ইসলামি পদ্ধতিতে ফ্ল্যাট ভাড়ার চুক্তি
Halal and Haram · Hanafi
Question
https://islamqapro.com/q/2067/islamee-fikhe-flzat-bndhk-rekhe-km-vadaz-thakar-pddhti-jazej-kina এটারই সম্পূরক প্রশ্ন।
যেহেতু ভাইয়েরা ফ্ল্যাটে উঠে গিয়েছে আর ফ্ল্যাটের মালিককে টাকা দেওয়া হয়ে গিয়েছে, আর প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী চুক্তি হয়েছে। ফ্ল্যাটের মূল ভাড়া থেকে কিছু টাকা কম ভাড়া ধরা হয়েছে, আর অন্যান্য বিল কারেন্ট পানি বিল দিবে। আর ৫ বছরের চুক্তি হয়েছে।
যেহেতু ভাই জানতো না, এটা সুদের অন্তর্ভুক্ত আর এই মুহূর্তে সকল টাকা ফেরত নেওয়া সম্ভব না আবার নতুন বাসায় উঠা কষ্টকর। তাই মৌখিকভাবে (পুনঃক্রয়ের শর্তে বিক্রয় (বাই’ বিল ওয়াফা) বা লিজ এন্ড লিজ ব্যাক (Islamic Lease to Own) এর মতো বৈধ ইসলামিক পদ্ধতি ) চুক্তি করলে হবে কিনা? যেহেতু জরিয়ে পড়েছে আর টাকা পুরোটা ফেরত নেওয়া সম্ভব না।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার ভাইদের অবস্থা বুঝতে পারছি। আসলেই এমন পরিস্থিতিতে পড়া কষ্টকর। আসুন আমরা বিষয়টি ইসলামি ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ করি।
প্রশ্নের সংক্ষিপ্তসার
আপনার ভাইয়েরা একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছেন। সেখানে একটি চুক্তি হয়েছে যেখানে মূল ভাড়ার চেয়ে কিছু টাকা কম ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে, কিন্তু বিনিময়ে মালিককে অগ্রিম (জামানত/সিকিউরিটি) হিসেবে একটি বড় অঙ্কের টাকা দেওয়া হয়েছে। ৫ বছরের চুক্তি। এখন তারা জানতে পেরেছেন যে, এই পদ্ধতিটি সুদের (রিবা) অন্তর্ভুক্ত। এখন তারা চান, মৌখিকভাবে চুক্তিটি পরিবর্তন করে বৈধ ইসলামি পদ্ধতি (যেমন: বাই' বিল ওয়াফা বা লিজ এন্ড লিজ ব্যাক) অবলম্বন করতে। কিন্তু পুরো টাকা ফেরত নেওয়া সম্ভব নয়।
ফিকহি বিশ্লেষণ
১. প্রচলিত পদ্ধতির বিধান: আপনি যে পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন—যেখানে ভাড়াটিয়া মালিককে জমা (security deposit) রাখে এবং এর বিনিময়ে মাসিক ভাড়া কমিয়ে দেওয়া হয়—এটি ইসলামি ফিকহে সুদের (রিবা) অন্তর্ভুক্ত। কারণ, এখানে জমাকৃত টাকার বিনিময়ে ভাড়া কমানো হচ্ছে, যা মূলত জমাকৃত অর্থের উপর সুদ প্রদানের একটি রূপ। এটি হারাম।
২. বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয়: যেহেতু চুক্তিটি হয়ে গেছে এবং টাকাও দেওয়া হয়ে গেছে, তাই এখন করণীয় হলো:
- তওবা ও ইস্তিগফার: প্রথমত, আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা।
- চুক্তি সংশোধনের চেষ্টা: যেহেতু আপনি মৌখিকভাবে চুক্তিটি সংশোধন করে বৈধ পদ্ধতিতে রূপান্তরের কথা ভাবছেন, এটি একটি ভালো উদ্যোগ। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু মৌখিকভাবে বললেই হবে না, বরং লিখিতভাবে নতুন একটি চুক্তি করতে হবে এবং পুরনো চুক্তিটি বাতিল করতে হবে।
