তালাকের শর্ত মুখে না বললে কি তালাক হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
প্রিয় হুজুর
প্রশ্ন
আমি একদিন সাইকেল করে বাড়ি ফিরছিলাম সেই সময় কানে আমি আযান শুনতে পাই আজ আমি তখন বলছিল যে আসাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সম্ভবত আমি তখন মুখে উচ্চারণ করে রেখেছি নাকি মনে মনে ভাবনা এসেছিল আমি এখন সেটা মনে করতে পারছি না যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম শুনে যদি দরুদ না পড়ি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম না বলি তাহলে আমার স্ত্রী তালাক হবে। এমন আমি তখন মুখে উচ্চারণ করে বলেছি না মনে মনে বলেছি আমি জানিনা নিশ্চিত হতে পারছি না কিন্তু এতদিন আমি শর্তটা পূরণ করে আসছি। কিন্তু আমার এখন সন্দেহ হচ্ছে যে আমি তখন এটা মুখে উচ্চারণ করেছি কি নাকি আমার মনে মনে এমন উদিত হয়েছে আমি ভয় পেয়ে সত্যটা পূরণ করার চেষ্টা করছিস করে আসছি। তো এখন আমি এর থেকে বাঁচতে চাই তো আমাকে একটু সঠিক পথ দেখান। আর সত্যিই যদি তখন মুখে উচ্চারণ করে এমনটা শর্ত রেখে থাকি এখন যেটা সন্দেহ পরিণত হয়েছে যে মুখে উচ্চারণ করে সত্যটা দেখেছিলাম না মনে মনে এমন উচিত হয়েছিল ভয় পেয়ে সত্যটা পূরণ করে আসছি। তখন যদি সত্যগুলো পূরণ না করি তার জন্য কি তালাক হতে পারে যদি সত্যি আমি তখন মুখে উচ্চারণ করে থাকি দয়া করে জানান। এবং আরো কিছু পয়েন্ট এগুলো আমি নিচে তুলে ধরছি।
এক নম্বর পয়েন্ট
যদি আমি আমায় সত্য মুখে উচ্চারণ করে রেখে থাকি যে নবী সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লামের নাম শুনলে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম না বললে আমার স্ত্রী তালাক হবে এমন মুখে উচ্চারণ করে থাকি কিন্তু আমি ওয়াশরুমে আছি। মানে টয়লেটে রয়েছি। নাপাক অবস্থায় রয়েছি বা এমন অবস্থায় আছি যে আমি উত্তর দিতে পারবো না সেই সময় দিলে গুনাহ এবং এটি বেয়াদবি হবে এই খেতে যদি আমি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম না বলি তাহলে কি তালাক হবে।
দুই নম্বর পয়েন্ট
আর আমি কয়েকবার নাপাক এবং টয়লেটে থাকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছি। এবং বুঝতে পারি যে এটা তো গুনাহ হবে এবং পরে নাপাক এবং টয়লেটে থাকা অবস্থায় বলা বাদ দিই তো এই বাদ দেওয়ার কারণে কি তালাক হবে। প্রথম নাবাবা অবস্থায় টয়লেটে থাকায় সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছি এবং পরে এটাকে বাদ দিয়েছি। গুনাহ হবে তাই হিসাবে তো এটা কি তালাক হবে
তিন নম্বর পয়েন্ট
