শর্তযুক্ত তালাক, পূর্বের তালাক এবং কাজীর কাগজে তারিখ পরিবর্তনের পর আমার তালাক হয়েছে কি না এবং কীভাবে শরয়ীভাবে মুক্ত হতে পারি

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 3827
Questioner: Umme Ahmad
Question Asked: 11 Aug 2026, 09:02 PM
Reviewed & Published: 11 Aug 2026, 09:18 PM
Views: 8
Tokens: 21,005
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

সম্মানিত শায়েখ,

আমার বিয়ের আজ চার মাস দুই দিন। আমার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈবাহিক বিষয়ের শরয়ী সমাধান জানতে চাই। দয়া করে কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত জানাবেন।

আমার বিয়ের প্রায় দুই মাস চলাকালীন আমি জানতে পারি যে, আমার স্বামীর পূর্বে একজন স্ত্রী এবং একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। তখন তার পূর্বের স্ত্রী ৭–৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। বিয়ের আগে আমাকে তার পূর্বের স্ত্রী, সন্তান ও পারিবারিক অবস্থা সম্পর্কে কিছুই জানানো হয়নি।

বরং আমাকে বলা হয়েছিল, তিনি ইয়াতিম, তার মা-বাবা মারা গেছেন এবং তার কেউ নেই। তার সৎ বোনেরা নাকি বলেছেন, তিনি তাদের বাড়িতে গেলে পারিবারিক অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে—এ ধরনের বিভিন্ন কথা আমাকে বলা হয়েছিল।

আমি যদি আগে জানতাম যে তার পূর্বের স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে, তাহলে আমি কখনো এই বিয়েতে রাজি হতাম না।

আমি বিষয়টি জানার পর আমার স্বামীকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, তিনি নাকি ফিতনায় জড়িয়ে যাচ্ছিলেন এবং হারামে লিপ্ত হয়ে যাচ্ছিলেন। হারাম থেকে বাঁচার জন্যই তিনি এভাবে বিয়ে করেছেন। তিনি আমার কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন।

এরপর তার পূর্বের স্ত্রী গত প্রায় দুই মাস ধরে বিভিন্ন ধরনের মানসিক অস্থিরতা ও অসুস্থ আচরণ করেছেন। তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করার কথা বলেছেন, না খেয়ে থাকার কারণে গর্ভের সন্তানের ওজনও কমে গিয়েছিল বলে জানা যায়। আমাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকিও দিয়েছেন। তার চাপের কারণে আমার স্বামী আমাকে এক তালাক দিয়েছিলেন। পরে মাসআলা জেনে আমার স্বামী আমাকে আবার ফিরিয়ে নেন এবং আমিও তা মেনে নিই।

এরপরও তার পূর্বের স্ত্রী বিভিন্নভাবে চাপ দিতে থাকেন এবং এমনকি নিজের মাথায় আঘাত করেছেন। তার মূল দাবি ছিল—আমি যেন আমার স্বামীর জীবনে না থাকি এবং তাকে তালাক দিয়ে দিই। কিন্তু আমার স্বামী আমাকে তালাকের অধিকার (তাফওয়ীয) দেননি। তার পূর্বের স্ত্রীও বলেছেন যে, তিনি তার স্বামীর পাশে অন্য কোনো নারীকে সহ্য করতে পারবেন না।

আমার স্বামী বর্তমানে আমাকে তালাক দিতে চান না। কিন্তু আমি এই বৈবাহিক সম্পর্ক আর রাখতে চাই না এবং তার কাছ থেকে শরয়ীভাবে মুক্ত হতে চাই।

শর্তযুক্ত তালাকের বিষয়

আমার স্বামী তার পূর্বের স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন:

> “আমি সালমাকে এই শর্তে তালাক দিচ্ছি যে, এর পর থেকে তোমাকে যত তালাক দেব, সেটা ওর উপরেও পতিত হবে।”



এই কথার শরয়ী হুকুম কী?