৩. বৈধ বিকল্প পদ্ধতি: আপনি যে দুটি পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন—বাই' বিল ওয়াফা এবং লিজ এন্ড লিজ ব্যাক—এগুলো ইসলামি ফিকহে বৈধ পদ্ধতি। তবে এগুলোর শর্তাবলী সঠিকভাবে পালন করতে হবে।
- বাই' বিল ওয়াফা (পুনঃক্রয়ের শর্তে বিক্রয়): এই পদ্ধতিতে মালিক ফ্ল্যাটটি আপনার ভাইদের কাছে বিক্রি করে দেবেন এই শর্তে যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (যেমন: ৫ বছর) মালিক টাকা ফেরত দিয়ে ফ্ল্যাটটি ফিরিয়ে নেবেন। এই সময়ের মধ্যে আপনার ভাইয়েরা ফ্ল্যাটের মালিক হবেন এবং তারা চাইলে এটি অন্য কাউকে ভাড়া দিতে পারবেন অথবা নিজেরা ব্যবহার করতে পারবেন। তবে এই পদ্ধতিতে বিক্রয়ের সময় একটি নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ করা জরুরি এবং সেই মূল্য পরিশোধ করতে হবে।
- লিজ এন্ড লিজ ব্যাক (Islamic Lease to Own): এই পদ্ধতিতে মালিক ফ্ল্যাটটি আপনার ভাইদের কাছে বিক্রি করে দেন এবং সাথে সাথে তারা এটি মালিকের কাছ থেকে ভাড়া (lease) নেন। ভাড়ার একটি অংশ প্রতি মাসে জমা হয় এবং নির্দিষ্ট সময় পর ফ্ল্যাটটি আপনার ভাইদের ownership-এ চলে আসে। এই পদ্ধতিতে বিক্রয় এবং ভাড়া চুক্তি দুটি আলাদাভাবে সম্পন্ন করতে হবে এবং ভাড়ার হার বাজার-বহির্ভূত (যেমন: কম) হলে চলবে না।
৪. গুরুত্বপূর্ণ শর্ত:
- লিখিত চুক্তি: নতুন চুক্তিটি অবশ্যই লিখিতভাবে করতে হবে এবং দুইজন সাক্ষী রাখতে হবে।
- সুদের অংশ বাদ: নতুন চুক্তিতে যেন কোনো প্রকার সুদের শর্ত না থাকে।
- মালিকের সম্মতি: মালিককে রাজি করিয়ে নতুন চুক্তি করতে হবে। যদি মালিক রাজি না হন, তাহলে আপনারা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারেন এবং এরপর নতুন করে বৈধ পদ্ধতিতে চুক্তি করতে পারেন।
ফিকহি রেফারেন্স
- সূরা আল-বাকারা (২:২৭৫): "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।"
- সূরা আল-বাকারা (২:২৭৯): "যদি তোমরা তওবা করো, তবে তোমাদের মূলধন তোমরাই পাবে। তোমরা কারো উপর অত্যাচার করবে না এবং তোমাদের উপরও অত্যাচার করা হবে না।"
- হাদিস: হযরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) সুদখোর, সুদদাতা, এর লেখক এবং এর সাক্ষীদের উপর লানত (অভিশাপ) করেছেন। (সহিহ মুসলিম)
- রদ্দুল মুহতার (৫/১৬৩): ইজারা (ভাড়া) চুক্তিতে জমাকৃত অর্থের বিনিময়ে ভাড়া কমানোকে সুদ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
- ফাতাওয়া উসমানি (২/৩৩৫): বাই' বিল ওয়াফা এবং লিজ এন্ড লিজ ব্যাক পদ্ধতিগুলো বৈধ হওয়ার শর্তাবলী বর্ণিত আছে।
উপসংহার ও পরামর্শ
আপনার ভাইদের জন্য মৌখিকভাবে চুক্তি পরিবর্তন করা যথেষ্ট নয়। তাদের উচিত:
১. মালিকের সাথে বসে লিখিতভাবে একটি নতুন বৈধ চুক্তি করা। ২. নতুন চুক্তিতে সুদের কোনো শর্ত রাখা যাবে না। ৩. যদি মালিক রাজি না হন, তাহলে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা এবং এরপর বৈধ পদ্ধতিতে নতুন চুক্তি করা। ৪. তওবা করা এবং ভবিষ্যতে এমন লেনদেন থেকে বিরত থাকা।
আল্লাহ তাওফিক দিন।