বান্ধবীর মেয়ের নাম রাখা হয়েছে সুহানা। এটা কি ঠিক আছে?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
সংক্ষিপ্ত উত্তর: ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে "সুহানা" নামটি রাখা জায়েয রয়েছে। তবে উত্তম হল, মহিলা সাহাবীয়া বা আরবী ভাষায় অর্থবোধক কোনো নাম বাচাই করা। এটি কোনো নবী, সাহাবি বা আল কুরআনে বর্ণিত কোনো নারীর নাম নয়। বরং হিন্দি ভাষার শব্দ,যার অর্থ সহনশীলতা, ধৈর্য্য।
যেহেতু এর অর্থ খারাপ নয় (বরং অর্থটি ভালো), তাই নামটি হারাম বা নাজায়েয নয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উম্মতকে সর্বদা ভালো ও অর্থবোধক নাম রাখতে উৎসাহিত করেছেন এবং সর্বোত্তম নাম হলো 'আব্দুল্লাহ' ও 'আব্দুর রহমান' এবং নারীদের জন্য 'আমিনা', 'খাদিজা', 'আয়েশা', 'ফাতিমা' ইত্যাদি।
বিস্তারিত দলিল ও বিশ্লেষণ:
১. নামের অর্থ ও উৎস: "সুহানা" (Suhana) শব্দটি আরবি শব্দ নয়। এটি একটি হিন্দি/উর্দু শব্দ। হিন্দি/উর্দুতে "সহনা" (Sahana) অর্থ সহ্য করা বা ধৈর্য ধারণ করা। "সুহানা" মানে "সুন্দর সহনশীলতা" বা "ভালো ধৈর্য" অর্থে ব্যবহৃত হয়। কিছু অঞ্চলে এটি "সোহানা" নামেও পরিচিত, যার অর্থ "সুন্দর" (Beautiful) — তবে এটি প্রমিত আরবি শব্দ নয়।
২. হাদিসের আলোকে নামকরণের নীতি: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"তোমরা নামের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় নাম হলো আব্দুল্লাহ এবং আব্দুর রহমান।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১৩২)
অন্য হাদিসে এসেছে:
"কিয়ামতের দিন তোমাদের নিজ নিজ নাম এবং তোমাদের পিতাদের নামে ডাকা হবে। সুতরাং তোমরা সুন্দর নাম রাখো।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৪৮)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ রাদ্দুল মুহতার (খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪১৭) এ উল্লেখ করেছেন যে, সন্তানের জন্য ভালো নাম রাখা পিতার উপর ওয়াজিব (আবশ্যক) এর কাছাকাছি। তিনি আরও বলেন, এমন নাম রাখা মাকরুহ (অপছন্দনীয়) যার অর্থ খারাপ বা যা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি অসম্মান প্রকাশ করে।
৩. "সুহানা" নামের বিধান:
- অর্থের দিক থেকে: "সুহানা" অর্থ "ধৈর্য" বা "সহনশীলতা" — এটি একটি ভালো গুণ। তাই অর্থের দিক থেকে এটি নাজায়েয নয়।
- উৎসের দিক থেকে: যেহেতু এটি আরবি নাম নয় এবং ইসলামের ইতিহাসে কোনো মহীয়সী নারীর নাম নয়, তাই হানাফি ফিকহের আলেমগণ সাধারণত এমন নাম রাখাকে "খিলাফে আউলা" (উত্তমের বিপরীত) বা "মাকরুহে তানযিহি" (অপছন্দনীয়) বলেছেন। অর্থাৎ, এটি গুনাহ নয়, তবে উত্তম পন্থা থেকে দূরে থাকা।
৪. ফাতাওয়া উসমানি ও অন্যান্য কিতাবের নির্দেশনা: মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) তার ফতোয়াসমূহে এবং ফাতাওয়া উসমানি (খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৮০) তে উল্লেখ করেছেন যে, মুসলমানদের উচিত সন্তানদের এমন নাম রাখা যা আরবি ভাষায় অর্থবোধক এবং ইসলামী ঐতিহ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বলেন, "নামের মাধ্যমে সন্তানের পরিচয় হয়। একটি অ-আরবি নাম রাখলে সন্তানের ইসলামী পরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।"
৫. উত্তম বিকল্প: যেহেতু "সুহানা" নামটি নাজায়েয নয়, তাই যদি ইতিমধ্যে নামটি রেখে দেওয়া হয়, তাহলে পরিবর্তন করা জরুরি নয়। তবে, যদি নামটি পরিবর্তন করা সম্ভব হয়, তাহলে ইসলামী ঐতিহ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুন্দর অর্থবোধক নাম রাখা উত্তম। যেমন:
- সাবরিয়া (ধৈর্যশীলা) — এটি "সুহানা" এর আরবি প্রতিশব্দ।
- সাবিরা (ধৈর্যশীলা)
- আমিনা (নিরাপদ, বিশ্বস্ত) — রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মাতার নাম।
- খাদিজা (প্রথমা) — রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রথম স্ত্রীর নাম।
- আয়েশা (জীবন্ত, সমৃদ্ধ) — উম্মুল মুমিনিনের নাম।
- ফাতিমা (দুধ ছাড়ানো) — রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কন্যার নাম।
৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
- বিধান: "সুহানা" নাম রাখা জায়েয (বৈধ) আছে, তবে এটি উত্তম নয়।
- পরামর্শ: নামটি পরিবর্তন করে আরবি ও ইসলামী ঐতিহ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সুন্দর নাম রাখা অধিক উত্তম। যদি পরিবর্তন করা সম্ভব না হয়, তাহলে এই নামে ডাকলেও কোনো গুনাহ হবে না, ইনশাআল্লাহ।
৭. গুরুত্বপূর্ণ নোট: নামকরণের সময় মনে রাখবেন, নামের অর্থ যেন ভালো হয় এবং নামটি যেন ইসলামী সংস্কৃতির সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খারাপ অর্থের নাম পরিবর্তন করে ভালো অর্থের নাম রেখেছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১৮৬)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সন্তানদের জন্য সুন্দর ও অর্থবোধক নাম রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।