এরপর ২০২৬ সালের ৩ জুলাই আমার স্বামী আমাকে এক তালাক দিয়েছিলেন। এই তালাকটি তার পূর্বের স্ত্রী জোর করে দেওয়ানোর কারণে হয়েছিল। সেই তালাকের কাগজে আমি কোনো স্বাক্ষর করিনি এবং সেই কাগজ আমার কাছেও পাঠানো হয়নি। পরে আমার স্বামী আমাকে ফিরিয়ে নেন।

বর্তমানে খোলা/তালাক নেওয়ার চেষ্টা

এখন আমি আর এই সংসারে থাকতে চাই না। আমি কাজীর কাছে গিয়ে খোলা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমার স্বামী খোলা দিতে রাজি নন। তিনি আমাকে কোনোভাবেই তালাক দিতেও রাজি হচ্ছেন না।

পরবর্তীতে কাজীর কাছে বিষয়টি নিয়ে অনেক ঝামেলা হওয়ার পর আমার স্বামীকে বলা হয়, খোলা না দিয়ে দ্বিতীয় তালাক দিতে। কাজী সেই অনুযায়ী কাগজও তৈরি করেন। কিন্তু পরে আমার স্বামী সেই কাগজে স্বাক্ষর করতে রাজি হননি।

এরপর কাজী বলেন, যেহেতু আগের তালাকের কাগজে আমার স্বামীর স্বাক্ষর রয়েছে, কিন্তু আমি সেই কাগজে স্বাক্ষর করিনি এবং কাগজটি আমার কাছেও দেওয়া হয়নি, তাই ওই কাগজের তারিখ পরিবর্তন করে বর্তমান তারিখে তালাকের কাগজ করা যাবে।

এরপর আগের কাগজের তারিখ পরিবর্তন করে আমার নামে তালাকের কাগজ তৈরি করা হয় এবং সেখানে আমি স্বাক্ষরও করেছি।

আমার মূল প্রশ্নগুলো:

১. আমার স্বামী যে লিখেছেন—

> “আমি সালমাকে এই শর্তে তালাক দিচ্ছি যে, এর পর থেকে তোমাকে যত তালাক দেব, সেটা ওর উপরেও পতিত হবে।”



এই শর্তযুক্ত তালাকের কারণে পরবর্তীতে আমাকে যে তালাক দেওয়া হয়েছে, তা কি আমার ওপরও পতিত হয়েছে? হানাফি ফিকহ অনুযায়ী এর সঠিক হুকুম কী?

২. ৩ জুলাই আমার স্বামী আমাকে যে এক তালাক দিয়েছিলেন, সেটি যেহেতু আমি স্বাক্ষর করিনি এবং কাগজটি আমার কাছে দেওয়াও হয়নি—তবুও কি সেই তালাক শরয়ীভাবে সংঘটিত হয়েছিল?

৩. সেই তালাকের পর আমার স্বামী আমাকে ফিরিয়ে নিয়েছেন এবং আমিও তা মেনে নিয়েছি। এতে কি রুজু সহীহ হয়েছে?

৪. পরবর্তীতে কাজীর কাছে আগের তালাকের কাগজের তারিখ পরিবর্তন করে নতুন তারিখে আমার নামে তালাকের কাগজ করা হয় এবং আমি তাতে স্বাক্ষর করি। কিন্তু আমার স্বামী নতুন করে সেই কাগজে স্বাক্ষর করেননি। এ অবস্থায় শরয়ীভাবে কি আমার তালাক সংঘটিত হয়েছে?

৫. শুধু কাজী কাগজ তৈরি করা এবং আমি তাতে স্বাক্ষর করার কারণে কি তালাক হয়ে যায়, যদি স্বামী নতুন করে সেই কাগজে স্বাক্ষর না করেন বা নতুন করে তালাকের ঘোষণা না দেন?

৬. আগের তালাকের কাগজের তারিখ পরিবর্তন করে নতুন তারিখ বসানো—এভাবে করা কাগজের শরয়ী কোনো মূল্য আছে কি?

