আত্মহত্যা করা কি সবসময় হারাম?

Family Life · Hanafi

Question No: 3716
Questioner: Li Za
Question Asked: 09 Aug 2026, 07:57 AM
Reviewed & Published: 09 Aug 2026, 11:25 AM
Views: 10
Tokens: 7,341
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুয়ালাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ ওস্তাদ
আমি আমার সমস্যা নিয়ে আগেও প্রশ্ন করেছি অনেকবার। যেমন: আমার মা বাবা হারামে জড়িত,তারা দুনিয়াবি মানুষ,পর্দা করা, হালাল হারাম মেনে চলা তারা পছন্দ করে না। আমাকে তারা দীনদার এর কথা বলে বিয়ে দিয়েছে জোর করে এমনকি তাবিজ পর্যন্ত করে হয়েছিল। বিয়ের পর তাঁদের সম্মান আর মেয়ের বোঝা বহনের ভয়ে ডিভোর্সি করায়নি। ২ দিন আগে আমার দীনদার স্বামী আমাকে আমার মুখে ইচ্ছে মতো মেরেছে এতে আমার ২ গেলে দাগ হয়ে গেছে। খেতে পারছি না পর্যন্ত ব্যাথায়। কাউকেই এসব বলিনি। মা,বাবা,বোনের সাথে কথা বলি না তারাও আমার সাথে বলতে চায় না। তাঁদের সম্মান, স্বার্থই আগে। আমার স্বামী সব জানেন আমার মা বাবা,বোন কেমন আমাকে তারা কীভাবে দেখে। হয়তো এসবের সুযোগ নিয়ে আমার উপর জুলুম করছে। বাবার বাড়িতে সমাধান চাইলে তারা আমাকে উল্টো নির্যাতন করে মা কথায় কথায় মারে ২ বার তো গোলা টিপে ধরেছিল গত ৮/৯ মাসের মধ্যে।মা বাবা এমন হওয়ার কারণে একবার আমি সব ছেড়ে আমার স্বামীর কাছে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম তিনি হয়তো সব কিছু বুঝবেন। হয়তো তার মধ্যে আল্লাহর ভয় আছে কিন্তু দিনে দিনে সেও তার আসল রূপ দেখায় দিচ্ছে। এবার তো আমার চরিত্রে দাগ লাগায় দিচ্ছে। আমাকে নোংরা ভাষায় গালি দেয়।

এখন উস্তাদ আমার পরিস্থিতিতে কেউ আমাকে সাহায্য করার মতো নেই,আমাকে জুলুম থেকে বাঁচাবে এমন কেউ নেই। আমার অবস্থান থেকে কি করা উচিত হবে? আমার ১ বছরের ছেলে আছে ওকে সবাই আদর করে অনেক কারণ ও ছেলে। আমার মা বাবা তো ওকে নিতে চায় ওরা বড় করবে ওদের নাকি দেখবে। এমন জানোয়ার, অমানুষের সাথে কীভাবে থাকা যায়? মানষিক, শারীরিক ভাবে টর্চার করে। আমি কি আত্মহত্যা করলে তা উচিত হবে?

Answer

আত্মহত্যা করা কি সবসময় হারাম?

উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

প্রিয় বোন, আপনার কষ্টের কথা পড়ে আমি অত্যন্ত মর্মাহত। আপনি যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই অত্যন্ত কঠিন। তবে আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো—আত্মহত্যা করা সম্পূর্ণ হারাম (নিষিদ্ধ) এবং ইসলামে এটি একটি গুরুতর গুনাহ। কোনো অবস্থাতেই আত্মহত্যা জায়েয নয়।

কুরআন ও হাদীসের দলীল:

১. কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا "আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু।" (সূরা আন-নিসা: ২৯)

২. অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন:

وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ "আর তোমরা নিজেদেরকে নিজের হাতে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না।" (সূরা আল-বাকারা: ১৯৫)

৩. হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:

