ছোটদের চিকিৎসার জন্য রুকইয়ার করা সম্পর্কে

Family Life · Hanafi

Question No: 3734
Questioner: Anika Fardous
Question Asked: 09 Aug 2026, 04:42 PM
Reviewed & Published: 09 Aug 2026, 05:17 PM
Views: 30
Tokens: 5,233
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার বাচ্চার বয়স ১১ মাস।ও কয়দিন থেকে একদম খেতে চায় না।কি কি পড়ে রুকইয়াহ করবো এবং কিভাবে করবো।মা কি কি ইবাদত করলে বাচ্চা পরহেজগার হবে।বাচ্চাকে ইসলামিক ভাবে বড় করতে হলে এই বয়স থেকেই কি কি করতে পারি?

Answer

বাচ্চার খাওয়ার সমস্যা, রুকইয়াহ ও ইসলামিক লালন-পালন সংক্রান্ত উত্তর

ভূমিকা

আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার ১১ মাসের শিশুর খাওয়ার সমস্যা এবং তাকে ইসলামিকভাবে গড়ে তোলার বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। আমি হানাফি মাযহাবের আলোকে কুরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে উত্তর দিচ্ছি।


১. শিশুর খাওয়ার সমস্যা ও রুকইয়াহ

খাওয়ার সমস্যা সম্পর্কে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি

প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, শিশুর খাওয়ার অরুচি অনেক সময় শারীরিক কারণেও হতে পারে (যেমন: দাঁত ওঠা, গলা ব্যথা, পেটের সমস্যা ইত্যাদি)। তাই প্রথমে একজন ভালো শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তবে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে রুকইয়াহ (দুআ ও কুরআন তিলাওয়াত) করাও বৈধ এবং উপকারী।

রুকইয়াহ কী?

রুকইয়াহ হলো কুরআনের আয়াত ও সহিহ দুআ দ্বারা রোগীর উপর দম করা বা পড়ে ফুঁ দেওয়া। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও রুকইয়াহ করেছেন এবং সাহাবীদেরকে এর অনুমতি দিয়েছেন।

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَوَى إِلَى فِرَاشِهِ كُلَّ لَيْلَةٍ جَمَعَ كَفَّيْهِ ثُمَّ نَفَثَ فِيهِمَا فَقَرَأَ فِيهِمَا: قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ وَقُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ وَقُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ ثُمَّ يَمْسَحُ بِهِمَا مَا اسْتَطَاعَ مِنْ جَسَدِهِ

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রত্যেক রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় উভয় হাতের তালু একত্র করে তাতে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে ফুঁ দিতেন এবং শরীরের যতটুকু সম্ভব মাসাহ করতেন। (সহিহ বুখারী: ৫০১৭)

শিশুর জন্য রুকইয়াহ করার নিয়ম

শিশুর জন্য রুকইয়াহ করার পদ্ধতি নিম্নরূপ:

নিয়ম: ১. অজু অবস্থায় কিবলামুখী হয়ে বসুন ২. শিশুকে কোলে নিন বা পাশে শুইয়ে দিন ৩. নিম্নোক্ত সূরাগুলো পড়ে শিশুর শরীরে (বিশেষত মাথা, বুক, পেট) ফুঁ দিন ৪. ফুঁ দেওয়ার সময় শিশুর শরীরে হালকাভাবে মাসাহ করুন

যে সূরাগুলো পড়বেন:

১. সূরা ফাতিহা (১ বার) ২. আয়াতুল কুরসি (১ বার) - সূরা বাকারার ২৫৫ নং আয়াত ৩. সূরা ইখলাস (৩ বার) ৪. সূরা ফালাক (৩ বার) ৫. সূরা নাস (৩ বার) ৬. সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (আমানার রাসূলু) - ২৮৫-২৮৬ নং আয়াত

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَعَوَّذُ مِنَ الْجَانِّ وَعَيْنِ الْإِنْسَانِ حَتَّى نَزَلَتِ الْمُعَوِّذَتَانِ فَلَمَّا نَزَلَتَا أَخَذَ بِهِمَا وَتَرَكَ مَا سِوَاهُمَا

হযরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) জিন ও মানুষের বদনজর থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। যখন সূরা ফালাক ও সূরা নাস নাজিল হয়, তখন তিনি এই দুই সূরা দ্বারা আশ্রয় প্রার্থনা করা শুরু করেন এবং অন্য কিছু বাদ দেন। (তিরমিজি: ২০৫৮)

অতিরিক্ত দুআ

রুকইয়াহর সাথে সাথে এই দুআও পড়তে পারেন:

أَذْهِبِ الْبَاسَ رَبَّ النَّاسِ وَاشْفِ أَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا

উচ্চারণ: "আযhibিল বা'সা রাব্বান নাস, ওয়াশফি আনতাশ শাফী, লা শিফাআ ইল্লা শিফাউকা, শিফাআন লা ইউগাদিরু সাকামা"

অর্থ: "হে মানুষের প্রতিপালক! কষ্ট দূর করে দিন এবং আরোগ্য দান করুন। আপনিই আরোগ্য দানকারী। আপনার আরোগ্য ছাড়া কোনো আরোগ্য নেই। এমন আরোগ্য দিন যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখবে না।" (সহিহ বুখারী: ৫৭৪২)


২. মায়ের ইবাদত ও সন্তানের পরহেজগারি

মায়ের ইবাদতের প্রভাব সন্তানের উপর

ইসলামি দৃষ্টিতে মায়ের ইবাদত ও আমলের প্রভাব সন্তানের উপর পড়ে। গর্ভাবস্থা থেকে শুরু করে সন্তান লালন-পালনের প্রতিটি পর্যায়ে মায়ের আমল সন্তানের চরিত্র গঠনে প্রভাব ফেলে।

وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ

"যারা ঈমান আনে এবং তাদের সন্তানরা ঈমানের ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করে, আমি তাদের সন্তানদেরকে তাদের সাথে মিলিয়ে দেব।" (সূরা আত-তুর: ২১)

মায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতসমূহ

১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত আদায় করা: মায়ের নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া সন্তানের জন্য বরকতের কারণ। হাদিসে এসেছে:

إِنَّ الرَّجُلَ لَيُرْزَقُ الْوَلَدَ الصَّالِحَ فَيَدْعُو لِوَالِدَيْهِ فَيَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: يَا جِبْرِيلُ أَعْطِهِمَا مِنَ الْأَجْرِ كَذَا وَكَذَا

"নিশ্চয়ই একজন ব্যক্তিকে সৎ সন্তান দান করা হয়, যে তার পিতামাতার জন্য দুআ করে। তখন আল্লাহ তায়ালা বলেন: হে জিবরাইল! তাদেরকে এত এত সওয়াব দাও।" (মুসনাদ আহমাদ)

২. কুরআন তিলাওয়াত: মায়ের কুরআন তিলাওয়াত ঘরে বরকত আনে। বিশেষত সূরা বাকারা নিয়মিত পড়া ঘর থেকে শয়তান দূরে রাখে।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ

"তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না। নিশ্চয়ই শয়তান সেই ঘর থেকে পালিয়ে যায় যেখানে সূরা বাকারা তিলাওয়াত করা হয়।" (সহিহ মুসলিম: ৭৮০)

৩. দুআ করা: সন্তানের জন্য নিয়মিত দুআ করা। বিশেষত এই দুআটি পড়া:

رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ

"হে আমার রব! আমাকে নামাজ কায়েমকারী করুন এবং আমার সন্তানদের মধ্য থেকেও। হে আমাদের রব! আমার দুআ কবুল করুন।" (সূরা ইবরাহিম: ৪০)

৪. দান-সদকা: সন্তানের জন্য দান-সদকা করা। হাদিসে এসেছে:

عَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ عَالَ جَارِيَتَيْنِ حَتَّى تَبْلُغَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنَا وَهُوَ وَضَمَّ أَصَابِعَهُ

"যে ব্যক্তি দুই কন্যা সন্তানকে লালন-পালন করবে যতক্ষণ না তারা বালেগ হয়, কিয়ামতের দিন আমি এবং সে এরূপ থাকব" - এবং তিনি তার দুই আঙুল একত্র করলেন। (সহিহ মুসলিম: ২৬৩১)


৩. ১১ মাস বয়সে শিশুকে ইসলামিকভাবে গড়ে তোলার উপায়

এই বয়সে করণীয়

১১ মাস বয়সে শিশু যা বুঝতে পারে এবং যা করা যেতে পারে:

১. শিশুর সামনে কুরআন তিলাওয়াত করা: শিশু মায়ের কণ্ঠস্বর শুনে অভ্যস্ত হয়। মায়ের কুরআন তিলাওয়াত শিশুর মনে প্রশান্তি আনে এবং ভবিষ্যতে কুরআনের প্রতি আগ্রহ তৈরি করে।

২. শিশুর সামনে নামাজ পড়া: শিশুকে নিয়ে নামাজের স্থানে রাখা বা শিশুর সামনে নামাজ পড়া। এটি শিশুর মধ্যে নামাজের অভ্যাস গড়তে সহায়ক।

৩. ইসলামি গান বা নাশিদ শোনানো: শিশুকে ইসলামি নাশিদ বা জিকির শোনানো যেতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন তা সহিহ ও গ্রহণযোগ্য হয়।

