জবরদস্তির শিকার হয়ে ৩ তালাক দিলে কয় তালাক পতিত হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
মুফতি সাহেবের কাছে আমার জানার বিষয় হলো এখানে কয় তালাক পতিত হয়েছে।
বি.দ্র. স্বামী হানাফি মাযহাবের অনুসারী এবং স্ত্রী লা মাযহাবী।
Answer
তালাক সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন: প্রথম স্ত্রীর অজান্তে স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করে। পরবর্তীতে প্রথম স্ত্রী জানার পর দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দিতে বাধ্য করে। স্বামী প্রথমে এক তালাক দিতে চেয়েছিলো, কিন্তু চাপের কারণে ওই মুহূর্তে দ্বিতীয় স্ত্রীকে একসাথে তিন তালাক দিতে বাধ্য হয়। এখানে কয় তালাক পতিত হয়েছে?
উত্তর
হানাফি মাযহাব মতে, একসাথে তিন তালাক দেওয়া হলে তিনটিই পতিত হয়।
তবে আপনার প্রশ্নের বিশেষ দিকটি হলো—স্বামী চাপের কারণে তিন তালাক দিতে বাধ্য হয়েছে। ইসলামি ফিকহে জবরদস্তি (ইকরাহ) এর ক্ষেত্রে কিছু বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
জবরদস্তির (ইকরাহ) শর্তাবলী:
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, জবরদস্তির কারণে তালাক পতিত না হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত শর্তগুলো থাকতে হবে:
- প্রাণনাশের ভয় - যে জবরদস্তি করা হচ্ছে তার দ্বারা প্রাণহানির আশঙ্কা থাকতে হবে
- অঙ্গহানির ভয় - শরীরের কোনো অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা
- মারাত্মক প্রহার - এমন প্রহার যা সহ্য করা কঠিন
যদি শুধুমাত্র মানসিক চাপ বা কথার চাপ থাকে, তবে তা ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় "ইকরাহ" (জবরদস্তি) হিসেবে গণ্য হবে না।
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর মত:
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর মতে, জবরদস্তির শিকার হয়ে তালাক দিলে তা পতিত হয় না, তবে শর্ত হলো—
- জবরদস্তি এমন হতে হবে যা সত্যিই ভয়ংকর
- প্রাণনাশ বা অঙ্গহানির আশঙ্কা থাকতে হবে
ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)-এর মত:
তাঁদের মতে, জবরদস্তির কারণে তালাক পতিত হয় না, তবে শর্ত হলো—
- জবরদস্তি কারী এমন ব্যক্তি হতে হবে যার আদেশ অমান্য করা কঠিন (যেমন: শাসক, জালিম শাসক)
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ:
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- প্রথম স্ত্রী দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দিতে বাধ্য করেছে
- স্বামী প্রথমে এক তালাক দিতে চেয়েছিল
- চাপের কারণে তিন তালাক দিতে বাধ্য হয়েছে
এখানে লক্ষণীয় যে, স্ত্রীর চাপ সাধারণত ইসলামি ফিকহের "ইকরাহ" (জবরদস্তি) এর পর্যায়ে পড়ে না। স্ত্রীর মানসিক চাপ, অনুরোধ, বা এমনকি হুমকিও সাধারণত তালাক পতিত হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে না, যদি না তা প্রাণনাশের পর্যায়ে পৌঁছে।
তবে যদি স্ত্রী এমন হুমকি দেয় যা সত্যিই প্রাণনাশের আশঙ্কা সৃষ্টি করে (যেমন: মারার হুমকি, অস্ত্র দেখানো ইত্যাদি), তাহলে সেটি ইকরাহ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে, সাধারণ অবস্থায় (যেখানে প্রাণনাশের আশঙ্কা নেই) একসাথে তিন তালাক দেওয়া হলে তিনটিই পতিত হবে। দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে বিবাহবন্ধন সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয়ে যাবে এবং তা আর ফিরিয়ে আনা যাবে না (বাইন তালাক)।
তবে যদি সত্যিই প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকে (যেমন: মারাত্মক হুমকি, অস্ত্রের ভয়), তাহলে বিষয়টি ভিন্ন।
দলিল:
কুরআন: "তালাক দুইবার। এরপর হয় ভালোভাবে রাখা অথবা সৌজন্যের সাথে বিদায় দেওয়া।" (সূরা বাকারা: ২২৯)
হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "তিনটি বিষয় গুরুতর, তার মধ্যে হাসি-ঠাট্টাও গুরুতর হিসেবে গণ্য হবে: বিবাহ, তালাক এবং রাজি হওয়া।" (তিরমিজি, আবু দাউদ)
ফাতাওয়া উসমানি: মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি দামাত বারাকাতুহুম তাঁর ফাতাওয়ায় উল্লেখ করেছেন যে, এক মজলিসে তিন তালাক দিলে তিনটিই পতিত হয় এবং তা বাইন তালাক হিসেবে গণ্য হয়।
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): এতে উল্লেখ আছে যে, জবরদস্তির কারণে তালাক পতিত না হওয়ার জন্য প্রাণনাশ বা অঙ্গহানির আশঙ্কা থাকতে হবে। শুধুমাত্র মানসিক চাপ বা কথার চাপ ইকরাহ হিসেবে গণ্য নয়।