স্বপ্নে ভালো রিপোর্ট দেখার অর্থ
Waswasa-OCD · Hanafi
Question
আমি সারাদিন আবোল-তাবোল রোগ নিয়ে ভাবি আমার হবে না তো ওডিসি সমস্যা।
আশে পাশে অনেকে রোগে আক্রান্ত ভিতরে ভয় কাজ করে বলতে পারেন সারাদিন এই টেনশন'ই করি।
তো আজ রাতে সপ্ন দেখলাম আমার মরণ ঘাতি রোগের টেস্ট দিছে আলহামদুলিল্লাহ রিপোর্ট ভালো আইছে তারপর আরো সারাদিন টেনশন যা করছি তাই সপ্ন দেখছি এখন আমার ভয়ে হাত পাও কাপতাছে।
কেন এমন হল?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রিয় বোন/ভাই, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি সারাদিন যে চিন্তা ও টেনশন করেন, রাতে ঘুমের মধ্যে সেই চিন্তার প্রতিফলন স্বপ্নে দেখা খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান থেকেও এর ব্যাখ্যা রয়েছে।
স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও কারণ:
১. দৈনন্দিন চিন্তার প্রতিফলন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (২) শয়তানের পক্ষ থেকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন, এবং (৩) মানুষের নিজের মনের চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন।" (সহিহ বুখারী: ৭০১৭, সহিহ মুসলিম: ২২৬৩)। আপনি সারাদিন রোগ নিয়ে চিন্তা করেন, তাই রাতে সেই চিন্তাই স্বপ্নে ভেসে উঠেছে। এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং এতে ভয়ের কোনো কারণ নেই।
২. শয়তানের কুমন্ত্রণা (ওয়াসওয়াসা): শয়তান মানুষের মনে ভয় ও অস্থিরতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, "শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়।" (সূরা আল-বাকারা: ২৬৮)। আপনি যখন সারাদিন রোগ নিয়ে ভাবছেন, তখন শয়তান আপনার মনে আরও ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এই ভয় ও ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তি পেতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে।
৩. ভালো স্বপ্নের সুসংবাদ: আপনার স্বপ্নে দেখা গেছে যে, আপনার টেস্টের রিপোর্ট ভালো এসেছে। আলহামদুলিল্লাহ, এটি একটি ভালো লক্ষণ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "মুমিনের স্বপ্ন নবুওয়াতের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।" (সহিহ বুখারী: ৬৯৮৭)। ভালো স্বপ্ন দেখলে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত এবং কারো কাছে তা প্রকাশ করা উচিত নয়, বরং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিত।
আপনার করণীয়:
১. ভয় দূর করুন: আপনি যে রোগ নিয়ে ভয় পাচ্ছেন, এটি মূলত শয়তানের ওয়াসওয়াসা। আল্লাহ তাআলা বলেন, "নিশ্চয়ই শয়তানের কুমন্ত্রণা দুর্বল।" (সূরা আন-নিসা: ৭৬)। তাই এই ভয়কে গুরুত্ব দেবেন না।
২. আল্লাহর উপর ভরসা করুন: আল্লাহ তাআলা বলেন, "যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" (সূরা আত-তালাক: ৩)। রোগ-ব্যাধি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে এবং তিনিই আরোগ্য দান করেন। তাই আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখুন।
৩. ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার দোয়া: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে এই দোয়া শিখিয়েছেন:
- "আমিনতু বিল্লাহি ওয়া রুসুলিহি" (আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনলাম) - (সহিহ মুসলিম: ১৩৪)
- অথবা "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" (আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই)।
৪. নিয়মিত নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত করুন: নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত অন্তরে প্রশান্তি আনে। আল্লাহ তাআলা বলেন, "জেনে রাখো, আল্লাহর যিকিরেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।" (সূরা আর-রাদ: ২৮)।
৫. চিকিৎসকের পরামর্শ নিন: যদি এই ভয় ও টেনশন আপনার দৈনন্দিন জীবনকে অতিরিক্ত প্রভাবিত করে, তাহলে একজন ভালো ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ইসলামে রোগের চিকিৎসা করানো বৈধ এবং উৎসাহিত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "প্রতিটি রোগেরই চিকিৎসা আছে।" (সহিহ বুখারী: ৫৬৭৮)।
ফাতাওয়া ও উলামাদের বক্তব্য:
-
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর তাফসির "মা'আরিফুল কুরআন"-এ উল্লেখ করেছেন যে, শয়তান মানুষের মনে ভয় ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে তাকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করার চেষ্টা করে। তাই মুমিনের উচিত শয়তানের এই কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া।
-
মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন, "ওয়াসওয়াসা (সন্দেহ ও ভয়) মূলত শয়তানের কাজ। এর প্রতিকার হলো এটাকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকা।"
-
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ করেছেন যে, রোগ নিয়ে অতিরিক্ত ভয় করা এবং চিন্তা করা উচিত নয়, বরং আল্লাহর উপর ভরসা রেখে চিকিৎসা করানো উচিত।
সারকথা: আপনার স্বপ্নটি আপনার দৈনন্দিন চিন্তারই প্রতিফলন। এতে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং এটি একটি ভালো লক্ষণ যে, আপনার রিপোর্ট ভালো এসেছে। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন, শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে দোয়া পড়ুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে সুস্থতা ও মানসিক প্রশান্তি দান করুন। আমিন।