"ছেড়ে দিছি" কি তালাক হিসেবে গণ্য হবে?
Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi
Question
وَالضَّرْبُ الثَّانِي: الْکِنَايَاتُ، وَلاَيَقَعُ بهَا الطلاَقُ إلاَّبِنِيَةٍ، اَوْ دَلالَةٍ حَالٍ. وَهِيَ عَلَی ضَرْبَيْنِ: مَنْها ثَلاَثَةُ اَلْفَاظٍ يَقَعُ بهَا الطّلاقُ الرَّجْعِيُّ،وَلاَيَقَعُ بهَا إِلا وَاحَدَةٌ، وَهِيَ قَوْلُهُ: اعْتَدِّي، وَاسْتَبْرِئِي رَحِمَکِ، وَاَنْتِ وَاحِدَةٌ، وَبَقِيَةُ الْکِنَايَاتِ إِذا نَوَی بهَا الطلاَقَ کَانَتْ وَاحِدَةً بَائِنَةً، وَإِنْ نَوَی بِهَا ثَلاَثاً کَانَتْ ثَلاَثاً، وَإِنْ نَوَی اثْنَتَيْنِ کَانَتْ وَاحِدَةً، وَهَذَا مِثْلُ قَوْلِهِ: اَنْتِ بَائِنٌ، وَبَتَّةٌ، وَبَتْلَةٌ، وَحَرَامٌ، وَحَبْلُکِ عَلَی غَارِبِکِ، وَالْحَقی بِاَهْلِک، وَخَلِيَةٌ، وَبَرِيّةٌ، وَوَهَبْتُکِ لاهْلِکِ، وَسَرَّحْتُکِ، وَاخْتَارِيْ، وَفارَقْتُکِ، وَاَنْتِ حُرَّةٌ، وَتَقَنَّعِي، وَتَخَمَّرِي، وَاسْتَتِرِيْ، وَاغْرُبِيْ، وَابْتَغِي الاَزْوَاجَ، فَإِنْ لَمْ يَکُنْ لَهُ نِيَةٌ لَمْ يَقَعْ بِهٰذِهِ الاَلْفَاظِ طَلاَقٌ؛ إِلا اَنْ يَکُوْنَا فِيْ مُذَاکَرَةِ الطّلاَقِ؛ فَيَقَعُ بِهَا الطّلاَقُ فِيْ الْقَضَاءِ، وَلاَيَقَعُ فِيْمَابَيْنَةُ وَبَيْنَ اﷲِ تَعَالَی إِلاَّ اَنْ يَنْوِيَهُ، وَإِنْ لَمْ يَکُوْنَا فِيْ مَذَاکَرَةِ الطّلاَقِ، وَکَانافِيْ غَضَبٍ اَوْ خُصُوْمَةٍ، وَقَعَ الطّلاَقُ بِکُلِّ لَفْظٍ لاَ يُقْصَدُ بِهِ السَّبُّ وَالشَّتِيْمَةُ، وَلَمْ يَقَعْ بِمَا يُقْصَدُبِهِ السَّبُّ وَالشَّتِيْمَةُ إِلاَّ اَنْ يَنْوِيَةُ.