আমি বলেছি নাম শুনলে মানে নাবী সাল্লাল্লাহু সালামের নাম মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামটা শুনলে বলবো এমনটা ইচ্ছা এবং কারো নামের আগে মোহাম্মদ আছে বা কারো নামের পরে মোহাম্মদ বা কারোর নামের আগে এমডি বসানো আছে সেগুলো দেখলে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বলতে হবে। আর যদি শর্ত রেখে থাকি আমি তো আর এমন করে বলিনি যে সঙ্গে সঙ্গে বলতে হবে হয়তো নামাজে আছি নামে এলো মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ আমি সঙ্গে সঙ্গে হয়তো বলতে পারলাম না পরে বললাম এটা তো আর এর জন্য তো আর তালাক হবে না কারণ আমি তো তখন বলিনি যে সঙ্গে সঙ্গেই বলতে আমি সেই সোনাটাকে উদ্দেশ্য করে পরেও বলতে পারি তো দয়া করে আমাকে জানান আমি জানি আমার প্রশ্নটা একটু জটিল দয়া করে আমাকে সঠিক উত্তর দেন।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত জটিল এবং সংকটপূর্ণ। প্রথমেই আমরা কয়েকটি মূলনীতি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, তারপর আপনার প্রতিটি পয়েন্টের উত্তর দিচ্ছি।
মূলনীতি ১: তালাকের শর্ত (তা'লীক) মুখে উচ্চারণ করলে তা কার্যকর হয়। শুধু মনে মনে সংকল্প করলে বা মনে মনে চিন্তা করলে তালাকের শর্ত কার্যকর হয় না। কেননা মনে মনে চিন্তা করা তালাকের জন্য যথেষ্ট নয়। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৩০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৫০)
মূলনীতি ২: কোনো শর্তের ব্যাপারে সন্দেহ থাকলে (যেমন: মুখে বলেছি কি না) মূলনীতি হলো, যা নিশ্চিত নয় তা ধর্তব্য হবে না। অর্থাৎ, যতক্ষণ না আপনি নিশ্চিত হচ্ছেন যে আপনি মুখে উচ্চারণ করেছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত শর্তটি কার্যকর বলে গণ্য হবে না। (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ১/৬০)
মূলনীতি ৩: নাপাক অবস্থায় বা টয়লেটে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নাম শুনে দরুদ না পড়া গুনাহের কাজ। তবে এই অবস্থায় দরুদ পড়াও অনুচিত। এই অবস্থায় দরুদ না পড়ার কারণে তালাকের শর্ত ভঙ্গ হবে না, যদি শর্তটি এমন না হয় যে, "যেকোনো অবস্থায়ই বলবো"।
এখন আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর:
১. প্রথম প্রশ্ন: আমি মুখে উচ্চারণ করেছিলাম নাকি মনে মনে?
যেহেতু আপনি নিজেই নিশ্চিত নন যে মুখে উচ্চারণ করেছিলেন কি না, তাই ইসলামী নীতিমালা অনুযায়ী, সন্দেহের ভিত্তিতে তালাক কার্যকর হবে না। আপনার স্ত্রীর সাথে আপনার বৈবাহিক সম্পর্ক সঠিক আছে। আপনি যদি মুখে উচ্চারণ করেও থাকেন, কিন্তু এখন সেটা মনে করতে না পারেন, তাহলে সেটা ভুলে যাওয়ার কারণে শর্তটি আর কার্যকর হবে না। কেননা শর্তটি ছিল "নাম শুনলে বলবো", কিন্তু আপনি সেই শর্তটি ভুলে গেছেন, তাই এখন তা পালন করা আপনার জন্য আবশ্যক নয়। তবে আপনি যদি নিশ্চিত হন যে মুখে উচ্চারণ করেছিলেন, তাহলে সেই শর্ত অনুযায়ী আমল করা জরুরি ছিল। কিন্তু এখন যেহেতু সন্দেহ আছে, তাই তালাক কার্যকর হবে না।
২. এক নম্বর পয়েন্ট: টয়লেটে বা নাপাক অবস্থায় নাম শুনলে দরুদ না পড়লে তালাক হবে কি?
