বাবা মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে উদাসীন, মেয়ে যদি পরিবারের অন্যান্যদেরকে সাথে নিয়ে বিয়ে করে , তাহলে কি বিয়ে শুদ্ধ হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
পরিচিত এক মেয়ে, বয়স ২৪ পার হয়েছে৷ অনার্স চতুর্থ বর্ষে পড়ে। কিন্তু বাবা মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে উদাসীন। মেয়ের দাদা, চাচা৷ মা, বোন ইত্যাদি বলার পরেও গায়ে লাগায় না। মেয়ে এক ছেলেকে পছন্দ করেছে বাসায় জানাইছে কিন্তু বাবা ছেলের আর্থিক দিক দেখে নাকোচ করে দিয়েছে। মেয়ের বাসায় সবাই রাজি। শুধু পিতা ব্যতীত। মেয়ের বাবা যেকোনো প্রস্তাব আসলেই কোনো না কোনো কারন দেখিয়ে এভাবে বাতিল করে দেন। মেয়ে তার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে৷ বাবাকে না জানিয়ে বাকীদের জানিয়ে ছেলের বাসায় বিয়ে করেছে৷ বাবা পরে মেনে নেয়নি। বিয়ে কি হয়েছে? সব সময় তো বাবার ভরসায় বসে থাকা যাবে না। বাবা তো এভাবে মেয়ের ভবিষ্যত নষ্ট করছে। ক্ষেত্রবিশেষে তো মাসআলা পরিবর্তন হয়৷ জানাবেন ইনশাআল্লাহ।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। ইসলামী আইনে (ফিকহ) একটি মেয়ের বয়স ২৪ বছর হলে সে প্রাপ্তবয়স্ক (বালিগা) এবং জ্ঞান-বিবেচনার অধিকারী। এই অবস্থায় তার বিয়ের জন্য পিতার অনুমতি জরুরি কি না, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। যেহেতু প্রশ্নকারী হানাফি মাযহাব অনুসরণ করেন, তাই আমরা হানাফি ফিকহের আলোকে উত্তর দেব।
হানাফি মাযহাবের মূলনীতি:
হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত (মুফতা বিহি) অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক (বালিগা) ও জ্ঞানবতী মেয়ে নিজের বিয়ে নিজে সম্পাদন করতে পারে। তবে ইসলামী আদব ও সামাজিক শিষ্টাচার হলো, পিতার (বা অভিভাবকের) অনুমতি ও পরামর্শ নেওয়া। কিন্তু পিতা যদি অন্যায়ভাবে বিয়েতে বাধা দেন এবং কোনো শরয়ী (আইনগত) কারণ ছাড়াই মেয়ের ভালো প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে মেয়ে তার পিতার অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে তা সহীহ (শুদ্ধ) হবে।
দলিল ও উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ:
১. কিতাবুল আসল (ইমাম মুহাম্মদ) এবং আল-হিদায়াহ-তে উল্লেখ আছে:
"المرأة البالغة العاقلة إذا زوجت نفسها من رجل كفء جاز ذلك" অর্থ: "প্রাপ্তবয়স্ক ও জ্ঞানবতী নারী যদি নিজেকে কোনো কুফু (সমান-সামর্থ্যবান) পুরুষের সাথে বিয়ে দেয়, তবে তা জায়েয (বৈধ) হবে।"
২. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) -এ বলা হয়েছে:
"ولو زوجت نفسها من كفء صح عند أبي حنيفة وأبي يوسف" অর্থ: "যদি কোনো নারী নিজেকে কুফু (সমান-সামর্থ্যবান) পুরুষের সাথে বিয়ে দেয়, তবে ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবু ইউসুফের মতে তা সহীহ (শুদ্ধ) হবে।"
৩. ফাতাওয়া আলমগীরী (ফাতাওয়া হিন্দিয়া) -এ উল্লেখ আছে:
"البالغة العاقلة إذا زوجت نفسها من كفء جاز، وإن كان بغير إذن الولي" অর্থ: "প্রাপ্তবয়স্ক ও জ্ঞানবতী নারী যদি নিজেকে কুফু (সমান-সামর্থ্যবান) পুরুষের সাথে বিয়ে দেয়, তবে তা জায়েয, যদিও তা অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া হয়।"
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে মাসআলা:
১. মেয়েটির বয়স ২৪ বছর, সে প্রাপ্তবয়স্ক ও জ্ঞানবতী। তাই সে নিজে বিয়ে করার আইনগত অধিকার রাখে। ২. মেয়েটি একজন ভালো ছেলেকে পছন্দ করেছে এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা (দাদা, চাচা, মা, বোন) রাজি আছেন। কিন্তু পিতা কোনো শরয়ী কারণ ছাড়াই (যেমন: ধর্মপরায়ণতা, চরিত্র, কুফু ইত্যাদি) শুধুমাত্র আর্থিক দিক দেখে বা অন্য কোনো অজুহাতে প্রস্তাব বাতিল করছেন। এটি পিতার পক্ষ থেকে জুলুম (অন্যায়)। ৩. যেহেতু পিতা অন্যায়ভাবে বাধা দিচ্ছেন এবং মেয়ের ভালো প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছেন, তাই মেয়ে পিতার অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী বিয়ে সহীহ (শুদ্ধ) হবে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত:
- বিয়েটি দুইজন পুরুষ সাক্ষী বা একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা সাক্ষী এর উপস্থিতিতে হতে হবে।
- ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুল (গ্রহণ) একই মজলিসে (সভায়) সম্পন্ন হতে হবে।
- বর (ছেলে) এবং কনে (মেয়ে) উভয়ের সম্মতি থাকতে হবে।
- বর হতে হবে কুফু (সমান-সামর্থ্যবান)। অর্থাৎ ধর্ম, চরিত্র ও সামাজিক মর্যাদায় মেয়ের উপযুক্ত।
পিতার আপত্তি ও তার পরিণতি:
পিতা যদি পরে মেয়ের বিয়ে মেনে না নেন, তবুও বিয়েটি বৈধ থাকবে। তবে মেয়ের উচিত পিতার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাকে বোঝানোর চেষ্টা করা। পিতা যদি অন্যায়ভাবে বাধা দেন, তবে সন্তানের জন্য পিতার অবাধ্য হওয়া জায়েয আছে, যদি তা শরয়ী কোনো কাজের জন্য হয়। কিন্তু পিতার সাথে দুর্ব্যবহার করা বা সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েয নয়। তবে কুফু মিলে না থাকলে বাবার অনুমতির উপর বিয়ে মওকুফ থাকবে, বাবা অনুমতি না দিলে বিয়ে বিশুদ্ধ হবে না।
মাসআলা পরিবর্তনের প্রসঙ্গ:
আপনি বলেছেন, "ক্ষেত্রবিশেষে মাসআলা পরিবর্তন হয়।" এটি সঠিক। ইসলামী ফিকহে সময়, স্থান ও পরিস্থিতি অনুযায়ী মাসআলা পরিবর্তিত হয়। এখানেও পিতার অন্যায় আচরণের কারণে মেয়ে পিতার অনুমতি ছাড়া বিয়ে করার অনুমতি পেয়েছে। এটি হানাফি ফিকহের একটি সুস্পষ্ট বিধান।
উপসংহার:
প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতিতে, মেয়েটির বিয়ে সহীহ (শুদ্ধ) হয়েছে। তবে শর্ত হলো, বিয়েটি সাক্ষীসহ সম্পন্ন হয়েছে এবং বর কুফু (সমান-সামর্থ্যবান)। পিতার অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও বিয়েটি বৈধ। মেয়ের উচিত পিতার সাথে সম্পর্ক ভালো রাখা এবং তাকে বোঝানোর চেষ্টা করা। পিতা যদি না-ও মানেন, তবুও বিয়ে ভেঙে যাবে না।
আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে ভালো জানেন।