সারাক্ষণ মৃত্যু ভয় থাকলে তার করণীয়
Waswasa-OCD · Hanafi
Question
গত জুন মাস শুরু থেকে নিয়ে প্রায় ২৬-২৭ দিন আমার রুহের মধ্যে কেমন যেনো অস্থিরতা হতো আর যেটা আমাকে মনে করাতো আমি মনে হয় বেশিদিন বাঁচবো না। মাঝে মাঝে এমন হতো মনে হতো এক্ষুনি মারা যাবো বা আজকে রাতে মনে হয় মারা যাবো
কিছুদিন খাওয়া আর ঘুমের সমস্যা হয়েছিল। ঘুম থেকে উঠেও ভয় ভয় লাগতো মনে হতো আমি বেচে আছি!!
আমি খুব কান্না করতাম।তখন প্রথম কিছুদিন তাওবা করে মনে হতো আমার তাওবা খাঁটি হচ্ছে না মনে হয় আবার মনে হতো আমার ইমান নেই তবে কি আমি ইমান হারা হয়ে মৃত্যুবরণ করবো!।
তারপর ৪-৫ দিন ভালো ছিলাম খুব একটা বেশিদিন বাঁচবো না আর রুহে অস্থিরতা অনুভব হয়নি।
এখন আবার জুলাই মাসের শুরু থেকে আবার একটানা অনেকদিন রুহে অস্থিরতা থাকে যেটা কিছু সময় বন্ধ থাকে আবার শুরু হয় প্রায় বেশিরভাগ সময়ই এই অস্থিরতা থাকে আর মনে হয় আমি বেশিদিন বাঁচবো না
তারপর আবার গতো পরশু সারাদিন রাত খুব ভয়ে অস্থির ছিলাম মনে হচ্ছিলো কখন যেনো মৃত্যুটা চলে আসে। সেদিন রাতে ঠিক মতো ঘুমাতে পর্যন্ত পারিনি মনে হচ্ছিলো এটাই মনে হয় শেষ রাত। কালকেও একই অবস্থা নামাজম পড়ে বার কয়েক আল্লাহর কাছে কেঁদেছি তাওবা করেছি তবুও মনে অস্থিরতা দূর হয়ে শান্তি আসেনি।
আবার মনে হয় মৃত্যুটা আমার কেমন হবে ভালো নাকি খারাপ!! মৃত্যুর যন্ত্রণা কেমন হবে এ ভেব খুবই ভয় লাগে।মনে হয় ইমানে সাথে মৃত্যুবরণ করতে পারবো তো। এ ভয় আর অস্থিরতার কারণে আমি সারাক্ষণই কাঁদি।
কোনো কাজকর্ম করিনা নিজের কোন দায়িত্ব পালনও করিনা সবসময় কেমন যেনো লাগে মনে হয় মারা যাবো বেশিদিন বাঁচবোনা।
আবার মনে হয় আমি পৃথিবী থেকে আলগা হতে শুরু করেছি আর রুহ পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছি। মনে হয় আমি আমার ভেতরে নেই আমার শরীর যেনো অন্য কারও। নিষ্প্রাণ লাগে নিজেকে।
আবার মনে হয় হতে পারে এগুলো আমার রোগ বা ওয়াসওয়াসা কিন্তু মৃত্যু তো আমার ভয় দেখে পিছিয়ে যাবে না আমি তো যে কোন মুহূর্তে মারা যেতে পারি। এ ভয় থাকা অবস্থায় ও তো আমার মৃত্যু হতে পারে। কখন যেনো মৃত্যু চলে আসে।
আল্লাহ কি দিচ্ছেন আমায় এ অনুভুতি ?? মৃত্যুর আগের দিনগুলোতে কি মানুষের এমন অনুভব হয় অস্থির লাগে বুকের ভিতর??
আমার কেনো এমন হচ্ছে জানাবেন প্লিজ এর কি কোন শরয়ী সমাধান আছে? এমতাবস্থায় ইসলাম আমায় কি নির্দেশ দেয়?