৭. বর্তমানে আমি আমার স্বামীর সঙ্গে আর সংসার করতে চাই না। তিনি আমাকে তালাক দিতে চান না এবং খোলাতেও রাজি নন। এ অবস্থায় হানাফি মাজহাব অনুযায়ী আমি কীভাবে শরয়ীভাবে তার কাছ থেকে মুক্ত হতে পারি?

৮. আমার ক্ষেত্রে খোলা, ফাসখে নিকাহ, অথবা অন্য কোনো শরয়ী পদ্ধতির মাধ্যমে বিচ্ছেদ নেওয়ার সুযোগ আছে কি? থাকলে কীভাবে তা করতে হবে?

৯. স্বামীর বিয়ের আগে তার পূর্বের স্ত্রী ও সন্তান থাকার বিষয়টি গোপন করা, আমাকে ভুল তথ্য দেওয়া এবং পরবর্তীতে আমাকে বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়ার বিষয়গুলো কি আমার জন্য ফাসখের কারণ হতে পারে?

১০. সবশেষে, এই মুহূর্তে আমি শরয়ীভাবে তার স্ত্রী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছি কি না, নাকি ইতোমধ্যে কোনো তালাক সংঘটিত হয়েছে—দয়া করে স্পষ্টভাবে জানাবেন।জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

Answer

বিস্তারিত জবাব

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল। আমি কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।

১. শর্তযুক্ত তালাকের হুকুম

আপনার স্বামী তার পূর্বের স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন:

"আমি সালমাকে এই শর্তে তালাক দিচ্ছি যে, এর পর থেকে তোমাকে যত তালাক দেব, সেটা ওর উপরেও পতিত হবে।"

হানাফি ফিকহের বিধান: এই ধরনের শর্তযুক্ত তালাককে "তালাক মু'আল্লাক" (শর্তযুক্ত তালাক) বলা হয়। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, কোনো শর্তের সাথে তালাককে যুক্ত করা হলে, শর্ত পূরণ হলে তালাক পতিত হয়। কিন্তু এখানে শর্তটি হলো "এর পর থেকে তোমাকে যত তালাক দেব, সেটা ওর উপরেও পতিত হবে" — এটি একটি শর্তযুক্ত তালাক, যেখানে পূর্বের স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার সাথে সাথে নতুন স্ত্রীকেও তালাক দেওয়ার শর্ত রয়েছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: এই শর্তটি শুধুমাত্র পূর্বের স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ, যদি স্বামী পূর্বের স্ত্রীকে তালাক দেন, তাহলে সেই তালাক নতুন স্ত্রীর উপরেও পতিত হবে। কিন্তু যদি স্বামী নতুন স্ত্রীকে (আপনাকে) সরাসরি তালাক দেন, তাহলে সেই তালাক পূর্বের স্ত্রীর উপর পতিত হবে না, কারণ শর্তটি ছিল "তোমাকে যত তালাক দেব" — অর্থাৎ পূর্বের স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আপনার ক্ষেত্রে: ৩ জুলাই আপনার স্বামী আপনাকে এক তালাক দিয়েছেন। এটি আপনার উপর পতিত হয়েছে। কিন্তু এই তালাকের কারণে পূর্বের স্ত্রীর উপর কোনো তালাক পতিত হয়নি, কারণ শর্তটি ছিল উল্টো — পূর্বের স্ত্রীকে তালাক দিলে আপনার উপর পতিত হবে।

সারমর্ম: শর্তযুক্ত তালাকের কারণে আপনার উপর যে তালাক পতিত হয়েছে, তা বৈধ এবং কার্যকর। তবে এটি শর্তের কারণে নয়, বরং সরাসরি তালাক দেওয়ার কারণে পতিত হয়েছে।

২. ৩ জুলাইয়ের তালাক — স্বাক্ষর না করা সত্ত্বেও কি সংঘটিত হয়েছে?

