প্রাইজবন্ডের ড্র এর টাকাগুলো নেওয়া জায়েজ আছে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
সংক্ষিপ্ত উত্তর
প্রাইজবন্ডের ড্র-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত টাকা নেওয়া জায়েজ নয়; এটি হারাম। কারণ প্রাইজবন্ড মূলত এক প্রকার জুয়া বা লটারি, যা ইসলামে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ
১. প্রাইজবন্ডের প্রকৃতি
প্রাইজবন্ড এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ক্রেতা একটি নির্দিষ্ট মূল্যে বন্ড ক্রয় করে এবং নির্দিষ্ট সময় পর ড্র-এর মাধ্যমে কিছু সংখ্যক বন্ডধারীকে পুরস্কার/লটারি দেওয়া হয়। এটি মূলত জুয়া (মায়সির) এবং লটারি-এর অন্তর্ভুক্ত।
২. কুরআনের দলিল
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
"হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি এবং ভাগ্য-নির্ধারক তীর—এসব শয়তানের কাজের অন্তর্ভুক্ত ঘৃণ্য বস্তু। সুতরাং তোমরা এসব থেকে বিরত থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।" (সূরা আল-মায়িদা: ৯০)
৩. হাদীসের দলিল
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
مَنْ قَالَ لِصَاحِبِهِ تَعَالَ أُقَامِرُكَ فَلْيَتَصَدَّقْ
"যে ব্যক্তি তার সঙ্গীকে বলে, 'আসো, আমি তোমার সাথে জুয়া খেলি', সে যেন সদকা দেয়।" (সহীহ বুখারী: ৪৮৬০)
৪. হানাফী ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী)-তে উল্লেখ আছে:
জুয়া ও লটারির মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ বৈধ নয়। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, যে সকল লেনদেনে সুদ বা জুয়ার উপাদান থাকে, তা হারাম।
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)-এ বলা হয়েছে:
وَالْقِمَارُ هُوَ مَا يُشْتَرَطُ فِيهِ أَخْذُ الْمَالِ مِنَ الْجَانِبَيْنِ
"জুয়া হলো এমন ব্যবস্থা যেখানে উভয় পক্ষ থেকে অর্থ গ্রহণের শর্ত থাকে।" (রদ্দুল মুহতার, ৬তম খণ্ড)
প্রাইজবন্ডের ক্ষেত্রে, ক্রেতা বন্ডের মূল্য পরিশোধ করে এবং ড্র-তে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জয়ী হলে অর্থ পায়, অন্যথায় অর্থ হারায়। এটি স্পষ্টতই জুয়ার অন্তর্ভুক্ত।
ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী):
মুফতি তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) তাঁর ফাতাওয়ায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, প্রাইজবন্ড, লটারি এবং অনুরূপ সকল প্রকার জুয়া হারাম। এর মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ হালাল নয়।
ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী):
হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-ও প্রাইজবন্ড ও লটারির টাকাকে হারাম বলেছেন এবং এর মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ গ্রহণ করা জায়েজ নয় বলে ফতোয়া দিয়েছেন।
প্রাইজবন্ডের টাকা হারাম হওয়ার কারণসমূহ
১. জুয়ার উপাদান: প্রাইজবন্ডে জয়-পরাজয়ের মাধ্যমে অর্থ লাভ-ক্ষতি হয়, যা জুয়ার অন্তর্ভুক্ত।
২. অনিশ্চয়তা (গারার): এতে সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তা রয়েছে—কে জিতবে, কে হারবে তা জানা যায় না।
৩. অর্থের বিনিময়ে অর্থ: এতে কোনো উৎপাদনশীল কাজ বা বৈধ বিনিময় নেই, বরং নিছক ভাগ্য পরীক্ষা।
৪. সুদ ও জুয়ার সাথে সাদৃশ্য: ইসলামী অর্থনীতিতে এমন সকল লেনদেন নিষিদ্ধ যাতে সুদ বা জুয়ার কোনো উপাদান থাকে।
প্রাইজবন্ডের টাকা পেলে করণীয়
যদি কেউ প্রাইজবন্ড ক্রয় করে থাকে এবং ড্র-তে টাকা জিতে থাকে, তাহলে:
১. তওবা করা: আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং ভবিষ্যতে এ জাতীয় কাজ থেকে বিরত থাকার সংকল্প করা।
২. টাকা ফেরত দেওয়া: যদি সম্ভব হয়, তাহলে সেই টাকা সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করা।
৩. গরীব-মিসকিনকে দান: যদি ফেরত দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে সেই টাকা গরীব-দুঃস্থদের মধ্যে দান করে দেওয়া। তবে মনে রাখতে হবে, এটি সওয়াবের নিয়তে দান নয়, বরং হারাম মাল থেকে নিজেকে পবিত্র করার জন্য।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا
"নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র ছাড়া কিছুই গ্রহণ করেন না।" (সহীহ মুসলিম: ১০১৫)
উপসংহার
প্রাইজবন্ডের ড্র-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত টাকা গ্রহণ করা জায়েজ নয় এবং তা সম্পূর্ণ হারাম। মুসলিম উম্মাহর জন্য উচিত এই জাতীয় জুয়া-ভিত্তিক সকল কার্যক্রম থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা এবং হালাল উপার্জনের মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করা।
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ "যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)