Answer
উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
প্রিয় বোন, আপনার সমস্যাটি আমি মনোযোগ সহকারে পড়েছি। প্রথমেই জেনে রাখুন, আপনার উপর যা ঘটছে তা মৃত্যুর পূর্ব লক্ষণ নয়, বরং এটি একটি মানসিক অবস্থা (ওয়াসওয়াসা/অস্থিরতা) যা অনেক মানুষের হয়ে থাকে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এবং আধুনিক মনোবিজ্ঞান অনুযায়ীও এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা।
১. আপনার অবস্থার ইসলামী ব্যাখ্যা (Waswasa)
আপনি যা অনুভব করছেন তা মূলত ওয়াসওয়াসা (Waswasa) বা শয়তানি প্ররোচনা। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"শয়তান মানুষের নিকট এসে বলে, 'কে তোমাকে সৃষ্টি করেছে? আল্লাহ। তবে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে?' যখন কেউ এরূপ অনুভব করে, তখন সে যেন আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম পাঠ করে এবং (চিন্তা) বন্ধ করে দেয়।"
(সহিহ বুখারী: ৩২৭৬)
আপনার মনে যে 'মৃত্যু হবে', 'ইমান নেই', 'তাওবা কবুল হচ্ছে না' — এই সবই শয়তানের কুমন্ত্রণা। ইসলামী স্কলারগণ বলেন, ওয়াসওয়াসা ঈমানের দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং ঈমানের পূর্ণতার লক্ষণ। কারণ, শয়তান তখনই কাউকে এসব নিয়ে বিভ্রান্ত করে যখন সে দেখে ব্যক্তির অন্তরে আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা আছে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন, "ওয়াসওয়াসা এমন লোকদেরই হয় যাদের অন্তরে ঈমান ও ইয়াকীন রয়েছে।" (মাজমুউল ফাতাওয়া)
২. মৃত্যুর আগে কি এমন অনুভূতি হয়?
আপনি জিজ্ঞেস করেছেন, মৃত্যুর আগে কি মানুষের এমন অনুভূতি হয়?
উত্তর: মৃত্যুর আগে মানুষের সাকরাত (যন্ত্রণা) শুরু হয়, কিন্তু সেটি সাধারণত মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক মিনিট আগে। কেউ ২৬-২৭ দিন আগে থেকে এত দীর্ঘ সময় ধরে মৃত্যুর পূর্বলক্ষণ অনুভব করে না। এটি সম্পূর্ণ মানসিক অস্থিরতা (Anxiety/Health Anxiety)। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন:
"প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।"
(সূরা আলে ইমরান: ১৮৫)
মৃত্যু সত্য, কিন্তু এর সময় নির্ধারিত। আল্লাহ বলেন:
"আর আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ মরতে পারে না। মৃত্যু একটি নির্ধারিত সময়ে লেখা আছে।"
(সূরা আলে ইমরান: ১৪৫)
আপনি যদি আজ রাতে মারা যাওয়ার কথা হতো, তবে আল্লাহ তা লিখে দিতেন। কিন্তু তিনি আপনাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, কারণ আপনার জন্য এখনও কাজ আছে। তাই এই ভয়কে শয়তানের প্রতারণা জেনে উপেক্ষা করুন।
৩. ঈমান হারানোর ভয়
আপনি মনে করছেন আপনার ঈমান নেই। এটি সম্পূর্ণ শয়তানের কুমন্ত্রণা। ঈমানের মূল হলো আল্লাহ ও রাসূলকে সত্যায়ন করা। আপনি যখন আল্লাহর কাছে কাঁদছেন, তাওবা করছেন, নামাজ পড়ছেন — এর অর্থই হলো আপনার ঈমান আছে। ঈমানহীন মানুষ আল্লাহর কাছে কাঁদে না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"তোমাদের কেউ যেন না বলে, 'আমার ঈমান নষ্ট হয়ে গেছে।' বরং বলবে, 'আমার ঈমান দুর্বল হয়ে গেছে।'"
(মুসনাদ আহমাদ: ৬৫৩০)
আপনার তাওবা খাঁটি হচ্ছে না মনে হওয়াও শয়তানের কাজ। তাওবার শর্ত হলো: (১) গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, (২) অনুতপ্ত হওয়া, (৩) ভবিষ্যতে না করার সংকল্প। আপনি যদি কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর কাছে তাওবা করেন, তবে তা অবশ্যই খাঁটি। আল্লাহ বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন।"
(সূরা আল-বাকারা: ২২২)