مَنْ قَتَلَ نَفْسَهُ بِحَدِيدَةٍ فَحَدِيدَتُهُ فِي يَدِهِ يَتَوَجَّأُ بِهَا فِي بَطْنِهِ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا أَبَدًا "যে ব্যক্তি লোহার অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামের আগুনে চিরকাল অবস্থান করবে এবং তার হাতে সেই লোহার অস্ত্র থাকবে, যা দিয়ে সে নিজের পেটে আঘাত করতে থাকবে।" (সহীহ বুখারী: ১৩৬৩, সহীহ মুসলিম: ১০৯)

৪. অন্য হাদীসে এসেছে:

مَنْ تَرَدَّى مِنْ جَبَلٍ فَقَتَلَ نَفْسَهُ فَهُوَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ يَتَرَدَّى فِيهِ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا "যে ব্যক্তি পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামের আগুনে চিরকাল লাফাতে থাকবে।" (সহীহ মুসলিম: ১০৯)

হানাফী ফিকহের আলোকে:

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, আত্মহত্যা কবীরা গুনাহ (মহাপাপ) এবং এর শাস্তি অত্যন্ত কঠিন। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪২০)

ফাতাওয়া আলমগীরী-তে বলা হয়েছে:

"নিজের জীবন ধ্বংস করা বা আত্মহত্যা করা সম্পূর্ণ হারাম এবং এটি কবীরা গুনাহ।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/৩৬০)

মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) তাঁর মা'আরিফুল কুরআন-এ সূরা আন-নিসার ২৯ নং আয়াতের তাফসীরে বলেন:

"আত্মহত্যা করা যে কোনো অবস্থাতেই হারাম। এমনকি চরম কষ্ট ও নির্যাতনের মধ্যেও আত্মহত্যা জায়েয নয়। কারণ জীবন আল্লাহর আমানত এবং তা সংরক্ষণ করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য।" (মা'আরিফুল কুরআন, ২/৪৮৫)

মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন:

"আত্মহত্যা একটি মারাত্মক পাপ। কোনো অবস্থাতেই তা জায়েয নয়। এমনকি চরম নির্যাতনের শিকার হয়েও একজন মুমিনের উচিত ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা।" (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫০)

আপনার করণীয়:

১. আত্মহত্যার চিন্তা সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করুন - এটি শয়তানের প্ররোচনা। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না।

২. ধৈর্য ধারণ করুন - রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

وَاعْلَمْ أَنَّ النَّصْرَ مَعَ الصَّبْرِ "জেনে রাখো, ধৈর্যের সাথে রয়েছে বিজয়।" (মুসনাদ আহমাদ)

৩. আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন - কুরআনে আল্লাহ বলেন:

وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন।" (সূরা আত-তালাক: ২)

৪. বিচ্ছেদের (তালাক) বিষয়ে চিন্তা করুন - যদি স্বামী নির্যাতন করে এবং সংসার করা সম্ভব না হয়, তবে ইসলামী আইন অনুযায়ী তালাক বা খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ) এর ব্যবস্থা নিতে পারেন। এটি আত্মহত্যার চেয়ে উত্তম এবং বৈধ পথ।

৫. স্থানীয় আলেম বা ইসলামী সংস্থার সাহায্য নিন - আপনার এলাকার কোনো বিশ্বস্ত আলেম বা ইসলামী সংস্থার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করুন।

৬. দোয়া করুন - নবী (সা.) এর শিক্ষাদেওয়া দোয়াটি পড়ুন:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ "হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে এবং ঋণের বোঝা ও মানুষের অত্যাচার থেকে।" (সহীহ বুখারী)

উপসংহার:

প্রিয় বোন, আপনার সমস্যা সমাধানের জন্য ইসলামী শরীয়তের মধ্যে অনেক বৈধ পথ রয়েছে। আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়, বরং এটি একটি চিরন্তন শাস্তির কারণ। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। আল্লাহ বলেন:

إِنَّ رَحْمَتَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِنَ الْمُحْسِنِينَ "নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।" (সূরা আল-আ'রাফ: ৫৬)

আপনার জন্য দোয়া রইল। আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও সাহায্য দান করুন। আমীন।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.