মাজার ও পীর মুরীদি সংক্রান্ত
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নকারীর প্রতি আমাদের নিবেদন: আপনি বাংলাদেশের কেল্লার মাজার ও ল্যাংটার মাজারের প্রধানদের এবং তাদের মুরীদের আকীদা সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের আকীদা সম্পর্কে ফতোয়া দেওয়ার পূর্বে তাদের আকীদা-বিশ্বাস সম্পর্কে স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকা আবশ্যক। যেহেতু আপনি তাদের নাম জানেন না এবং তাদের আকীদা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্যও দিতে পারেননি, তাই সরাসরি তাদেরকে গোমরাহ বা বিদআতী বলা যাবে না।
তবে ইসলামী আকীদার মূলনীতি অনুযায়ী আমরা বলতে পারি:
১. মাজার ও পীর-মুরীদি সম্পর্কে ইসলামী নির্দেশনা:
ইসলামে মৃত ব্যক্তির (ওলী, পীর বা অন্য কারো) কাছে দোয়া চাওয়া, সাহায্য প্রার্থনা করা, তাদেরকে আল্লাহর সাথে শরীক করা বা তাদেরকে সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান মনে করা সম্পূর্ণ শিরক এবং হারাম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللهِ أَحَدًا "আর মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য, সুতরাং তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে ডেকো না।" (সূরা আল-জিন: ১৮)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِ اللهِ عِبَادٌ أَمْثَالُكُمْ "তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ডাকো তারা তোমাদেরই মতো বান্দা।" (সূরা আল-আরাফ: ১৯৪)
সুতরাং কোনো মাজারের প্রধান বা পীর যদি মানুষকে আল্লাহর পরিবর্তে নিজের কাছে বা মাজারের বড়জনের কাছে দোয়া চাইতে, সাহায্য প্রার্থনা করতে বা তাদেরকে ভয় করতে শেখান, তবে তা শিরক হবে এবং তাদের আকীদা সঠিক নয়।
২. পীর-মুরীদির বৈধতা:
ইসলামে পীর-মুরীদি বা আধ্যাত্মিক শিক্ষকের ব্যবস্থা বৈধ, তবে শর্ত হলো পীর হবে আলেম, মুত্তাকী এবং সুন্নাহর অনুসারী। পীরের কাজ হবে মুরীদকে কুরআন-সুন্নাহর উপর আমল করতে শেখানো, তাসাওউফের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি করা এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনে সহায়তা করা। পীরকে আল্লাহর স্থলাভিষিক্ত বা শরীক মনে করা যাবে না। ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) সহ সকল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ইমামগণ এই বিষয়ে একমত।
৩. ওয়াজ-নসীহতের বিধান:
যে ব্যক্তি ওয়াজের মধ্যে আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কথা বলেন, এটি ভালো দিক। কিন্তু ওয়াজের পাশাপাশি তার আকীদা যদি কুরআন-সুন্নাহর পরিপন্থী হয় (যেমন: মাজারে সিজদা করা, মৃতকে ডাকা, পীরকে সর্বজ্ঞ মনে করা ইত্যাদি), তবে তার আকীদা সঠিক নয়। আর যদি তার আকীদা কুরআন-সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং সে সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনযাপন করে, তবে তার আকীদা সঠিক হতে পারে।
৪. নির্দিষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত:
যেহেতু আপনি কেল্লার মাজার ও ল্যাংটার মাজারের প্রধানদের নাম জানেন না এবং তাদের আকীদা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্যও দিতে পারেননি, তাই তাদের সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করা উচিত নয়। তবে সাধারণ নিয়ম হলো: কোনো ব্যক্তির আকীদা বিচার করতে হবে তার প্রকাশ্য আমল ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে। যদি তারা শিরকী কার্যকলাপে লিপ্ত থাকে, তবে তাদের আকীদা সঠিক নয়। আর যদি তারা সুন্নাহসম্মত জীবনযাপন করে, তবে তাদের আকীদা সঠিক।
৫. সতর্কতা:
আপনি যেহেতু জানতে চেয়েছেন তাদের আকীদা কেমন, তাই আমরা বলব: ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তি বা দলের আকীদা বিচার করার আগে তাদের সম্পর্কে স্পষ্ট প্রমাণ সংগ্রহ করা জরুরি। কোনো মুসলমানকে গোমরাহ বলা বা তার আকীদা ভুল বলা একটি গুরুতর বিষয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
مَنْ قَالَ لِأَخِيهِ يَا كَافِرُ فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا "যে ব্যক্তি তার ভাইকে বলে 'হে কাফির', তবে তাদের মধ্যে একজন অবশ্যই কুফরীতে ফিরে যাবে (যদি সে কাফির না হয় তবে বলাকারী কাফির হয়ে যাবে)।" (সহীহ বুখারী: ৬১০৪, সহীহ মুসলিম: ৬০)
সুতরাং আপনি তাদের সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন না। তবে তাদের কার্যকলাপ যদি শিরকী হয়, তবে তা থেকে দূরে থাকা এবং সঠিক আকীদা (তাওহীদ) অনুযায়ী জীবনযাপন করা আপনার কর্তব্য।
উপসংহার:
- মাজার বা পীরকে আল্লাহর সাথে শরীক করা, তাদের কাছে দোয়া চাওয়া বা সাহায্য প্রার্থনা করা শিরক।
- পীর-মুরীদি বৈধ, তবে পীর হতে হবে সুন্নাহর অনুসারী এবং তার শিক্ষা হতে হবে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক।
- কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির আকীদা বিচার করার আগে তার সম্পর্কে স্পষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন।
- আপনার কর্তব্য হলো সঠিক আকীদা (তাওহীদ ও সুন্নাহ) অর্জন করা এবং শিরক-বিদআত থেকে দূরে থাকা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক আকীদা ও সুন্নাহর উপর আমল করার তাওফীক দান করুন। (আমীন)
দলিলসমূহ:
১. সূরা আল-জিন: ১৮ ২. সূরা আল-আরাফ: ১৯৪ ৩. সহীহ বুখারী: ৬১০৪ ৪. সহীহ মুসলিম: ৬০ ৫. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ৬/৩৬৭-৩৬৮ ৬. ফাতাওয়া উসমানী: ১/২৮৩-২৮৫ ৭. বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী): ১/৩২-৩৫