৪. শরয়ী সমাধান (ইসলামী নির্দেশনা)
আপনি যখন জিজ্ঞেস করেছেন, ইসলাম আপনাকে কী নির্দেশ দেয়, তখন নিম্নোক্ত বিষয়গুলো মেনে চলুন:
ক. ওয়াসওয়াসা উপেক্ষা করুন
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"ওয়াসওয়াসা সম্পর্কে লোকেরা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, 'এটি সুস্পষ্ট ঈমানের লক্ষণ।' অপর বর্ণনায় আছে, 'তোমরা এ থেকে বাঁচতে চাইলে 'আমানতু বিল্লাহি ওয়া রুসুলিহি' বলো এবং ওয়াসওয়াসা ছেড়ে দাও।'"
(সহিহ মুসলিম: ১৩৪)
খ. দৈনিক সকাল-সন্ধ্যার যিকির ও দোয়া
- সকাল-সন্ধ্যায় "বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিসসামা, ওয়া হুয়াস সামিউল আলিম" (৩ বার) পড়ুন। হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি এটি পড়বে, তাকে কোনো ক্ষতি করবে না। (তিরমিজি: ৩৩৮৮)
- সূরা ফালাক ও সূরা নাস প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় ৩ বার করে পড়ুন। এটি সব ধরনের ভয় ও অস্থিরতা থেকে রক্ষা করে। (আবু দাউদ: ৫০৮২)
গ. নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত
- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে পড়ার চেষ্টা করুন। নামাজের পর দরুদ শরীফ ও ইস্তিগফার বেশি করুন।
- প্রতিদিন অন্তত ১ পৃষ্ঠা কুরআন তিলাওয়াত করুন। কুরআন শোনাও উপকারী। আল্লাহ বলেন:
"জেনে রাখো, আল্লাহর যিকিরেই অন্তর প্রশান্ত হয়।"
(সূরা আর-রাদ: ২৮)
ঘ. মৃত্যুর ভয় দূর করার দোয়া
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিখিয়েছেন:
"আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল জান্নাতা ওয়া আউযুবিকা মিনান্নার।"
(হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জান্নাত চাই এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাই।)
(আবু দাউদ: ৭৯২)
ঙ. চিকিৎসা গ্রহণ করুন
অনুগ্রহ করে একজন ভালো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এর পরামর্শ নিন। এটি ইসলামী নির্দেশনার সাথে সাংঘর্ষিক নয়, বরং ইসলামী নির্দেশনারই অংশ। প্রয়োজনে কাউন্সেলিং করুন।
৫. আপনার করণীয় (সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা)
১. ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না। যখনই মনে হবে "মারা যাবো", তখনই "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন এবং কাজে মন দিন। ২. নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। আপনার দায়িত্ব ও কাজকর্মে মনোযোগ দিন। অলসতা ওয়াসওয়াসা বাড়ায়। ৩. সকাল-সন্ধ্যার যিকির নিয়মিত করুন। ৪. ডাক্তারের পরামর্শ নিন। এটি ঈমানের দুর্বলতা নয়, এটি একটি রোগ — চিকিৎসা করালে ইনশাআল্লাহ ভালো হয়ে যাবেন। ৫. আত্মহত্যার চিন্তা দূর করুন। আপনি লিখেছেন "নিষ্প্রাণ লাগে নিজেকে" — এটি বিষণ্নতার লক্ষণ। এটি নিয়ে লজ্জা না করে চিকিৎসা নিন। ইসলামে আত্মহত্যা হারাম, তবে বিষণ্নতা একটি রোগ, চিকিৎসায় নিরাময় সম্ভব।
উপসংহার
আপনার এই অবস্থা মৃত্যুর লক্ষণ নয়, বরং শয়তানের ওয়াসওয়াসা ও মানসিক রোগ। আল্লাহ আপনাকে পরীক্ষা করছেন, এবং এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য তিনি আপনাকে ধৈর্য ও চিকিৎসা দুটোই দিয়েছেন। আপনি আল্লাহর কাছে কাঁদছেন — এটি আপনার ঈমানের প্রমাণ। আল্লাহ বলেন:
"আল্লাহ কারো উপর এমন বোঝা চাপান না যা সে বহন করতে সক্ষম নয়।"
(সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)
আপনি এই কষ্ট সহ্য করছেন, ইনশাআল্লাহ এর বিনিময়ে আল্লাহ আপনাকে জান্নাত দেবেন। তাই ধৈর্য ধরুন, চিকিৎসা নিন, এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। আল্লাহ আপনার অবস্থা ভালো করে দেবেন, আমিন।