গণকের কাছে যাওয়া এবং তাকে প্রশ্ন করার বিধান।
Faith and Belief · Ahle Hadith / Salafi
Question
আমার কি ৪০ দিনের ইবাদত কাটা যাবে বা ইমান চলে যাবে এবং ২/১ সমস্যার মিলে যাওয়ার কথা ভাবার কারনে কি ইমান চলে যাবে। উনাকে আমার বিশ্বাস হয়না এখনো
Answer
ইমান থাকবে কি? — জবাব
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনি একজন ঝাড়ফুককারী/গণকের কাছে গিয়েছিলেন (মায়ের অনুরোধে), তিনি হাত দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করার চেষ্টা করেছেন, পানি পড়ে দিয়েছেন। আপনি তাকে বিশ্বাস করেন না এবং সেই পানি ব্যবহার করবেন না। আপনার প্রশ্ন হলো—এই কাজের কারণে কি ৪০ দিনের ইবাদত নষ্ট হবে? ইমান চলে যাবে কি? আর তার বলা ২/১টি সমস্যার মিলে যাওয়ার কারণে কি ইমান ক্ষতিগ্রস্ত হবে?
মূল নীতি: গণক ও জ্যোতিষীর কাছে যাওয়ার বিধান
১. গণকের কাছে যাওয়া এবং তাকে বিশ্বাস করার শাস্তি
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً" "যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করল, তার ৪০ রাতের নামাজ কবুল হবে না।" (সহীহ মুসলিম: ২২৩০)
অন্য হাদিসে এসেছে:
"مَنْ أَتَى كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ" "যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে গেল এবং সে যা বলে তা সত্য বলে বিশ্বাস করল, সে মুহাম্মাদ ﷺ-এর উপর যা নাযিল হয়েছে তা অস্বীকার করল (কুফরি করল)।" (মুসনাদ আহমাদ: ৯৫৩৬, সুনানে আবু দাউদ: ৩৯০৪ — শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন)
২. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যার ব্যাখ্যা
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"গণকের কাছে যাওয়া এবং তাকে প্রশ্ন করা হারাম। আর যে তাকে বিশ্বাস করল, সে কুফরি করল। কারণ সে আসমানী জ্ঞান ছাড়া গায়েবের দাবি করছে, যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।"
তিনি আরও বলেন:
"যে ব্যক্তি গণকের কাছে যায় এবং তাকে প্রশ্ন করে, তার ৪০ দিনের নামাজ কবুল হয় না—এটি গুনাহের কারণে, ইমান হারানোর কারণে নয়। কিন্তু যদি সে গণকের কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে, তাহলে তা কুফরি।"
আপনার অবস্থার বিশ্লেষণ
১. আপনি কি ৪০ দিনের ইবাদত নষ্ট করেছেন?
উত্তর: আপনি গণকের কাছে গিয়েছিলেন এবং তিনি আপনার হাত দেখেছিলেন। আপনি তাকে প্রশ্ন করেননি, কিন্তু তিনি আপনার হাত দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। এই অবস্থায়—
- যদি আপনি তাকে বিশ্বাস না করে থাকেন (যা আপনার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট), তাহলে আপনার ইমান অক্ষত আছে, ইনশাআল্লাহ।
- ৪০ দিনের নামাজ কবুল না হওয়া মানে এই নয় যে নামাজই পড়া যাবে না বা নামাজের সওয়াবই হবে না। বরং মানে হলো—নামাজের পূর্ণ সওয়াব ও কবুলিয়ত থেকে বঞ্চিত হওয়া। নামাজ পড়তে হবে, কিন্তু সেই ৪০ দিনের নামাজের বিশেষ ফজিলত কমে যাবে।
শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"৪০ দিনের নামাজ কবুল না হওয়ার অর্থ এই নয় যে নামাজ বাতিল হয়ে যাবে, বরং অর্থ হলো—নামাজের পূর্ণ সওয়াব ও কবুলিয়ত থেকে বঞ্চিত হওয়া। নামাজ পড়া ফরজ, তা পড়তেই হবে।"
২. ইমান চলে যাবে কি?