হানাফি ফিকহের বিধান: তালাকের জন্য স্ত্রীর স্বাক্ষর বা সম্মতি প্রয়োজন হয় না। তালাক স্বামীর ইচ্ছা ও ঘোষণার মাধ্যমেই সংঘটিত হয়। স্ত্রী স্বাক্ষর না করলেও বা কাগজ না পেলেও তালাক পতিত হবে, যদি স্বামী স্পষ্টভাবে তালাক দিয়ে থাকে।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, তালাকের জন্য স্ত্রীর সম্মতি বা স্বাক্ষর শর্ত নয়। স্বামী যদি স্পষ্ট ভাষায় তালাক দেয়, তাহলে তালাক পতিত হয়।

আপনার ক্ষেত্রে: আপনার স্বামী ৩ জুলাই আপনাকে এক তালাক দিয়েছেন। আপনি স্বাক্ষর করেননি এবং কাগজ পাননি — কিন্তু তালাকটি সংঘটিত হয়েছে। কারণ তালাকের জন্য স্ত্রীর স্বাক্ষর বা সম্মতি প্রয়োজন হয় না।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: তালাকটি যদি জোরপূর্বক বা বাধ্য হয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটির হুকুম ভিন্ন হতে পারে। হানাফি ফিকহে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক তালাক দিলে সেই তালাক পতিত হয় না। কিন্তু এখানে আপনার স্বামী তার পূর্বের স্ত্রীর চাপে তালাক দিয়েছেন — এটি কি জোরপূর্বক তালাক হিসেবে গণ্য হবে?

বিস্তারিত: হানাফি ফিকহে জোরপূর্বক তালাকের বিধান হলো — যদি কাউকে প্রাণনাশের ভয় দেখিয়ে বা মারধর করে তালাক দিতে বাধ্য করা হয়, তাহলে সেই তালাক পতিত হয় না। কিন্তু এখানে আপনার স্বামীকে তার পূর্বের স্ত্রী চাপ দিয়েছেন, কিন্তু প্রাণনাশের হুমকি বা মারধরের মাধ্যমে তালাক দিতে বাধ্য করা হয়েছে কিনা — সেটি স্পষ্ট নয়। মানসিক চাপের কারণে তালাক দিলে তা জোরপূর্বক তালাক হিসেবে গণ্য হবে না, যদি প্রাণনাশের ভয় না থাকে।

সারমর্ম: ৩ জুলাইয়ের তালাকটি সংঘটিত হয়েছে, যদি স্বামী স্পষ্টভাবে তালাক দিয়ে থাকে এবং তা জোরপূর্বক না হয়।

৩. রুজু (ফিরিয়ে নেওয়া) সহীহ হয়েছে কি?

হানাফি ফিকহের বিধান: এক তালাক দেওয়ার পর ইদ্দতের মধ্যে স্বামী রুজু (ফিরিয়ে নেওয়া) করতে পারে। রুজু করার জন্য স্ত্রীর সম্মতি প্রয়োজন হয় না। স্বামী শুধু বললেই রুজু হয়ে যায়, অথবা শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করলেও রুজু হয়ে যায়।

আপনার ক্ষেত্রে: আপনার স্বামী আপনাকে এক তালাক দেওয়ার পর আপনাকে ফিরিয়ে নিয়েছেন এবং আপনিও তা মেনে নিয়েছেন। যেহেতু এটি ছিল এক তালাক (তালাকে রজয়ী), তাই ইদ্দতের মধ্যে রুজু করা সহীহ হয়েছে। আপনার সম্মতিও ছিল, তাই কোনো সমস্যা নেই।

সারমর্ম: রুজু সহীহ হয়েছে। আপনারা পুনরায় স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন।

৪. কাজীর কাগজে তারিখ পরিবর্তন করে নতুন কাগজ তৈরি — তালাক সংঘটিত হয়েছে কি?

