বিপদে দুআ পড়া সম্পর্কে
Faith and Belief · Hanafi
Question
আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী ‘আফানী মিম্মা-বতালাকা বিহি, ওয়া ফাদ্দালানী ‘আলা কাসীরিম মিম্মান খালাকা তাফদীলা।
বাংলা অর্থ:
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে সেই বিপদ থেকে নিরাপদ রেখেছেন, যে বিপদে তোমাকে পরীক্ষা করেছেন; এবং তাঁর সৃষ্ট অনেকের ওপর আমাকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন।”
এই দোয়াটি এমন কাউকে দেখে পড়া সুন্নত, যিনি কোনো রোগ, শারীরিক অক্ষমতা বা অন্য কোনো পরীক্ষায় আক্রান্ত। তবে এটি এমনভাবে পড়তে হবে যাতে ওই ব্যক্তি শুনতে না পান বা কষ্ট না পান।
হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি এই দোয়াটি পড়বে, আল্লাহ তাকে ওই বিপদ থেকে হিফাজত করবেন (আল্লাহর ইচ্ছায়)।
এটা কি সহীহ হাদিস??
কখন কিভাবে পড়তে হয়?
নিজেকে বিপদে দেখে কি পড়া যাবে যেন এই বিপদ টি না হয় যেমন নিজেকে জ্বর আসলে এই দোয়া পড়া?
ছাত্র হিসেবে এউ দোয়া পড়া যাবে যখন দেখবো অন্যকোন ছাত্রকে আল্লাহ পরীক্ষা নিচ্ছেন তাকে ১ম থেকে ২য় করে। সেই ফলাফল অনেক আগেই দয়েছে কিন্তু সে তো এখনো পরীক্ষায় আছে, তাকে দেখে দোয়া করা যাবে??
আর কি কি ক্ষেত্রে এটি করা যাবে?
Answer
বিপদ থেকে উদ্ধার সংক্রান্ত দোয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা
প্রশ্নের উত্তর
আপনি যে দোয়াটি উল্লেখ করেছেন:
উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী 'আফানী মিম্মা-বতালাকা বিহি, ওয়া ফাদ্দালানী 'আলা কাসীরিম মিম্মান খালাকা তাফদীলা।
অর্থ: "সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে সেই বিপদ থেকে নিরাপদ রেখেছেন, যে বিপদে তোমাকে পরীক্ষা করেছেন; এবং তাঁর সৃষ্ট অনেকের ওপর আমাকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন।"
সহীহ হাদীসের প্রমাণ
এই দোয়াটি সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
হাদীসের উল্লেখ:
১. সুনানে তিরমিযী (হাদীস নং: ৩৪৩১) এবং সুনানে ইবনে মাজাহ (হাদীস নং: ৩৮৯২)-এ বর্ণিত হয়েছে:
حَدَّثَنَا هَنَّادٌ حَدَّثَنَا أَبُو مُعَاوِيَةَ عَنِ الأَعْمَشِ عَنْ عُمَيْرِ بْنِ سَعِيدٍ عَنْ عَلِىٍّ رضى الله عنه قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم: مَنْ رَأَى صَاحِبَ بَلاَءٍ فَقَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِى عَافَانِى مِمَّا ابْتَلاَكَ بِهِ وَفَضَّلَنِى عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقَ تَفْضِيلاً إِلاَّ لَمْ يُصِبْهُ ذَلِكَ الْبَلاَءُ
"যে ব্যক্তি কোনো বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেখে বলবে: 'আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী 'আফানী মিম্মা-বতালাকা বিহি, ওয়া ফাদ্দালানী 'আলা কাসীরিম মিম্মান খালাকা তাফদীলা' (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে সেই বিপদ থেকে নিরাপদ রেখেছেন, যে বিপদে তোমাকে পরীক্ষা করেছেন; এবং তাঁর সৃষ্ট অনেকের ওপর আমাকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন), তবে সেই বিপদ তার ওপর আসবে না।"
ইমাম তিরমিযী এই হাদীসটিকে হাসান গারীব বলেছেন। ইমাম আলবানী (রহ.) সহীহ তিরমিযীতে একে সহীহ বলেছেন। ইমাম হাকিম এবং ইমাম যাহাবীও এটিকে সহীহ বলেছেন। ইমাম বাযযার এবং ইমাম তাবারানীও এটি বর্ণনা করেছেন।
২. মুসনাদে আহমাদ (হাদীস নং: ৮০৮)-এও এটি বর্ণিত হয়েছে।
কখন ও কীভাবে পড়তে হবে
১. কখন পড়তে হবে:
- যখন কাউকে কোনো রোগ, শারীরিক অক্ষমতা, অন্ধত্ব, পক্ষাঘাত, কুষ্ঠরোগ বা অন্য কোনো বিপদ-আপদ বা পরীক্ষায় আক্রান্ত দেখবেন।
- ইমাম নববী (রহ.) সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যায় বলেছেন: "এই দোয়া পড়া মুস্তাহাব যখন কাউকে কোনো রোগ বা বিপদে আক্রান্ত দেখবে।"
২. কীভাবে পড়তে হবে:
- চুপে চুপে পড়তে হবে যাতে ওই ব্যক্তি শুনতে না পায় বা কষ্ট না পায়।
- ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন: "এই দোয়া পড়া মুস্তাহাব, তবে এমনভাবে যাতে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি তা শুনতে না পায়। কারণ, সে যদি শুনে ফেলে, তবে তার মনে কষ্ট হতে পারে।"
৩. নিজে বিপদগ্রস্ত হলে পড়া যাবে কি?