৪. শিশুকে দুআ শেখানো: এই বয়সে শিশু শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না, তবে মা যখন শিশুকে খাওয়ানোর আগে "বিসমিল্লাহ" বলেন এবং পরে "আলহামদুলিল্লাহ" বলেন, তখন শিশু ধীরে ধীরে এই অভ্যাস আয়ত্ত করে।

عَنْ عُمَرَ بْنِ أَبِي سَلَمَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَا غُلَامُ سَمِّ اللَّهَ وَكُلْ بِيَمِينِكَ وَكُلْ مِمَّا يَلِيكَ

"হে বালক! আল্লাহর নাম নাও (বিসমিল্লাহ বলো), ডান হাতে খাও এবং তোমার সামনের দিক থেকে খাও।" (সহিহ বুখারী: ৫৩৭৬)

৫. শিশুকে আদর ও ভালোবাসা দেওয়া: ইসলামি শিক্ষায় সন্তানের প্রতি ভালোবাসা ও স্নেহ প্রদর্শন গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও শিশুদেরকে আদর করতেন।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَبَّلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْحَسَنَ بْنَ عَلِيٍّ وَعِنْدَهُ الْأَقْرَعُ بْنُ حَابِسٍ فَقَالَ الْأَقْرَعُ: إِنَّ لِي عَشَرَةً مِنَ الْوَلَدِ مَا قَبَّلْتُ مِنْهُمْ أَحَدًا فَنَظَرَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ قَالَ: مَنْ لَا يَرْحَمْ لَا يُرْحَمْ

"রাসূলুল্লাহ (সা.) হাসান ইবনে আলীকে চুমু দিলেন। তখন আকরা ইবনে হাবিস উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন: আমার দশটি সন্তান আছে, কিন্তু আমি তাদের কাউকে চুমু দেইনি। রাসূলুল্লাহ (সা.) তার দিকে তাকিয়ে বললেন: যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।" (সহিহ বুখারী: ৫৯৯৭)

৬. শিশুর জন্য ভালো পরিবেশ তৈরি করা: ঘরে গান-বাজনা, টিভি ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা এবং পরিবেশকে ইসলামি রাখা। ঘরে যেন ঝগড়া-অশান্তি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা।

৭. শিশুর জন্য দুআ করা: নিয়মিত শিশুর জন্য দুআ করা। বিশেষত এই দুআটি:

اللَّهُمَّ بَارِكْ لِي فِي وَلَدِي وَاجْعَلْهُ مِنَ الصَّالِحِينَ

"হে আল্লাহ! আমার সন্তানে বরকত দিন এবং তাকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করুন।"


৪. হানাফি ফিকহের আলোকে অতিরিক্ত নির্দেশনা

রুকইয়াহ সম্পর্কে হানাফি মাযহাবের মত

হানাফি মাযহাবে রুকইয়াহ করা জায়েয, তবে শর্ত হলো:

  • রুকইয়াহ কুরআনের আয়াত বা সহিহ হাদিসে বর্ণিত দুআ দ্বারা হতে হবে
  • কোনো শিরকি বা বিদআতি শব্দ ব্যবহার করা যাবে না
  • রুকইয়াহকারীকে বিশ্বাস করা যাবে না যে, নিজে নিরাময়কারী; বরং আল্লাহই নিরাময়কারী

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতার-এ বলেন: "রুকইয়াহ তথা দম করা জায়েয যদি তা কুরআন বা সহিহ হাদিসের দুআ দ্বারা হয় এবং বিশ্বাস থাকে যে, আল্লাহই আরোগ্য দানকারী।" (রদ্দুল মুহতার: ৬/৪১৩)

খাওয়ার সমস্যায় চিকিৎসার পরামর্শ

ইসলামি দৃষ্টিতে রোগের চিকিৎসা করাও জরুরি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا أَنْزَلَ اللَّهُ دَاءً إِلَّا أَنْزَلَ لَهُ شِفَاءً

"আল্লাহ তায়ালা এমন কোনো রোগ নাজিল করেননি যার নিরাময় নাজিল করেননি।" (সহিহ বুখারী: ৫৬৭৮)

তাই রুকইয়াহর পাশাপাশি অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। রুকইয়াহ এবং চিকিৎসা একসাথে করলে ইনশাআল্লাহ উপকার পাওয়া যাবে।

৫. শিশুর খাওয়ার সমস্যা সমাধানে কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ

১. ডাক্তারের পরামর্শ নিন - প্রথমে শিশু বিশেষজ্ঞকে দেখান ২. খাবারের সময় পরিবর্তন করুন -


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.