উত্তর: আপনার ইমান চলে যাবে না, ইনশাআল্লাহ। কারণ:
১. আপনি তাকে বিশ্বাস করেননি ২. আপনি তার ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য বলে মেনে নেননি ৩. আপনি তার দেওয়া পানি ব্যবহার করবেন না ৪. আপনি তাকে ভালো লোক মনে করছেন না
শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন:
"গণকের কাছে যাওয়া হারাম এবং কবিরা গুনাহ। কিন্তু এটি ইমান হারানোর কারণ তখনই হবে, যখন কেউ গণকের কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে। যদি কেউ শুধু পরীক্ষার জন্য বা তার ভুল প্রমাণের জন্য যায়, তাহলে তা কবিরা গুনাহ, কিন্তু কুফরি নয়।"
৩. ২/১টি সমস্যার মিলে যাওয়ার কারণে কি ইমান নষ্ট হবে?
উত্তর: না, আপনার ইমান নষ্ট হবে না। কারণ:
- গণকদের অনেক সময় কৌশল থাকে—তারা সাধারণ কিছু বিষয় বলে যা অনেক মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য
- কিছু কথা কাকতালীয়ভাবে মিলে যেতে পারে
- আপনার মনে খটকা লেগেছে এবং আপনি তাকে বিশ্বাস করেননি—এটিই মূল বিষয়
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা বলেন:
"গণকদের অনেক কথা শয়তানের সাহায্যে হয়ে থাকে, আর কিছু কথা কাকতালীয়ভাবে মিলে যায়। মুমিনের কর্তব্য হলো—এসব বিষয় থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহর উপর ভরসা করা।"
করণীয়
১. তওবা করুন
আপনি জেনে বা না জেনে একটি হারাম কাজে জড়িয়ে পড়েছেন। এখন আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা করুন:
"رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي" "হে আমার রব! আমি নিজের উপর জুলুম করেছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।"
২. সেই পানি ফেলে দিন
আপনি ঠিকই মনে করছেন—সেই পানি ব্যবহার করবেন না। এটি ফেলে দিন এবং এ বিষয়ে কোনো চিন্তা করবেন না।
৩. ভবিষ্যতে এড়িয়ে চলুন
আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"وَاعْلَمْ أَنَّ الْأُمَّةَ لَوِ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ لَكَ" "জেনে রাখো—সমগ্র উম্মত যদি একত্র হয়ে তোমার কোনো উপকার করতে চায়, তবে তারা ততটুকুই উপকার করতে পারবে যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন।" (তিরমিজি: ২৫১৬)
৪. গর্ভধারণের জন্য দুআ করুন
গর্ভধারণের জন্য কুরআন ও সহীহ হাদিসের দুআ করুন, যেমন—হযরত যাকারিয়া (আঃ)-এর দুআ:
"رَبِّ هَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ" "হে আমার রব! আপনার পক্ষ থেকে আমাকে পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি দুআ শ্রবণকারী।" (সূরা আলে ইমরান: ৩৮)
সংক্ষিপ্ত উত্তর
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ৪০ দিনের ইবাদত কাটা যাবে? | হ্যাঁ, ৪০ দিনের নামাজের পূর্ণ সওয়াব কমে যাবে (যদিও নামাজ পড়তে হবে), কারণ আপনি গণকের কাছে গিয়েছিলেন | | ইমান চলে যাবে? | না, ইনশাআল্লাহ—যেহেতু আপনি তাকে বিশ্বাস করেননি | | ২/১টি সমস্যা মিলে যাওয়ায় ইমান নষ্ট হবে? | না, কারণ আপনি তাকে বিশ্বাস করেননি এবং এটি কাকতালীয় হতে পারে | | সেই পানি ব্যবহার করা যাবে? | না, ব্যবহার করবেন না—ফেলে দিন |
উপসংহার
আপনার ইমান অক্ষত আছে, ইনশাআল্লাহ। আপনি একটি ভুল করেছেন—গণকের কাছে গিয়ে। এর জন্য তওবা করুন। আল্লাহ তওবা কবুলকারী এবং ক্ষমাশীল। আপনার গর্ভধারণের জন্য আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং সহীহ দুআ করুন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম সন্তান দান করুন। আমীন।
"وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ" "আর যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন (বলে দাও) আমি নিশ্চয়ই নিকটে। আমি দুআকারীর দুআ কবুল করি, যখন সে আমাকে ডাকে।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১৮৬)
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।