احمد بن محمد البغدادي المعروف بالقدوري، مختصر القدوري: 363. 364، موسسة الريان للطباعة والنشر والتوزيع، بيروت
برهان الدين علي المرغيناني، الهداية شرح البداية، 1: 241، المکتبة الاسلامية
সারমর্মঃ
কেহ যদি তার স্ত্রীকে বলে যে তোমাকে আমি ছেড়ে দিলাম, যা খুশি তাই করো,তুমি মুক্ত, তুমি স্বাধীন, তুমি স্বামী খুজো,বা স্বামী তালাশ করো,তাহলে এটিও কেনায়া তালাক।
কেনায়া তালাক হলো ইঙ্গিতসূচক শব্দ দ্বারা যেটা হয়।
কেনায়া তালাকের ক্ষেত্রে নিয়ত তথা তালাকের ইচ্ছা থাকা অত্যাবশ্যক। আর কেনায়া তালাক দ্বারা এক তালাকে বায়েন পতিত হয়।
এটা ২০২২ এর একটা প্রশ্নের উত্তর থেকে নেয়া। কিন্তু ২০২৩ সালের থেকে এই জাতীয় যে প্রশ্নের উত্তর গুলো দেওয়া হয়েছে তাতে বলা হয় ছেড়ে দিলাম /ছেড়ে দিছি এগুলো দ্বারা রাজেয়ী তালাক হবে।আমার প্রশ্ন হলো আমাদের উক্ত ঘটনা ২০২০ / ২০২১ সালে ঘটেছে তাহলে আমরা কি এই ছেড়ে দিছি শব্দ কে কেনায়া শব্দ হিসেবে ধরে যদি তালাকের নিয়ত থাকে তাহলে বায়েন তালাক হবে এটা মেনে নিতে পারবো। কারন রাজেয়ী না হয়ে যদি প্রশ্ন/ না হয়ে, নিয়ত থাকে আর বায়েন তালাক হয় তাহলে আমাদের সংসার টা বেচে যাবে। আমার স্বামীর এই বিষয়ে কিছু তেমন মনে নেই। দয়া করে সহজতর উপায়ে উত্তর দিন হুজুর।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আমি এটি সহজভাবে এবং দলিলসহ উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার ঘটনায় তালাক পতিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত নয়, কারণ:
- "ছেড়ে দিছি" শব্দটি কেনায়া (ইঙ্গিতসূচক) শব্দ — এতে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত (ইচ্ছা) অপরিহার্য।
- আপনার বিবরণ অনুযায়ী, আপনার স্বামী তালাকের নিয়তে এ কথা বলেননি — বরং এটি ছিল মজা, রাগের ভান বা কথার প্রসঙ্গে বলা।
- আপনি নিজেই বলছেন: "একবার মনে হয় প্রশ্ন করেছিলো আবার মনে হয় তালাকের জন্য বলছে আমার মনে পড়ে না" — অর্থাৎ নিয়ত সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে।
- সন্দেহের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো: যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিত না হওয়া যায় যে তালাকের নিয়ত ছিল, ততক্ষণ তালাক পতিত হবে না। কারণ মূলনীতি হলো বিবাহ বহাল থাকা।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ:
১. কেনায়া তালাক কী?
কেনায়া তালাক হলো এমন শব্দ যা সরাসরি তালাকের জন্য ব্যবহৃত হয় না, কিন্তু প্রসঙ্গ ও পরিস্থিতির কারণে তালাক বোঝাতে পারে। যেমন: "তুমি মুক্ত", "তোমাকে ছেড়ে দিলাম", "তুমি স্বাধীন" ইত্যাদি।
কেনায়া শব্দে তালাক পতিত হওয়ার শর্ত হলো নিয়ত। নিয়ত না থাকলে তালাক পতিত হয় না।
ইবনে কুদামা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "কেনায়া শব্দে তালাক পতিত হয় না যতক্ষণ না নিয়ত থাকে অথবা এমন পরিস্থিতি থাকে যা তালাকের ইঙ্গিত বহন করে।" (আল-মুগনী, ৭/৩৩০)
২. আপনার ঘটনার বিশ্লেষণ:
আপনার বিবরণ অনুযায়ী:
- আপনি দুষ্টুমি করে বলেছিলেন যে আপনি চলে যাবেন।
- আপনার স্বামী মজা করে রাগের ভান করে বলেছিলেন "যাও চলে যাও"।
- এরপর তিনি অন্য সাইডে ফিরে বলেছিলেন "তোমাকে আমি ছেড়ে দিছি"।
এখানে লক্ষণীয় বিষয়:
- ঝগড়া বা রাগের অবস্থা ছিল না — আপনি নিজেই বলেছেন: "আমরা কেউই রাগ বা ঝগড়ার অবস্থায় ছিলাম না।"
- এটি ছিল মজা ও দুষ্টুমির পরিবেশ।
- তালাকের নিয়ত ছিল না — আপনার স্বামীরও মনে নেই যে তিনি তালাকের নিয়তে বলেছিলেন।
৩. ফিকহী মূলনীতি:
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "যদি কোনো ব্যক্তি এমন শব্দ বলে যা তালাকের জন্য স্পষ্ট নয় (কেনায়া), এবং তার নিয়ত তালাক না হয়, তবে তালাক পতিত হবে না। আর নিয়ত সম্পর্কে সন্দেহ থাকলে মূলনীতি হলো তালাক পতিত না হওয়া।" (মাজমু' ফাতাওয়া, ৩৩/২৮৩)
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "কেনায়া শব্দে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত। যদি নিয়ত না থাকে, তবে তালাক পতিত হবে না। আর যদি সন্দেহ থাকে যে নিয়ত ছিল কি না, তাহলে মূলনীতি হলো তালাক পতিত না হওয়া, কারণ মূলনীতি হলো বিবাহ বহাল থাকা।" (আশ-শারহুল মুমতি', ১৩/৮০)
৪. হেদায়া গ্রন্থের উদ্ধৃতি সম্পর্কে:
আপনি যে হেদায়া গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়েছেন, সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
"فَإِنْ لَمْ يَکُنْ لَهُ نِيَةٌ لَمْ يَقَعْ بِهٰذِهِ الاَلْفَاظِ طَلاَقٌ" "যদি তার নিয়ত না থাকে, তবে এই শব্দগুলো দ্বারা তালাক পতিত হবে না।"
এবং আরও বলা হয়েছে:
"وَلَمْ يَقَعْ بِمَا يُقْصَدُبِهِ السَّبُّ وَالشَّتِيْمَةُ إِلاَّ اَنْ يَنْوِيَةُ" "আর যে শব্দ দ্বারা গালি-গালাজ বা তিরস্কার উদ্দেশ্য হয়, তা দ্বারা তালাক পতিত হবে না, যতক্ষণ না সে নিয়ত করে।"
আপনার ঘটনায় যেহেতু তালাকের নিয়ত প্রমাণিত নয়, তাই এই উদ্ধৃতি আপনার ক্ষেত্রে তালাক পতিত হওয়ার পক্ষে দলিল নয়।
৫. রাজেয়ী না বায়েন — কোনটি প্রযোজ্য?
যেহেতু আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি যে তালাক পতিত হয়নি, তাই রাজেয়ী বা বায়েন — কোনটি প্রযোজ্য হবে সেই প্রশ্নই আসে না। আপনার বিবাহ বহাল রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ:
১. আপনার স্বামীর সাথে বসে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করুন — তিনি যদি নিশ্চিত করেন যে তিনি তালাকের নিয়তে বলেননি, তাহলে কোনো সমস্যাই নেই।
২. ভবিষ্যতে এ ধরনের কথাবার্তা থেকে বিরত থাকুন — তালাকের শব্দ নিয়ে খেলা বা মজা করা অত্যন্ত মারাত্মক। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"তিনটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে করলে তা কার্যকর হয় এবং ঠাট্টা-মজা করলেও তা কার্যকর হয়: বিবাহ, তালাক এবং রাজ'আত (স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া)।" (আবু দাউদ: ২১৯৪, তিরমিজি: ১১৮৪, ইবনে মাজাহ: ২০৩৯ — শায়খ আলবানী সহিহ বলেছেন)
৩. সন্দেহের ক্ষেত্রে — ইসলামের মূলনীতি হলো সন্দেহ দূর করা এবং নিশ্চিত বিষয়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। যেহেতু তালাকের নিয়ত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না, তাই তালাক পতিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
আপনার বিবাহ বহাল আছে। আপনার স্বামীর "ছেড়ে দিছি" বলাটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে না, কারণ:
- এটি কেনায়া শব্দ — নিয়ত ছাড়া তালাক পতিত হয় না।
- তালাকের নিয়ত প্রমাণিত নয় — বরং এটি ছিল মজা ও দুষ্টুমির পরিবেশে বলা।
- সন্দেহের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো বিবাহ বহাল থাকা।
তবে — যদি আপনার স্বামী নিজে মনে করেন বা নিশ্চিত হন যে তিনি তালাকের নিয়তেই বলেছিলেন, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন। সেক্ষেত্রে একজন নির্ভরযোগ্য আলেমের সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।
والله أعلم بالصواب — আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।