখার চেষ্টা করব ইনশা আল্লাহ,আমার এক পরিচিত আলহামদুলিল্লাহ সনামধন্য প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ে।সে দীর্ঘদিন যাবত ওয়াসওয়াসাতে আক্রান্ত ও কিছু খারাপ ছেলেদের অভ্যাস এর সাথে যুক্ত,মানে পার্সোনাল।তো সে খুব আল্লাহর ইজ্জতের নামে কসম খেত আর বলত এই কাজ করলে আমার যেন এই হয় ওই হয়,সে মরণঘাতী ব্যাধি নিয়েও কসম খেয়েছে আর তার নেশা ছিল কসম ভাঙা মানে তার ব্রেইন ওইভাবেই অভ্যাস হয়েছে সবকিছুতে অটো কসম হয় আল্লাহর ইজ্জতের আর সাথে সাথে ভেঙে ফেলে,তো তার প্রসাব এর রাস্তায় কিছু সমস্যা হয়েছে যা ডাক্তাররা বলেছে কিচ্ছু না আলহামদুলিল্লাহ,আল্লাহ তায়ালা সম্পুর্ন সুস্থ রেখেছেন,কিন্তু সে শয়তানের ওয়াসওয়াসায় পড়ে সে বারবার টাকা খরচ করে আল্ট্রাসাউন্ড করায়,তো তার সমস্যা সে গুগল অ্যাকাউন্ট না খোলার কসম খেয়েছে,খুললে তার মরণঘাতী রোগ হতে পারে তার প্রসাবের সমস্যা এই ভয়ে কিন্তু তার এখন দরকার, কিন্তু সে খুলতে পারছে না,সে শয়তানের ওয়াসওয়াসাতে পড়ে স্বাভাবিক জীবন থেকে সরে যাচ্ছে,খাতায় ত্রিভুজ আকতে পারে না,৬ সংখ্যা লিখে না,গুরুত্বপূর্ণ কোন ইসলামিক ভিডিও সেভ করলে যতজন সেভ করেছে সেই নাম্বার নিয়ে ওয়াসওয়াসা আসে সেইটা তার হায়াত এইগুলা ওয়াসওয়াসা,সে ক্লাসের কোন ছেলেমেয়ের সাথে মিশতে পারে না,মনে করে সবকিছু শয়তানের চাল,সবকিছুতে শয়তান খোজে ভালো কিছু দেখলেও বলে এর মধ্যে শয়তান নেই তো,অযথা মৃত্যু ভয়,তার মনে হয় ফুটবল গেইম না খেলার আল্লাহর ইজ্জতের কসম খাইছে এখন খেলছে এখন মনে হচ্ছে আল্লাহ তাকে কি আজাব দিবেন সারাদিন ক্যান্সার এর চিন্তা করে যা এক্কেবারেই অযাচিত,সে ফুটবল গেম খেলতে চায় মিউজিক অফ রেখে তাও সে পারে না মানে সে স্বাভাবিক জীবন এ মানুষ যা করে তাতেই তার ওয়াসওয়াসা আসে,সে মনে করে বারবার ইনশা আল্লাহ না লিখলে তার রোগ হবে যার কথা লিখেছি,আল্লাহর উপর কিছু এইগুলা মানে যা তা আর ইদানিং সে কিছু করতে গেলেই তার মনে আল্লাহকে নিয়ে নমরুদের মতো চিন্তা আসে মানে এক্কেবারে অটো,তাকে নিয়ে কিছু বলি আলহামদুলিল্লাহ তার মধ্যে মুসলিম উম্মতের সেভা করার অনেক পটেনশিয়াল আছে আলহামদুলিল্লাহ,সে ফিজিক্স দিয়ে নাস্তিক দের বিরুদ্ধে লিখতে পারে আলহামদুলিল্লাহ এই ওয়াসওয়াসার মধ্যেও,আল্লাহর খাছে দুয়ার জন্যে হাত তুললেই তার কান্না আসে,তার বাবা নেই,তার মা আর এক বড় বোন,সে চায় স্বাভাবিক হতে আল্লাহর ওয়াস্তে মায়ের সেবা করতে উম্মতের সেবা করতে আল্লাহর কসম সে চায়,আপনারা প্লিজ সাহায্য করুন আল্লাহর ওয়াস্তে ইনশা আল্লাহ আপনাদের সাহায্য বিফলে যাবে না তার এইগুলার জন্য ভার্সিটির লেখাপড়া হচ্ছে না আর প্রচুর টাকা নষ্ট হচ্ছে ইনশা আল্লাহ আল্লাহর ওয়াস্তে সাহায্য চাই
Answer
ওয়াসওয়াসা (Waswasa) সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার পরিচিত ব্যক্তির সমস্যাটি মূলত ওয়াসওয়াসা (Waswasa) বা শয়তানি কুমন্ত্রণা। এটি একটি মানসিক অবস্থা, যা অনেক মুমিনের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এর সমাধান রয়েছে। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ওয়াসওয়াসা কী?
ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের পক্ষ থেকে মনে এমন খেয়াল আনা, যা মানুষকে স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধা দেয়। শয়তান মানুষকে বিভিন্নভাবে বিভ্রান্ত করে, বিশেষ করে ইবাদত, পবিত্রতা, এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে সন্দেহ সৃষ্টি করে।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়।" (সূরা আল-বাকারা: ২৬৮)
২. ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা
ক. ওয়াসওয়াসা উপেক্ষা করা
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমরা ওয়াসওয়াসা ত্যাগ করো, কারণ ওয়াসওয়াসা থেকে ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি হয়।" (মুসনাদ আহমাদ)
ওয়াসওয়াসার সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হলো একে গুরুত্ব না দেওয়া। যখনই মনে কোনো সন্দেহ বা খারাপ চিন্তা আসবে, তখন তা উপেক্ষা করতে হবে এবং "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়তে হবে।
খ. কসম ভাঙার কাফফারা
যেহেতু আপনার পরিচিত ব্যক্তি অনেক কসম খেয়েছে এবং ভেঙেছে, তাই তার জন্য কসম ভাঙার কাফফারা দেওয়া জরুরি।
কাফফারা:
- ১০ জন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো, অথবা
- ১০ জন মিসকিনকে কাপড় দেওয়া, অথবা
- একজন দাস/ক্রীতদাস মুক্ত করা।
(যারা সামর্থ্য রাখে না, তারা ৩ দিন রোজা রাখবে)
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের শপথসমূহের জন্য দোষারোপ করবেন না, কিন্তু যে শপথ তোমরা দৃঢ়ভাবে করেছ, তার জন্য দোষারোপ করবেন। এর কাফফারা হলো—তোমাদের পরিবারকে যে খাবার দাও, তার মধ্যম ধরণের খাবার দশজন মিসকিনকে খাওয়ানো, অথবা তাদেরকে বস্ত্র দান করা, অথবা একজন দাস মুক্ত করা। আর যে সামর্থ্য রাখে না, সে তিন দিন রোজা রাখবে।" (সূরা আল-মায়িদা: ৮৯)
৩. ওয়াসওয়াসা ও মানসিক রোগ
আপনার পরিচিত ব্যক্তির সমস্যাটি শুধু ধর্মীয় নয়, এটি মানসিক রোগ (OCD)-এর পর্যায়ে চলে গেছে। তাই:
১. মানসিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি - এটি ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ এবং প্রয়োজনীয়।
২. আল্ট্রাসাউন্ড বা অন্যান্য পরীক্ষা বারবার করানো - ডাক্তার যদি বলেন কোনো সমস্যা নেই, তাহলে তা বিশ্বাস করা উচিত। বারবার পরীক্ষা করানো ওয়াসওয়াসারই অংশ।
৪. আল্লাহ সম্পর্কে খারাপ চিন্তা আসা
যদি কারো মনে আল্লাহ সম্পর্কে খারাপ চিন্তা আসে, তবে এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"শয়তান তোমাদের কারো কাছে এসে বলে, 'কে আকাশ সৃষ্টি করেছে? কে পৃথিবী সৃষ্টি করেছে?' তখন সে যেন বলেঃ 'আল্লাহ'।" (বুখারী ও মুসলিম)
যখনই এমন চিন্তা আসবে, তখন বলবে:
"আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি এবং তাঁর রাসূলের উপর।"
এবং চিন্তাটি বাদ দেবে।
৫. ইনশাআল্লাহ না লিখলে রোগ হবে—এই ভয়
এটি সম্পূর্ণ শয়তানি প্ররোচনা। ইনশাআল্লাহ লেখা বা না লেখার সাথে রোগের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি একটি কুসংস্কার। ইসলামে এ ধরনের কুসংস্কার গ্রহণযোগ্য নয়।
৬. ব্যবহারিক পরামর্শ
১. কসমের কাফফারা আদায় করুন - যতগুলো কসম ভেঙেছে, সেগুলোর জন্য কাফফারা আদায় করুন।
২. ডাক্তারের পরামর্শ নিন - মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন।
৩. ওয়াসওয়াসা উপেক্ষা করুন - যখনই খারাপ চিন্তা আসবে, "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন এবং চিন্তাটি বাদ দিন।
৪. নিয়মিত নামাজ ও জিকির করুন - ফজরের পর এবং আসরের পরের জিকিরগুলো নিয়মিত পড়ুন।
৫. মৃত্যু ও রোগের ভয় দূর করুন - মৃত্যু আল্লাহর হাতে, এটি নিশ্চিত সত্য। রোগও আল্লাহর ইচ্ছায় হয়। বারবার চিন্তা করলে সমস্যা বাড়ে।
৬. পরিবারের সাথে সময় কাটান - মা ও বোনের সাথে সময় কাটান, তাদের সাথে কথা বলুন।
৭. ভালো কাজে মন দিন - উম্মতের সেবা করার পটেনশিয়াল আছে, সেদিকে মনোনিবেশ করুন।
৭. দোয়া
নিম্নোক্ত দোয়াটি পড়তে পারেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ
"হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে এবং ঋণের বোঝা ও মানুষের জুলুম থেকে।" (বুখারী)
৮. উপসংহার
আপনার পরিচিত ব্যক্তির সমস্যা সমাধানযোগ্য। তাকে বুঝাতে হবে যে:
- ওয়াসওয়াসা শয়তানের কাজ, এতে গুরুত্ব দিলে সমস্যা বাড়ে।
- কসম ভাঙার কাফফারা আদায় করলে দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে।
- বারবার পরীক্ষা করানো ওয়াসওয়াসার অংশ, ডাক্তারের পরামর্শই যথেষ্ট।
- মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
আল্লাহ তায়ালা তাকে শিফা দান করুন এবং স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিন। আমিন।