হানাফি ফিকহের বিধান: তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য স্বামীর ঘোষণা বা ইচ্ছা প্রয়োজন। শুধু কাগজ তৈরি করা বা স্ত্রীর স্বাক্ষর করার কারণে তালাক হয় না, যদি স্বামী নতুন করে তালাক না দেয়।

আপনার ক্ষেত্রে: কাজী আগের কাগজের তারিখ পরিবর্তন করে নতুন তারিখে কাগজ তৈরি করেছেন এবং আপনি তাতে স্বাক্ষর করেছেন। কিন্তু আপনার স্বামী নতুন করে সেই কাগজে স্বাক্ষর করেননি বা নতুন করে তালাকের ঘোষণা দেননি। তাই এই কাগজের কারণে নতুন কোনো তালাক সংঘটিত হয়নি।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: আগের তালাক (৩ জুলাইয়ের) ইতিমধ্যে সংঘটিত হয়েছে। সেই তালাকের পর রুজু হয়েছে। এখন নতুন কাগজ তৈরি করা হলেও, যেহেতু স্বামী নতুন করে তালাক দেননি, তাই নতুন কোনো তালাক পতিত হয়নি।

সারমর্ম: কাজীর কাগজ তৈরি এবং আপনার স্বাক্ষরের কারণে নতুন কোনো তালাক সংঘটিত হয়নি, কারণ স্বামী নতুন করে তালাক দেননি।

৫. শুধু কাজী কাগজ তৈরি এবং স্ত্রীর স্বাক্ষর — তালাক হবে কি?

হানাফি ফিকহের বিধান: তালাক স্বামীর ইচ্ছা ও ঘোষণার মাধ্যমে সংঘটিত হয়। স্ত্রী তালাক দিতে পারে না, যদি না স্বামী তাকে তালাকের অধিকার (তাফওয়ীয) দিয়ে থাকে। শুধু কাজী কাগজ তৈরি করা বা স্ত্রীর স্বাক্ষর করার কারণে তালাক হয় না।

আপনার ক্ষেত্রে: আপনার স্বামী আপনাকে তালাকের অধিকার (তাফওয়ীয) দেননি। তাই আপনি নিজে তালাক দিতে পারবেন না। কাজীর কাগজ তৈরি এবং আপনার স্বাক্ষরের কারণে তালাক সংঘটিত হয়নি।

সারমর্ম: শুধু কাজী কাগজ তৈরি এবং আপনার স্বাক্ষরের কারণে তালাক হয়নি।

৬. তারিখ পরিবর্তন করে কাগজ তৈরি — শরয়ী মূল্য

হানাফি ফিকহের বিধান: তারিখ পরিবর্তন করে কাগজ তৈরি করা একটি জালিয়াতি এবং শরীয়তে তা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও গুনাহের কাজ। এই ধরনের কাগজের কোনো শরয়ী মূল্য নেই। তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য স্বামীর প্রকৃত ঘোষণা প্রয়োজন, কাগজের তারিখ পরিবর্তন করে তালাক প্রমাণ করা যায় না।

সারমর্ম: তারিখ পরিবর্তন করে তৈরি করা কাগজের কোনো শরয়ী মূল্য নেই। এটি একটি গুনাহের কাজ এবং এতে কোনো তালাক সংঘটিত হয়নি।

৭. স্বামী তালাক দিতে রাজি না হলে কীভাবে মুক্ত হবেন?

হানাফি ফিকহের বিধান: যদি স্বামী তালাক দিতে রাজি না হয় এবং খোলাতেও রাজি না হয়, তাহলে স্ত্রীর জন্য নিম্নলিখিত উপায় রয়েছে:

১. খোলা (খুল'): স্বামী যদি রাজি হয়, তাহলে স্ত্রী কিছু অর্থের বিনিময়ে খোলা নিতে পারে। কিন্তু স্বামী রাজি না হলে খোলা সম্ভব নয়।

২. ফাসখ (বিচ্ছেদ): কিছু নির্দিষ্ট কারণে স্ত্রী কাজী বা বিচারকের মাধ্যমে ফাসখ (বিচ্ছেদ) নিতে পারে। যেমন:

