শর্ত যুক্ত তালাক গুগল ব্রাউজারে সার্চ করার পর হিস্টোরিতে থেকে গেলে কি তালাক হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
প্রিয় হুজুর
প্রশ্ন,
আমি একদিন google chrome ব্রাউজারে কিছু সার্চ করছিলাম। সেই সময় আমি এমন শর্ত যুক্ত তালাক দিয়েছি যে আমি গুগল ব্রাউজারে সার্চ বারে যা সার্চ করব সার্চ বার থেকে যদি ডিলিট না করি তাহলে আমার স্ত্রীর উপর তালাক হবে। ( মানে ইচ্ছা করে না ডিলিট করলে) কিন্তু তখন শুধু এটাই বলেছি যে যদি ডিলিট না করি তালাক হবে তখন এটা বলিনি ভুল করেও যদি না করি তাহলেও তালাক হবে কিন্তু আমার ইচ্ছা যেমন ছিল যেমন ইচ্ছা করে করে যদি না করি তখন তখন তালাক হবে এরপর একদিন এরকম ডিলিট করেছি বাট সেটি ডিলিট হয়নি। কোন টেকনিক্যাল ফোল্ডের কারণে। কিন্তু সেই সময় দেখা গেছে যে সেটি ডিলিট হয়েছে এবং আমি জানি সেটা ডিলিট করে দিয়েছি কিন্তু পরে আবার সাজবারে সেই লেখাটি শো হয়। এটা কি তালাক হবে? আমার তো এটাই ইচ্ছা ছিল যে আমি ইচ্ছা করে যদি না ডিলিট করি দয়া করে আমাকে জানান আর সন্দেহ আছে যে আমি এমন সত্য মুখে উচ্চারণ করে রেখেছি নাকি আমার মনে মনে এটা চিন্তায় এসেছে বা এমন ভাবনা আছে তাই ভয়ের কারণে আমি এটা করছি। দয়া করে আমাকে সঠিক উত্তর দেন
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আপনার প্রশ্নটি মনোযোগ সহকারে পড়েছি। আপনার পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আমি নিম্নোক্তভাবে উত্তর দিচ্ছি:
মূলনীতি
ইসলামী আইন অনুযায়ী, তালাকের ক্ষেত্রে উচ্চারণ বা ঘোষণা অপরিহার্য। শুধুমাত্র মনে মনে চিন্তা করা বা ভাবনা পোষণ করলে তালাক পতিত হয় না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ" "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের মনে মনে যা খেয়াল করে, তা ক্ষমা করে দেন, যতক্ষণ না সে তা কাজে পরিণত করে বা মুখে উচ্চারণ করে।" (সহীহ বুখারী: ২৫২৮, সহীহ মুসলিম: ১২৭)
আপনার প্রশ্নের বিশ্লেষণ
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী: ১. আপনি শর্তযুক্ত তালাক দিয়েছেন — "যদি সার্চ বার থেকে ডিলিট না করি তাহলে তালাক হবে" — এটি একটি শর্তযুক্ত তালাক (তালাক মু'আল্লাক)। ২. আপনি বলেছেন যে আপনার ইচ্ছা ছিল — ইচ্ছা করে যদি না ডিলিট করেন তাহলে তালাক হবে। কিন্তু আপনি ভুলক্রমে না ডিলিট করার বিষয়ে শর্তটি বলেননি। ৩. আপনি ডিলিট করেছিলেন কিন্তু টেকনিক্যাল কারণে সেটি ডিলিট হয়নি, পরে আবার দেখা গেছে।
হানাফী ফিকহের আলোকে বিধান
হানাফী মাযহাবের নীতিমালা অনুযায়ী:
১. শর্তযুক্ত তালাকের ক্ষেত্রে: যদি শর্ত পূরণ হয়, তবে তালাক পতিত হয়। কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো — আপনার নিয়ত বা ইচ্ছা ছিল শুধুমাত্র ইচ্ছাকৃতভাবে না ডিলিট করলে তালাক হবে। আপনি যখন ডিলিট করার চেষ্টা করেছিলেন, তখন আপনার ইচ্ছা ছিল ডিলিট করা। টেকনিক্যাল কারণে ডিলিট না হওয়া আপনার ইচ্ছার বাইরে ছিল।
২. ইচ্ছা ও নিয়তের গুরুত্ব: হানাফী ফিকহে তালাকের ক্ষেত্রে নিয়তের গুরুত্ব রয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর মতে, শর্তযুক্ত তালাকে শর্ত পূরণের মাধ্যমে তালাক পতিত হয়। কিন্তু যদি প্রমাণিত হয় যে শর্ত পূরণ হওয়ার ঘটনাটি আপনার ইচ্ছার বাইরে ঘটেছে এবং আপনি তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছেন, তাহলে সেটি আপনার ইচ্ছাকৃত শর্ত পূরণ হিসেবে গণ্য হবে না।
৩. সন্দেহের ক্ষেত্রে: ফিকহের নীতি হলো — "اليقين لا يزول بالشك" (সন্দেহ দ্বারা নিশ্চিত বিষয় বিনষ্ট হয় না)। অর্থাৎ, বিবাহের সম্পর্ক নিশ্চিতভাবে বিদ্যমান ছিল, তাই সন্দেহের কারণে তালাক পতিত হওয়া যাবে না।
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর নীতি
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর মতে, তালাকের ক্ষেত্রে স্পষ্ট উচ্চারণ অপরিহার্য। আপনি নিজেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে আপনি মুখে উচ্চারণ করেছেন কিনা নাকি মনে মনে চিন্তা করেছেন। যদি আপনি নিশ্চিত না হন যে আপনি মুখে উচ্চারণ করেছেন, তাহলে তালাক পতিত হবে না।
ফাতওয়া
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী: ১. আপনি ডিলিট করার চেষ্টা করেছিলেন — এটি প্রমাণ করে আপনার ইচ্ছা ছিল ডিলিট করা, না ডিলিট করার নয়। ২. টেকনিক্যাল কারণে ডিলিট না হওয়া আপনার ইচ্ছার বাইরে ঘটেছে। ৩. আপনি নিজেই সন্দেহে আছেন যে মুখে উচ্চারণ করেছেন কিনা। সুতরাং, আমাদের মতে, আপনার স্ত্রীর উপর তালাক পতিত হয়নি। আপনার বিবাহ বৈধ রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ
১. ভবিষ্যতে এ ধরনের শর্তযুক্ত তালাকের বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকুন। তালাকের কথা খেলার ছলে বা শর্তসাপেক্ষে উচ্চারণ করাও মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ২. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"তিনটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে করলে তা বাস্তবায়িত হয় এবং ঠাট্টা-তামাশা করলেও তা বাস্তবায়িত হয়: বিবাহ, তালাক এবং রাজ'আত (স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া)।" (আবু দাউদ: ২১৯৪, তিরমিযী: ১১৮৪) ৩. তালাকের বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকলে দেরি না করে স্থানীয় মুফতির কাছে সরাসরি উপস্থিত হয়ে বিস্তারিত জানান।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।