না, টয়লেটে বা নাপাক অবস্থায় নাম শুনে দরুদ না পড়ার কারণে তালাক হবে না। কেননা, এই অবস্থায় দরুদ পড়া নিষিদ্ধ (হারাম)। তাই এই অবস্থায় দরুদ না পড়া গুনাহ নয়, বরং দরুদ পড়াই গুনাহ। আপনার শর্তটি যদি এমন হয় যে, "যেকোনো অবস্থায় নাম শুনলে দরুদ পড়বো", তাহলে টয়লেটে থাকা অবস্থায় দরুদ না পড়া শর্ত ভঙ্গ করবে না, কারণ সেখানে দরুদ পড়া বৈধ নয়। বরং আপনি অন্তরে দরুদের নিয়ত করলেই যথেষ্ট হবে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৭)
৩. দুই নম্বর পয়েন্ট: আগে টয়লেটে দরুদ পড়েছি, পরে বাদ দিয়েছি, এতে কি তালাক হবে?
আপনি আগে টয়লেটে দরুদ পড়ে গুনাহ করেছেন, কিন্তু পরে বাদ দিয়েছেন। এটি আপনার জন্য সঠিক কাজ হয়েছে। এই বাদ দেওয়ার কারণে তালাক হবে না। বরং টয়লেটে দরুদ পড়া বন্ধ করাই আপনার কর্তব্য ছিল। তাই এতে কোনো তালাক হবে না।
৪. তিন নম্বর পয়েন্ট: কারো নামের আগে বা পরে "মোহাম্মদ" বা "এমডি" থাকলে কি দরুদ বলতে হবে?
না, শুধুমাত্র কারো নামের সাথে "মোহাম্মদ" বা "এমডি" যুক্ত থাকলে দরুদ পড়া জরুরি নয়। দরুদ পড়া ওয়াজিব তখনই, যখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নাম বা উপাধি (যেমন: রাসূলুল্লাহ, নবী, আহমাদ, মুস্তফা ইত্যাদি) উচ্চারিত হয়। সাধারণ মানুষের নামের অংশ হিসেবে "মোহাম্মদ" থাকলে তা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নাম হিসেবে গণ্য হবে না। তাই সেখানে দরুদ পড়া জরুরি নয়। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৮০)
৫. তিন নম্বর পয়েন্টের শেষ অংশ: সঙ্গে সঙ্গে বলতে না পেরে পরে বলেছি, এতে কি তালাক হবে?
আপনি যদি শর্ত না করে থাকেন যে "সঙ্গে সঙ্গে বলবো", তাহলে পরে বললেও শর্ত পূরণ হয়ে যাবে। আর যদি শর্ত করে থাকেন "সঙ্গে সঙ্গে বলবো", তাহলে নামাজের মতো অবস্থায় বা অন্য কোনো কারণে সঙ্গে সঙ্গে বলতে না পারলে, পরে বললে শর্ত ভঙ্গ হবে না। কেননা, শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, নামাজে থাকা অবস্থায় দরুদ পড়া যাবে না, তাই নামাজ শেষে পড়লেই শর্ত পূরণ হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৬০)
সারসংক্ষেপ:
১. আপনার স্ত্রীর সাথে আপনার বৈবাহিক সম্পর্ক সঠিক আছে। সন্দেহের কারণে তালাক হবে না। ২. টয়লেটে বা নাপাক অবস্থায় দরুদ না পড়ার কারণে তালাক হবে না। ৩. টয়লেটে দরুদ পড়া বন্ধ করার কারণে তালাক হবে না। ৪. সাধারণ মানুষের নামের সাথে "মোহাম্মদ" থাকলে দরুদ পড়া জরুরি নয়। ৫. সঙ্গে সঙ্গে বলতে না পারলে পরে বললেই শর্ত পূরণ হবে।
আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন এবং এই ওয়াসওয়াসা (শয়তানি প্ররোচনা) থেকে নিজেকে মুক্ত রাখুন। শয়তান মানুষকে এভাবে তালাকের ভয় দেখিয়ে সংসার ভাঙার চেষ্টা করে। আপনি তওবা করুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আপনার স্ত্রী আপনার জন্য হালাল এবং বৈধ।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।