  • স্বামীর খরচ (নাফাকা) না দেওয়া
  • স্বামীর দীর্ঘদিন অনুপস্থিতি
  • স্বামীর নির্যাতন বা মারধর
  • স্বামীর যৌন অক্ষমতা
  • স্বামীর ধর্মত্যাগ

৩. তালাকে তাফওয়ীয: যদি স্বামী স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দিয়ে থাকে, তাহলে স্ত্রী নিজে তালাক দিতে পারে। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে স্বামী এই অধিকার দেননি।

আপনার ক্ষেত্রে: আপনার স্বামী তালাক দিতে রাজি নন এবং খোলাতেও রাজি নন। তাই আপনাকে ফাসখের জন্য কাজী বা শরয়ী আদালতে যেতে হবে। ফাসখের জন্য আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে, আপনার ক্ষেত্রে ফাসখের কোনো কারণ রয়েছে।

৮. খোলা, ফাসখে নিকাহ বা অন্য কোনো পদ্ধতির সুযোগ

হানাফি ফিকহের বিধান:

ক. খোলা (খুল'): স্বামী রাজি থাকলে স্ত্রী অর্থের বিনিময়ে খোলা নিতে পারে। কিন্তু স্বামী রাজি না হলে খোলা সম্ভব নয়।

খ. ফাসখে নিকাহ: কিছু নির্দিষ্ট কারণে কাজী বা বিচারক নিকাহ ভেঙে দিতে পারেন। যেমন:

  • স্বামীর খরচ না দেওয়া
  • স্বামীর নির্যাতন
  • স্বামীর দীর্ঘদিন অনুপস্থিতি
  • স্বামীর যৌন অক্ষমতা
  • স্বামীর ধর্মত্যাগ

গ. তালাকে তাফওয়ীয: স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দিয়ে থাকে, তাহলে স্ত্রী নিজে তালাক দিতে পারে।

আপনার ক্ষেত্রে: আপনার স্বামী তালাক দিতে রাজি নন এবং খোলাতেও রাজি নন। তাই আপনাকে ফাসখের জন্য কাজী বা শরয়ী আদালতে যেতে হবে। ফাসখের জন্য আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে, আপনার ক্ষেত্রে ফাসখের কোনো কারণ রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ: ফাসখের জন্য আপনাকে শরয়ী আদালতে বা কাজীর কাছে আবেদন করতে হবে। কাজী যদি দেখেন যে, আপনার ক্ষেত্রে ফাসখের কারণ রয়েছে, তাহলে তিনি নিকাহ ভেঙে দিতে পারেন।

৯. স্বামীর গোপন তথ্য ও চাপ — ফাসখের কারণ হতে পারে কি?

হানাফি ফিকহের বিধান: হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, বিয়ের সময় স্বামী যদি তার পূর্বের স্ত্রী ও সন্তানের কথা গোপন করে, তাহলে এটি প্রতারণা হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু এই প্রতারণার কারণে নিকাহ ফাসখ (বাতিল) হবে না। নিকাহ সহীহ থাকবে।

তবে: কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রতারণার কারণে স্ত্রীর ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার থাকতে পারে, কিন্তু নিকাহ ফাসখ হবে না।

আপনার ক্ষেত্রে: আপনার স্বামী তার পূর্বের স্ত্রী ও সন্তানের কথা গোপন করেছেন এবং আপনাকে ভুল তথ্য দিয়েছেন। এটি একটি প্রতারণা, কিন্তু হানাফি মাজহাব অনুযায়ী এই কারণে নিকাহ ফাসখ হবে না।

তবে: আপনার স্বামীর পূর্বের স্ত্রী আপনাকে হুমকি দিচ্ছেন এবং বিভিন্নভাবে চাপ দিচ্ছেন — এটি যদি আপনার জীবন ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আপনি কাজীর কাছে ফাসখের আবেদন করতে পারেন।

১০. বর্তমান অবস্থা — আপনি কি তার স্ত্রী?