না, নিজে বিপদগ্রস্ত হলে এই দোয়া পড়া যাবে না। কারণ, এই দোয়ার উদ্দেশ্য হলো অন্যের বিপদ দেখে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা যে, আল্লাহ আমাদেরকে সেই বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন। নিজে বিপদগ্রস্ত হলে এই দোয়ার অর্থই সঠিক হয় না।
তবে নিজে বিপদগ্রস্ত হলে অন্য দোয়া পড়তে পারেন, যেমন:
- إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁরই দিকে ফিরে যাব)
- اللَّهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا (হে আল্লাহ! আমার এই বিপদে আমাকে সওয়াব দিন এবং এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন)
৪. ছাত্র হিসেবে অন্য ছাত্রকে পরীক্ষায় দেখে পড়া যাবে কি?
হ্যাঁ, যাবে। যদি কোনো ছাত্র পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করে বা কোনো সমস্যায় পড়ে, তাকে দেখে এই দোয়া পড়া যাবে। তবে শর্ত হলো:
- তাকে দেখে যেন না শোনানো হয়
- তার প্রতি কোনো প্রকার অবজ্ঞা বা হেয় প্রতিপন্নের মনোভাব না থাকে
- শুধুমাত্র আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের নিয়তে পড়তে হবে
৫. আর কি কি ক্ষেত্রে পড়া যাবে?
এই দোয়া পড়া যাবে যখন কাউকে দেখবেন:
- কোনো রোগে আক্রান্ত (যেমন: ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ইত্যাদি)
- শারীরিক অক্ষমতা (অন্ধত্ব, বধিরতা, পক্ষাঘাত ইত্যাদি)
- মানসিক রোগে আক্রান্ত
- আর্থিক সংকটে নিপতিত
- পারিবারিক সমস্যায় জর্জরিত
- অন্য কোনো বিপদ-আপদে আক্রান্ত
গুরুত্বপূর্ণ নোট
১. এই দোয়া পড়ার সময় বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে কষ্ট না দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। অর্থাৎ, তাকে দেখে যেন না শোনানো হয়।
২. এই দোয়া পড়ার অর্থ এই নয় যে, আমরা বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে ঘৃণা করছি বা তার চেয়ে নিজেকে উত্তম মনে করছি। বরং এটি আল্লাহর রহমতের শুকরিয়া আদায়ের একটি মাধ্যম।
৩. ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন: "এই দোয়া পড়া মুস্তাহাব, কারণ এটি নবী (সা.) থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণিত।"
৪. ইমাম ইবনে কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন: "এই দোয়া পড়লে আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে ঐ বিপদ থেকে রক্ষা করেন, ইনশাআল্লাহ।"
ফিকহী (হানাফী) দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফী মাযহাবের ফিকহের কিতাবসমূহেও এই দোয়ার কথা উল্লেখ আছে। ফাতাওয়া হিন্দিয়া এবং রদ্দুল মুহতার-এ বলা হয়েছে যে, কোনো বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেখে এই দোয়া পড়া মুস্তাহাব।
বাদায়েউস সানায়ে-তে বলা হয়েছে: "কোনো বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেখে এই দোয়া পড়া মুস্তাহাব, যেমনটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।"
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |-------|--------| | দোয়াটি সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত | ✓ | | কখন পড়তে হবে | অন্যকে বিপদে দেখলে | | কীভাবে পড়তে হবে | চুপে চুপে, যাতে সে না শোনে | | নিজে বিপদগ্রস্ত হলে | পড়া যাবে না | | অন্য ছাত্রকে পরীক্ষায় দেখে | পড়া যাবে | | আর কি কি ক্ষেত্রে | রোগ, অক্ষমতা, আর্থিক সংকট, পারিবারিক সমস্যা ইত্যাদি |
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।