শর্তযুক্ত তালাকের ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃতভাবে শর্ত ভঙ্গ হলে তালাক পতিত হবে কি না?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
প্রিয় হুজুর
আমার একটা ছোট্ট প্রশ্ন শর্ত যুক্ত তালাকের ক্ষেত্রে যদি সেটি ভঙ্গ হয় অনিচ্ছাকৃতভাবে ইচ্ছাকৃতভাবে নয় তাহলে কি তালাক হবে। যখন সত্য দেয়া হয় তখন শুধু বলা হয়েছিল যে এইটা না করলে তালাক হবে কিন্তু সেই সময় এটা বলেনি যে সেটা অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়ে গেলেও তালাক হবে কিন্তু এখন ওয়াসা হচ্ছে যে এটা তো ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়নি অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়েছে কিন্তু তখন যখন শর্ত দেওয়া হয় তখন তো আর এটা ভেবে বলা হয়নি বা এটা মুখে উচ্চারণ করে বলা হয়নি যে অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও সেটি তালাক হবে তো ইচ্ছা থাকাটা কি জরুরী। ইচ্ছার বিরুদ্ধে যদি কিছু হয়ে যায় সেটা কি তালাক হবে কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে যে এটাতে ইচ্ছাকৃতভাবে করিনি অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়েছে তো দয়া করে জানান এতে কি তালাক হবে।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটি শর্তযুক্ত তালাক (তালিকে মু'আল্লাক) সংক্রান্ত। ইসলামি ফিকহের (বিশেষত হানাফি মাযহাবের) আলোকে এর বিস্তারিত হুকুম নিম্নরূপ:
১. শর্তযুক্ত তালাকের মূলনীতি: যখন কেউ বলে, "যদি তুমি অমুক কাজ করো, তাহলে তোমার উপর তালাক" — তখন এটি একটি শর্তযুক্ত তালাক। এই শর্ত পূরণ হওয়া মাত্রই তালাক পতিত হয়ে যায়। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৬৪; ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৩৭৩)
২. ইচ্ছা থাকা জরুরি কি না: শর্তযুক্ত তালাকে শর্ত পূরণের সময় তালাকের ইচ্ছা থাকা জরুরি নয়। বরং শর্ত পূরণ হওয়া মাত্রই তালাক পতিত হয়ে যায়, চাই তা ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত, ভুলে হোক বা ভুলবশত। কেননা, শর্ত দেওয়ার সময়ই তালাকের ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়েছে এবং সেটি কার্যকর করার জন্য শর্ত পূরণই যথেষ্ট। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪০২; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪৩৫)
৩. অনিচ্ছাকৃতভাবে শর্ত ভঙ্গ হলে: যদি কেউ শর্ত দেয়, "অমুক কাজ করলে তালাক" — এবং সেই কাজটি অনিচ্ছাকৃতভাবে বা ভুলে হয়ে যায়, তবুও হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মতানুযায়ী তালাক পতিত হয়ে যাবে। কারণ, শর্ত পূরণ হয়ে গেছে। শর্ত পূরণের সময় তালাকের নিয়ত বা ইচ্ছা থাকা শর্ত নয়। (আল-হিদায়া, ২/৩৮০; ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৩৭৪)
৪. কুরআন ও হাদিসের আলোকে:
- কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমরা নিজেদেরকে তালাকের শপথ থেকে রক্ষা করো না।" (সূরা আত-তাহরিম: ১-২) — অর্থাৎ তালাকের শর্ত দেওয়ার পর তা পূরণ হলে তালাক কার্যকর হবে।
- হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তিনটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে করলে তা কার্যকর হয়, আর ঠাট্টা করে করলেও তা কার্যকর হয়: তালাক, বিবাহ এবং রুজু (স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া)।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৯৪; সুনানে তিরমিজি: ১১৮৪) — এই হাদিস প্রমাণ করে যে, তালাকের ক্ষেত্রে ইচ্ছা বা গুরুত্ব না থাকলেও তা পতিত হয়।
৫. আপনার প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর: আপনি বলেছেন, শর্ত দেওয়ার সময় বলা হয়েছিল "এইটা না করলে তালাক হবে" — কিন্তু বলা হয়নি যে "অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও তালাক হবে"। এখন সেই কাজটি অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়ে গেছে।
হানাফি ফিকহের নিয়মানুযায়ী, এই ক্ষেত্রে তালাক পতিত হয়ে যাবে। কারণ:
- শর্ত দেওয়ার সময় তালাকের ইচ্ছা ছিল (কারণ তিনি শর্ত দিয়েছেন)।
- শর্ত পূরণ হয়েছে (কাজটি হয়ে গেছে)।
- শর্ত পূরণের সময় তালাকের নিয়ত থাকা জরুরি নয় — এটি পূর্বের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে।
তবে, যদি আপনি নিশ্চিতভাবে জানেন যে, কাজটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত এবং আপনার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না (যেমন জোরপূর্বক বা অসুস্থতার কারণে), তবুও হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী তালাক পতিত হবে। কেননা, শর্ত পূরণের পর তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য ইচ্ছা শর্ত নয়।
৬. গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:
- এই বিষয়ে বিভ্রান্তি বা সংশয় থাকলে, আপনার এলাকার কোনো বিশ্বস্ত মুফতি বা আলেমের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করুন। কারণ, তালাক একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয় এবং এর পরিণতি সুদূরপ্রসারী।
- ভবিষ্যতে শর্তযুক্ত তালাক দেওয়ার সময় অত্যন্ত সতর্ক থাকুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি তালাকের শপথ করে, সে যেন আল্লাহর কিতাবের উপর আমল করে।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৯৫)
রেফারেন্স সমূহ:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ৩/২৬৪-২৬৫
- ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৩৭৩-৩৭৪
- আল-হিদায়া, ২/৩৮০
- ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪০২
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪৩৫
- সুনানে আবু দাউদ: ২১৯৪; সুনানে তিরমিজি: ১১৮৪
উপসংহার: শর্তযুক্ত তালাকে শর্ত পূরণ হলে তালাক পতিত হয়, চাই তা ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত। ইচ্ছা থাকা জরুরি নয়। তাই আপনার ক্ষেত্রে, শর্ত পূরণ হওয়ায় তালাক পতিত হয়ে গেছে বলে সিদ্ধান্ত। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।