আপনার বর্তমান অবস্থা:

১. ৩ জুলাই আপনার স্বামী আপনাকে এক তালাক দিয়েছেন — এটি সংঘটিত হয়েছে। ২. এরপর আপনার স্বামী আপনাকে ফিরিয়ে নিয়েছেন (রুজু) — এটি সহীহ হয়েছে। ৩. এরপর কাজীর কাগজে তারিখ পরিবর্তন করে নতুন কাগজ তৈরি করা হয়েছে এবং আপনি স্বাক্ষর করেছেন — কিন্তু স্বামী নতুন করে তালাক দেননি, তাই নতুন কোনো তালাক পতিত হয়নি। ৪. শর্তযুক্ত তালাকের কারণে আপনার উপর কোনো অতিরিক্ত তালাক পতিত হয়নি।

সারমর্ম: বর্তমানে আপনি আপনার স্বামীর স্ত্রী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। ৩ জুলাইয়ের এক তালাকের পর রুজু হয়েছে, তাই বর্তমানে আপনার বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান। নতুন করে কোনো তালাক সংঘটিত হয়নি।

তবে: যেহেতু আপনি আর এই সংসারে থাকতে চান না এবং স্বামী তালাক দিতে রাজি নন, তাই আপনাকে ফাসখের জন্য কাজী বা শরয়ী আদালতে যেতে হবে।


সংক্ষিপ্ত উত্তর

১. শর্তযুক্ত তালাকের কারণে আপনার উপর কোনো অতিরিক্ত তালাক পতিত হয়নি। শর্তটি ছিল পূর্বের স্ত্রীকে তালাক দিলে আপনার উপর পতিত হবে — কিন্তু সেরকম কিছু ঘটেনি।

২. ৩ জুলাইয়ের তালাকটি সংঘটিত হয়েছে, যদিও আপনি স্বাক্ষর করেননি এবং কাগজ পাননি। কারণ তালাকের জন্য স্ত্রীর স্বাক্ষর বা সম্মতি প্রয়োজন হয় না।

৩. রুজু সহীহ হয়েছে। এক তালাকের পর ইদ্দতের মধ্যে রুজু করা বৈধ।

৪. কাজীর কাগজে তারিখ পরিবর্তন করে নতুন কাগজ তৈরি এবং আপনার স্বাক্ষরের কারণে নতুন কোনো তালাক সংঘটিত হয়নি, কারণ স্বামী নতুন করে তালাক দেননি।

৫. শুধু কাজী কাগজ তৈরি এবং স্ত্রীর স্বাক্ষরের কারণে তালাক হয় না।

৬. তারিখ পরিবর্তন করে তৈরি কাগজের কোনো শরয়ী মূল্য নেই।

৭. স্বামী তালাক দিতে রাজি না হলে, আপনাকে ফাসখের জন্য কাজী বা শরয়ী আদালতে যেতে হবে।

৮. খোলা, ফাসখে নিকাহ বা অন্য কোনো পদ্ধতির মাধ্যমে বিচ্ছেদ নেওয়ার সুযোগ আছে, তবে শর্ত সাপেক্ষে।

৯. স্বামীর গোপন তথ্য ও চাপ ফাসখের কারণ হতে পারে, তবে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী শুধু প্রতারণার কারণে নিকাহ ফাসখ হবে না।

১০. বর্তমানে আপনি আপনার স্বামীর স্ত্রী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। নতুন করে কোনো তালাক সংঘটিত হয়নি।


উল্লেখ্য: এই উত্তরটি হানাফি ফিকহের আলোকে দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনার এলাকার কোনো বিশ্বস্ত আলেম বা মুফতির সাথে পরামর্শ করুন। বিশেষ করে ফাসখের বিষয়টি কাজী বা শরয়ী আদালতের মাধ্যমে করতে হবে।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.